বাংলাদেশ একটি সাক্ষাৎ বারুদস্তূপের উপর দাঁড়াইয়া আছে— বিশিষ্ট লেখক ও অধ্যাপক জাফর ইকবালের উপর ঘৃণ্য সন্ত্রাসী হামলা তাহা মনে করাইয়া দিল। জাফর ইকবাল মুক্ত প্রগতিশীল চিন্তাভাবনা ও লেখাপত্রের জন্য জনপ্রিয়, সেই সুবাদে মৌলবাদীরা তাঁহাকে একাধিক হুমকিও পাঠাইয়াছে। গত দুই বৎসর তাঁহার জন্য পুলিশি প্রহরার বন্দোবস্ত হইয়াছে। এত কিছুর পরও শেষ রক্ষা হইল না। প্রথম প্রশ্ন ইহাই: যেখানে তিনি আক্রান্ত হন, তাহা সিলেটের একটি প্রকাশ্য সভা। তবে ‘ইসলামের শত্রু’ হিসাবে ইতিমধ্যেই চিহ্নিত লেখককে কেন সেই সভাস্থলে যথেষ্ট নিরাপত্তাবেষ্টনীতে রাখা হইল না? সরকারের তরফে তাঁহার জন্য ইতিমধ্যেই পুলিশ প্রহরার ব্যবস্থা আছে, তবে কেন সেই প্রহরার চরিত্র এত আলগা, এত সহজভেদ্য? বিষয়টি গুরুতর। ইহার মধ্যেই ইঙ্গিত যে, যতখানি গুরুত্বের সহিত বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ইসলামি মৌলবাদের মোকাবিলা করিতেছে, সেখানকার পরিস্থিতি সম্ভবত তাহার অপেক্ষা অনেক বেশি কঠিন। ২০১৪ সাল হইতে একের পর এক ব্লগার, প্রকাশক, লেখক নির্মম ভাবে নিহত হইয়াছেন, তাহার পরও হিট লিস্টে থাকা চিন্তাশীল মানুষগুলিকে সরকার প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দিতে পারে নাই। অথচ এই বুদ্ধিজীবী মানুষগুলি কিন্তু সে দেশের পরম সম্পদ। তাঁহাদের সুস্থ নিরাপদ অস্তিত্ব ও কাজকর্মের জন্যই বাংলাদেশ আজ একটি বিশিষ্ট পরিচয়ের অধিকারী। বন্দুক চপার ছোরাছুরি হইতে কী ভাবে আত্মরক্ষা করিতে হয়, তাহা জানা তাঁহাদের কাজ নয়। সে কাজ সরকারের। যুদ্ধকালীন ভিত্তিতে সরকার সেই দায়িত্ব পালন করিবে, এই দাবি থাকিল।

গোটা বাংলাদেশ জুড়িয়া এই দাবিতেই বিক্ষোভ দেখাইয়াছেন মৌলবাদ-বিরোধী জনগণ। প্রতিটি শহরের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় হইতে বিক্ষোভ মিছিল বাহির হইয়াছে, ঢাকার শাহবাগ চত্বর আবার জ্বলিয়া উঠিয়াছে প্রতিবাদের মশালে। ইহাই প্রমাণ, সে দেশে জঙ্গি ইসলামের মোকাবিলায় কত মানুষ যুক্ত হইতে চাহেন। মৌলবাদের ধ্বজাধারীরা যেমন দুর্দমনীয়, একের পর এক রক্তাক্ত আঘাতের পরও মৌলবাদবিরোধী সমাজের প্রতিবাদ ততটাই দৃঢ়। শেখ হাসিনা নিশ্চয়ই অবহিত, জঙ্গি-বিরোধী কার্যক্রমের প্রধান শক্তি এইখানেই। যে ভাবেই হউক, দুই যুযুধান সমাজের সংঘর্ষে তাঁহার সরকারের সামনে জরুরি কাজ— এক পক্ষের সমর্থন যে কত বড়, অন্য পক্ষের নিকট তাহা প্রমাণ করা, প্রতি দিন। এই কাজে কোনও ঢিলাঢালা আলস্য বা আত্মতুষ্টি চলিবে না। প্রতিপক্ষ শক্তিশালী। সরকারকেও শক্তির পরীক্ষা দিতে হইবে।

কথাগুলি বলিতে হইতেছে এই জন্য যে ২০১৬ সালে হোলি আর্টিজান বেকারির ঐতিহাসিক হামলার পর আওয়ামি লিগ সরকার সন্ত্রাসদমনে কতগুলি বড় মাপের পদক্ষেপ করিয়াছে, সফলও হইয়াছে। তবু এখনও অনেক কাজ বাকি। প্রধানমন্ত্রী হাসিনার দাবি, আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদের সহিত বাংলাদেশের বিশেষ সংযোগ নাই, অথচ তাহা কিন্তু এখনও নিশ্চিত নয়। কিছু ওয়াহাবি গোষ্ঠী যে দেশের নানা অঞ্চলে সক্রিয় ও কোনও না কোনও স্থান হইতে বিশাল আর্থিক মদতে পুষ্ট, তাহার প্রমাণ কম নয়। আইএস নামক সংগঠনটি বাংলাদেশে ক্রিয়াশীল নয় বলিয়া সরকারের ধারণা, অথচ আইএস-এর তরফে কিন্তু বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ ইতিমধ্যেই প্রকাশিত। পূর্ব এশিয়ায় রক্ষণশীল ইসলামের কেন্দ্র হিসাবে বাংলাদেশের বিকল্প নাই— হোলি বেকারির ঘটনার কিছু দিন আগেই আইএস প্রণীত অনলাইন পত্রিকা জানাইয়াছিল। স্থানীয় যুবসমাজের মধ্যে কে কী ভাবে কাজ করিতেছে, জানিবার জন্য অতি দক্ষ ইনটেলিজেন্স জালিকা জরুরি। বাংলাদেশ লড়িতেছে, কিন্তু আরও বড় লড়াই দরকার। শুধু তাহার নিজের জন্য নহে। বৃহত্তর বিশ্বের খাতিরেও।