সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

সায়ানাইড মাখানো ছুরি হাতে পেডিকে মারতে স্টেশনে

ছোট থেকেই পরের উপকারে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। গাঁধী বা নেতাজি মেদিনীপুর এলে তিনি কর্মব্যস্ত। জেলাশাসক বার্জ খুনের চক্রান্তের নেতা হিসেবে ফাঁসি হল রামকৃষ্ণ রায়ের। সদ্য গেল তাঁর জন্মদিবস। বিপ্লবী স্মরণে অরিন্দম ভৌমিক

ramkrishna roy
রামকৃষ্ণ রায়। ছবি লেখকের সৌজন্যে

রাত তখন শেষ প্রহর। ঝনঝন করে লোহার দরজা খুলে গেল। ভিতরে ঢুকল একজন অফিসার ও সশস্ত্র পুলিশ। ‘প্রস্তুত?’ উত্তর এল ‘সম্পূর্ণ প্রস্তুত’। মাথা উঁচু করে এগিয়ে চলল একটি কিশোর। সঙ্গে সশস্ত্র প্রহরীরা। প্রহরীদের মধ্যেও কেউ কেউ সকলের অগোচরে চোখের জল মুছল। ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে গিয়ে তুলল, ধর্মের নামে অভিনয় হল! তারপর একটি শব্দ ‘খট’। ‘মা-মাগো’ শেষ কথা। ২৫ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ১৯৩৪ সাল, ভোর ৫টা। মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেলের উত্তর-পশ্চিম দিকে বাগানের মধ্যে জ্বলে উঠল চিতা। বিপ্লবী রামকৃষ্ণ রায়ের নশ্বর দেহ নষ্ট হয়ে গেল। কিন্তু স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে ঠাঁই পেলেন।

রামকৃষ্ণ রায় জন্মেছিলেন ১৯১৩ সালের ৯ জানুয়ারি। মেদিনীপুর জেলার খড়্গপুর থানার জকপুরের বিখ্যাত রায় বংশে। বাবা কেনারাম রায়, মাতা ভবতারিণী। রামকৃষ্ণের জন্ম মেদিনীপুর শহরের চিড়িমারসাইয়ে। রামকৃষ্ণ মেদিনীপুর টাউন স্কুলে ১৯২২ সালে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন। ওই ক্লাসেই তাঁর পরবর্তীকালের সহকর্মী ব্রজকিশোর, অমর চট্টোপাধ্যায়, ফণি দাস প্রমুখ ভর্তি হন। ছোটবেলা থেকে রামকৃষ্ণ শরীরচর্চা করতেন। ঝাঁপিয়ে পড়তেন মানুষের সেবায়। ১৯২৪ সালে মোহনদাস কর্মচন্দ গাঁধী মেদিনীপুরে এসেছিলেন। বালক রামকৃষ্ণ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীতে সারাদিন ব্যস্ত। ১৯২৬ সালে পুরসভার নির্বাচনে বীরেন্দ্রনাথ শাসমলের হয়ে রামকৃষ্ণ ভোট সংগ্রহ করেছেন। ১৯২৮ সালে সুভাষচন্দ্র এলেন মেদিনীপুর। আবারও ব্যস্ত প্রাণচঞ্চল রামকৃষ্ণ। 

এই সময়েই মেদিনীপুরে এলেন বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত। মেদিনীপুর কলেজে বিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তি হলেন। আসল উদেশ্য বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সকে শক্তিশালী করা। রামকৃষ্ণ তখন অস্থির চিত্ত। বিবিগঞ্জের ছোট শিবমন্দিরের আব্দুল্লির আখড়ার অন্যতম সদস্য। বুঝতে পারছিলেন, মেদিনীপুরে এমন একটা কিছু হচ্ছে যাতে অংশ নিতে পারছেন না। এদিকে দীনেশের সহকর্মী, ফণি কুণ্ডু খুঁজছেন কয়েকটি ছেলে। আব্দুল্লির আখড়ার কথা জানতে পারলেন। সকলের আপত্তি অগ্রাহ্য করে রামকৃষ্ণকে দলে নিলেন। রামকৃষ্ণ দলে কিছুদিনের মধ্যেই জনপ্রিয়। তাঁরই প্রেরণায় একদল ছেলে দলে যোগ দিল। 

সেটা ১৯৩০ সাল। শোনা গেল, জেলাশাসক পেডি তমলুক থেকে মেদিনীপুর ট্রেনে আসছেন। ফণী কুণ্ডু পেডিকে হত্যার ছক কষলেন। কিন্তু ছুরি ছাড়া কোনও অস্ত্র নেই। রামকৃষ্ণ ছুরি নিয়েই যেতে প্রস্তুত। কলেজ থেকে পটাসিয়াম সায়ানাইড এনে ভেসলিন দিয়ে ছুরিতে লাগানো হল। ঠিক হল খড়্গপুর স্টেশনে ছুরি দিয়ে রামকৃষ্ণ পেডিকে আক্রমণ করবে। তার পর আত্মহত্যা করবে। নিদৃষ্ট দিনে রামকৃষ্ণ বেরিয়ে গেলেন। ভালবাসার টানে দলের নেতা ফণী নিয়ম ভেঙে তাঁর পিছু নিলেন। খড়্গপুর স্টেশনে ট্রেন থেমেছে। দরজা বন্ধ। চারদিকে পুলিশে ছয়লাপ। কিছুতেই পেডির কামরায় যাওয়া যায় না। তবুও রামকৃষ্ণ ট্রেনের জানলার ফাঁক দিয়ে পেডিকে মারার জন্য এগিয়ে চললেন। হঠাৎ পিছন থেকে টান পড়ল। ফণী। নেতার নির্দেশ মানতেই হবে। রামকৃষ্ণ আক্ষেপে কেঁদে ফেললেন। ঠিক হল, মেদিনীপুর স্টেশনে আবার চেষ্টা হবে। মেদিনীপুরে ট্রেনের কাছে ঘেঁষতে পারলেন না রামকৃষ্ণ। বেশ কিছুদিন বিমর্ষ রইলেন।

কিছুদিন পরে হত্যা করা হল পেডিকে। ফণী কুণ্ডু রামকৃষ্ণকে সেই অভিযানে নেননি। দলের নেতারা ধরা পড়লেন। ঠিক হল কিছুদিন গা ঢাকা দিতে হবে। ফণী কুণ্ডু জেলে, দীনেশ গুপ্তর ফাঁসি হয়ে গিয়েছে। ঠিক হল, রামকৃষ্ণ ও ব্রজকিশোর আড়ালে থাকবেন। ধীর স্থির ব্রজকিশোর মেনে নিলেন। পূজারী সেজে বাড়ি বাড়ি পুজো করতেন আর ছেলে জোগাড় করতেন। পুলিশ ভাবল, পেডি হত্যা মামলায় খালাস পেয়ে ব্রজকিশোর ভয় পেয়েছেন। পুলিশ পিছু নেওয়া ছাড়ল। 

রামকৃষ্ণ অস্থির চিত্ত। মাণিক নন্দীর পুকুর পাড়ে একটা কুড়ে ঘরে থাকতেন। ব্রজের মতো দলের নির্দেশ তিনি মেনে নিতে পারেননি। রাতের অন্ধকারে প্রায়ই সহকর্মীদের কাছে গিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন। অনুরোধ করেন, তাঁকে বাদ দিয়ে যেন অন্য কেউ আত্মবলিদানের সুযোগ না পান। এদিকে আরেক জেলাশাসক ডগলাসকে হত্যার সিদ্ধান্ত হয়েছে। রামকৃষ্ণকে কিছুই বলা হয়নি। জানতে পারলে তাঁকে আটকানো যাবে না। ঠিক হল, ডগলাস হত্যার পরে ব্রজকিশোর ও রামকৃষ্ণকে সামনে আনা হবে। ডগলাস খুন হলেন। খবর পেয়ে রামকৃষ্ণ ক্ষুব্ধ। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, দলের দায়িত্বে ব্রজ ও রামকৃষ্ণ। জেলাশাসক বার্জকে হত্যা করতে হবে। কিন্তু পুলিশ সজাগ। সাফল্য এল না।

১৯৩৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর। বিকেল সাড়ে ৫টার সময় অনাথবন্ধু পাঁজা ও মৃগেন দত্তর গুলিতে বার্জ মারা গেলেন পুলিশ মাঠে। অনাথ ও মৃগেন পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিলেন। মেদিনীপুরের অগণিত যুবক-সহ ধরা পড়লেন রামকৃষ্ণ ও ব্রজকিশোর। তাঁদের উপর অত্যাচার চলল। কিন্তু রামকৃষ্ণ ও ব্রজকিশোর মুখ খুললেন না। ১৯৩৪ সালে রামকৃষ্ণ, ব্রজকিশোর ও নির্মলজীবনের ফাঁসির আদেশ হল। অন্যদের সাজা দ্বীপান্তর। ১৯৩৪ সালের ৮ অক্টোবর রামকৃষ্ণের বড়দা নরেশকৃষ্ণের কাছে জেল সুপারের চিঠি এল।

From, Superintendent. Midnapur Central Jail. No. 4847 A-B/3

   To, Babu Naresh Krishna Roy. Chirimarshai, Midnapore Town.

   Dear Sir, I Write to inform you that your brother Ramkrishna Roy who has been condemned to death desires to have an interview with you. Will you please come to the jail gate at 3.30 p.m. on 10th instant if you desire to see him. The District Magistrate has no objection to permit you to see your brother.

   Yours faithfully

   S/D Illegible.

   Major I.M.S. Superintendent

১০ অক্টোবর নরেশকৃষ্ণ জেল গেটে দেখা করলেন। প্রসন্ন মুখ, বলিষ্ঠ দেহ। দাদাকে নমস্কার করে বললেন, ‘দাদা চললাম, মাকে দেখো, আমি আবার আসব’। মাকে লেখা চিঠি দিলেন দাদার হাতে। লিখেছিলেন, ‘মাগো,...পৃথিবীতে এসে কেবল আপনাকে দুঃখ এবং অশান্তিই দিয়ে গেলাম। আপনার প্রতি আমি কোন কর্তব্যই করিতে পারিলাম না। তাহার জন্য আমায় ক্ষমা করিবেন।...তোমার কোল হতে চির বিদায় নিয়ে চল্লাম। গীতাটি দিয়ে গেলাম। প্রণত: আপনার স্নেহের রামকৃষ্ণ’। 

১৯৩৪ সালে ২৫ অক্টোবর মেদিনীপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসি হল রামকৃষ্ণ ও ব্রজকিশোরের। পরের দিন ফাঁসি হল নির্মলজীবনের। রামকৃষ্ণের মা ফাঁসির খবর পেয়ে একটি মাত্র কথা বলেছিলেন, ‘এই তিনটিকে মেরেও ইংরেজ তোমাদের রাজত্ব থাকবে না’। 

তার পর তিনি আর কথা বলেননি।

(কৃতজ্ঞতা: প্রয়াত স্বাধীনতা সংগ্রামী বঙ্কিমবিহারী পাল)

লেখক আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চাকারী

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন