রবীন্দ্রনাথের বৌদি কাদম্বরীদেবী তাঁর বয়স ২৬ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই নিজের জীবনদীপ নিজেই নিভিয়ে দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের কলমেও ফুটে ওঠে আত্মহননের ছবি। তাঁর ছোট গল্প ‘জীবিত ও মৃত’র চরিত্র কাদম্বিনী ‘মরিয়া প্রমাণ করিল যে সে মরে নাই’। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম কথাসাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। তিনি তাঁর ৬২তম জন্মদিনের উনিশ দিন আগে নিজের কপালে বন্দুক ঠেকিয়ে ট্রিগার টিপে দিলেন। সে সময় পরার জন্য তিনি বেছে নিয়েছিলেন তাঁর প্রিয় ‘সম্রাটসুলভ আঙ্গরাখা’। এই পোশাক মনে পড়িয়ে দেয় ইতিহাসের এক বর্ণময় চরিত্র ক্লিওপেট্রার আত্মহত্যার কথা। শেক্সপিয়রের বর্ণনায় সাপের ছোবল নেওয়ার আগে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাকে আমার আঙ্গরাখা দাও। আমাকে আমার মুকুট দাও। আমার রয়েছে এক অবিনশ্বর আকাঙ্ক্ষা।’ যুদ্ধফেরত হেমিংওয়ের বুলফাইটিং, মুষ্টিযুদ্ধ, শিকার ইত্যাদি শখ নিয়ে ছিল এক জবরদস্ত পৌরুষত্বব্যঞ্জক ভাবমূর্তি। এ রকম মানুষ কেন বেছে নিলেন আত্মহননের পথ?

কবি সার্গেই ইয়েসেনিন ১৯২৫ সালে মাত্র তিরিশ বছর বয়সে লেনিনগ্রাদের এক হোটেলে নিজেকে নিজেই শেষ করে দেন। তার আগে নিজের রক্ত দিয়ে লিখে গিয়েছিলেন তাঁর শেষ কবিতা, ‘এখন মৃত্যুবরণ করার মধ্যে নতুন কিছু নেই, তবে বেঁচে থাকার মধ্যেও তো নতুনতর কিছু নেই’। ইয়েসেনিনের মৃত্যুতে ক্ষুব্ধ হয়ে কবি ও নাট্যকার মায়াকোভস্কি একটি কবিতা লিখেছিলেন, ‘সার্গেই ইয়েসেনিনকে’। তাতে লিখেছিলেন, ‘এ জীবনে মৃত্যুবরণ করা কঠিন নয়, কঠিনতর জীবনকে গড়ে নেওয়া’। অথচ এর পাঁচ বছর পরে মায়াকোভস্কি নিজেই আত্মহত্যা করেন।

‘আমার সাধ না মিটিল, আশা না পুরিল, সকলই ফুরায়ে যায় মা’ যাঁর গলায় জনপ্রিয়, সেই শিল্পী পান্নালাল ভট্টাচার্যের এই গানের মধ্যেই হয় তো লুকিয়েছিল তাঁর অতৃপ্তি। তাই বুঝি মাত্র ৩৬ বছর বয়সে বেছে নিলেন আত্মহননের পথ। জনপ্রিয় গায়ক অংশুমান রায় অথবা খ্যাতিমান গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেরাই নিভিয়ে দিয়েছিলেন নিজেদের জীবনপ্রদীপ।

বিশিষ্ট ব্যক্তি হোন বা সাধারণ মানুষ— আত্মহনন সমাজের পক্ষে এক মর্মান্তিক বিয়োগান্তক অভিঘাত। পরিবার, পরিজন ও প্রতিবেশী— এই বিপর্যয়ের ক্ষত যেন নিরাময় হতে চায় না। ইংরেজিতে ‘সুইসাইড’ শব্দটি এসেছে ল্যাটিন ‘সুইসিডিয়াম’ থেকে, যার অর্থ ‘নিজেই নিজেকে শেষ করে দেওয়া’।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সারা বিশ্বে প্রতি বছর আট লক্ষের বেশি মানুষ আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে নিজেদের জীবনের নাটকীয় পরিসমাপ্তি ঘটান। অর্থাৎ সারা বিশ্বে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে এক জন আত্মহত্যা করেন। যেখানে প্রতি এক লাখে সারা বিশ্বে আত্মহত্যার বার্ষিক হার ১১.৬, সেখানে ভারতবর্ষে এই হার ১০.৫। ২০১৬ সালে ভারতে আত্মহত্যা করা মানুষের সংখ্যা ছিল ২,৩০,০০০-এর কিছু বেশি।

মৃত্যুর কারণ হিসেবে বিভিন্ন দেশে আত্মহত্যার স্থান সাধারণ ভাবে দশম থেকে অষ্টাদশ। কিন্তু পনেরো থেকে উনত্রিশ বছর বয়সীদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে আত্মহত্যা মর্মান্তিক ভাবে দ্বিতীয়  স্থানে। গত পাঁচ দশকে আত্মহত্যার হার বেড়েছে শতকরা ৬০ ভাগ, বিশেষ করে কমবয়সীদের মধ্যে এবং শিল্পোন্নত দেশে। সমীক্ষা বলছে, প্রতিটি আত্মহত্যার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বিভিন্ন জনের অন্তত ২০টি ব্যর্থতার প্রয়াস। তাঁরা বেঁচে থাকেন এই প্রয়াসজনিত শারীরিক ও মানসিক আঘাত অথবা পঙ্গুত্বকে নিয়ে।

আত্মহত্যা করে যিনি জীবনের অপচয় ঘটান সেই সমাজবদ্ধ মানুষটি আত্মহত্যায় দুঃখভোগের শরিক হন তাঁর আত্মীয়, পরিজন, বন্ধু, সহকর্মী, পরিচিত অনেকেই। আত্মহত্যা নিবারণের আন্তর্জাতিক সংস্থা, ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশেন ফল সুইসাইড প্রিভেনশন’-এর তথ্য অনুযায়ী প্রতিটি আত্মহত্যার জন্য গড়ে অন্তত ১৩৫ জন দুঃখভোগ করেন। আত্মহত্যাকে কেন্দ্র করে যেমন থাকে বিষাদ ও বেদনা, তেমনই তার কারণকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিস্ময় ও রহস্য মেশানো অনেক প্রশ্নও। আত্মহত্যার মতো জটিল এক বিষয়ে সব প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞানের কাছে এখনও স্পষ্ট নয়। তবে যে সব ঝুঁকির আন্তঃবিক্রিয়া আত্মহত্যার নিয়ামক, তাদের চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে।

এর মধ্যে প্রথমেই আসে তাঁদের কথা, যাঁরা শিশু বয়সে দৈহিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বা অবহেলা পেয়েছেন। এঁদের শতকরা ১০-৭৩ ভাগের ভবিষ্যতে আত্মহত্যা করার আশঙ্কা থাকে। আত্মহত্যার ক্ষেত্র প্রস্তুত করায় প্রধান ভূমিকা মানসিক অসুস্থতার। অবসাদ, উদ্বেগ ব্যাধি, বাইপোলার ডিসঅর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া, পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার ইত্যাদি মানসিক অসুখের উপস্থিত আত্মহত্যার প্রধান ঝুঁকি। আবার আত্মহত্যার প্রবণতা বংশানুক্রমিক ভাবে সঞ্চারিত হতে পারে। যেমন, আর্নেস্ট হেমিংওয়ের পরিবারে তিনি ছাড়া তাঁর বাবা, ভাই, দিদি এবং নাতনি আত্মহত্যা করেছিলেন।

মানসিক অসুস্থতার পরে যে কারণ আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ায় তা হল মদ ও নেশাদ্রব্যের ব্যবহার। আবার সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা যেমন দারিদ্র, বেকারত্ব, ঋণ, একাকিত্বের মতো মানসিক আঘাত বা ক্ষতির অভিঘাত নিজের বা সামাজিক পরিবেশগত শক্তিতে সামাল দিতে না পারলে তা খুলে দেয় আত্মহত্যার পথ।

বর্তমানে সমাজের পক্ষে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কিশোর বা যুব সমাজের আত্মহত্যা। প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতি ও পরীক্ষার ফলজনিত উদ্বেগ এর প্রধান কারণ। এখানে অভিভাবকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। প্রয়োজন আছে কেরিয়ার কাউন্সেলিং-এরও। দেখা গিয়েছে আত্মহত্যার খবর আত্মহত্যায় প্ররোচনা জোগাতে পারে, একে বলা হয় ‘কপিক্যাট’ প্রবৃত্তি। 

আত্মহত্যা কিন্তু নিবারণযোগ্য। প্রশাসনের, সমাজের এ ব্যাপারে সচেতন হওয়ার দরকার আছে। আত্মহত্যার উপকরণ যাতে সহজপ্রাপ্য না হয়, সে ব্যাপারে প্রশাসনিক নজরদারির প্রয়োজন। কীটনাশক দ্রব্য, আগ্নেয়াস্ত্র, সংশ্লিষ্ট ওষুধ বিক্রয়ে নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। অস্ট্রেলিয়ায় আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যাপারে এবং ইংল্যান্ডে ‘ওভার-দি-কাউন্টার’ ওষুধ বিক্রির ব্যাপারে কড়া বিধি আরোপে সুফল পাওয়া গিয়েছে। আত্মহত্যা নিবারণে সক্রিয় থাকা উচিত ‘হেল্পলাইন’-এর। আত্মহত্যাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা হিসেবে গ্রহণ করা দরকার। অথচ সারা বিশ্বে আত্মহত্যা নিবারণের ব্যাপারে জাতীয় পরিকল্পনা নিয়েছে মাত্র ৩৮টি দেশ।

সবার উপরে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা ও সহমর্মিতার। মানসিক স্বাস্থ্য এবং আত্মহত্যার ব্যাপারে সংস্কার বা ‘ট্যাবু’ কাটিয়ে এ ব্যাপারে খোলামেলা আলোচনার যেমন প্রয়োজন, তেমন প্রয়োজন চিকিৎসার জন্য এগিয়ে আসার। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা এবং আইএএসপি প্রতি বছর ১০ সেপ্টেম্বর ‘বিশ্ব আত্মহত্যা নিবারণ দিবস’ পালন করে। এ বছরের থিম ছিল, ‘ওয়ার্কিং টুগেদার টু প্রিভেন্ট সুইসাইড’। এই কর্মকাণ্ডে প্রয়োজন সবাই মিলে একযোগে কাজ করার। 

 

আসানসোলের চিকিৎসক ও সাহিত্যকর্মী