মোহনদাস কর্মচন্দ গাঁধীর জন্ম-সার্ধশতবর্ষে তাঁর স্ব-সহায়তার আদর্শে সৃষ্ট উত্তরবঙ্গের একটি প্রাচীন প্রতিষ্ঠান সকলের অলক্ষ্যে পা রাখল হীরকজয়ন্তীতে। দার্জিলিঙের টিবেটান রিফিউজি সেল্ফ হেল্প সেন্টার। এই প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ ৬০ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার তাৎপর্য অবশ্য সময়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়। বরং অন্য রাষ্ট্রে শরণার্থী হয়ে বেঁচে থাকার হীনম্মন্যতাকে জয় করে নিজের পায়ে ঘুরে দাঁড়ানোর এক কঠিন লড়াইয়ে শামিল এই প্রতিষ্ঠান প্রমাণ করছে যে, ইচ্ছাশক্তির কাছে কোনও কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। 

এই প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য প্রথম যে কমিটি গঠিত হয়, তার অন্যতম সদস্য ছিলেন তেনজিং নোরগে। ১৯৫৩ সালে এডমন্ড হিলারির সঙ্গে তাঁর মাউন্ট এভারেস্ট বিজয় প্রমাণ করেছিল যে, মানুষ পারে না, এমন কোনও কাজ নেই। তেনজিংয়ের উদ্যম, সাহসিকতা, জেদ ও প্রবল মনোবল তাই বাড়তি উদ্যম জুগিয়েছিল দার্জিলিঙের টিবেটান রিফিউজি সেল্ফ হেল্প সেন্টারকে। 

১৯৫৯ সালের এপ্রিলে দলাই লামা তিব্বত ত্যাগ করেন। তারপরেই এই দেশে তিব্বতি শরণার্থীদের ঢল নেমেছিল। তেজপুরের নিকটবর্তী অরুণাচল প্রদেশের মিসামারি ও পশ্চিমবঙ্গের বক্সাদুয়ারে তাঁদের থাকার জন্য শিবির করা হলেও ক্রমশ চাপ বাড়ছিল। তিব্বতি উদ্বাস্তুদের সংখ্যা ন’হাজারে পৌঁছলে তাঁদের বিভিন্ন কাজে নিযুক্ত করে উত্তর ভারতের জম্মু-কাশ্মীর, হিমাচল প্রদেশের বিভিন্ন জায়গার পাশাপাশি সিকিম এবং পশ্চিমবঙ্গের কালিম্পং, দার্জিলিং ইত্যাদি জায়গায় পাঠানো হয়। আসলে, ভারতের দুর্দান্ত গরমে তাঁরা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন এবং কম উচ্চতায় থাকার কারণে নানা উপসর্গও দেখা দিচ্ছিল। তাই শরণার্থী তিব্বতিদের ভারতের নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় পাঠানোর সরকারি সিদ্ধান্তে সমর্থন ছিল সব রাজনৈতিক দলের। 

দার্জিলিঙে সেন্টার গড়ে তোলার জন্য লেবঙের পশ্চিমে হার্মিটেজ এলাকার ৩.৪৪ একর জমি লিজ নেওয়া হয়েছিল সেন্ট জোসেফ কলেজের কাছ থেকে। এই জায়গাটি মূল শহর থেকে খানিকটা দূরে হলেও যাতায়াতের কোনও অসুবিধে নেই। তা ছাড়াও এই অঞ্চলে ত্রয়োদশ দলাই লামা  ১৯১০ থেকে ১৯১২ সাল অবধি ছিলেন। তাই 'হিলসাইড' নামেও পরিচিত এই অঞ্চলের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কোনও দ্বিধা ছিল না। ১৯৫৯ সালের ২ অক্টোবর এই সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয় দু`জন পুরুষ ও দু`জন মহিলাকে নিয়ে। ক্রমে বেড়েছে তাঁদের সংখ্যা। এখন এই সংখ্যা ৭০০ ছুঁইছুঁই। 

আজকের টিবেটান রিফিউজি সেল্ফ হেল্প সেন্টার দেখলে বোঝা যায় না যে, শুরুর দিনগুলি কী কষ্টকর ছিল। নিজের দেশ, পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে তাঁরা বাধ্য হয়েছিলেন এমন এক দেশে আশ্রয় নিতে, যে দেশের ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্য, আবহাওয়া অনেকটাই ভিন্ন। তা ছাড়া কে না জানে যে, শরণার্থী-জীবনে পরমুখাপেক্ষী হয়ে থাকার তীব্র যন্ত্রণা বুকে নিয়ে চলতে হয়! এই জায়গা থেকে যে সংগ্রাম সেদিন শুরু হয়েছিল, আজ তা পল্লবিত নানা আকারে। এই সেন্টারে তৈরি জিনিসপত্র আজ পাড়ি দিচ্ছে বিদেশেও। কারও উপর নির্ভরশীল নন সেন্টারের বাসিন্দারা। ধর্মশালার অর্থনৈতিক সাহায্যও তাঁদের দরকার হয় না। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা তিব্বতি শরণার্থীদের ক্যাম্পের সঙ্গে এখানেই পার্থক্য দার্জিলিঙের টিবেটান রিফিউজি সেল্ফ হেল্প সেন্টারের।   

একেবারে শুরুর দিনগুলিতে অবশ্য অনুদান আর চাঁদাই ছিল বড় ভরসা। সে সময় প্রদর্শনী ফুটবল খেলাও ছিল পুঁজিবৃদ্ধির অন্যতম উপায়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনুদান আসায় খানিকটা সাবলম্বী হয়ে উঠেছিল সেন্টার। নিজেদের উপর ভরসা রেখেছিলেন সেন্টারের বাসিন্দারা। শুরু হয়েছিল তাঁদের সংগ্রাম। সেদিন থেকে শুরু করে আজ অবধি সেন্টারের অর্থের মূল উৎস বাসিন্দাদের হাতে তৈরি নানান জিনিস। চর্মজাত জিনিস, কাঠনির্মিত জিনিস, শীতবস্ত্র, কার্ড, কার্পেট, ছবি, ঘর সাজানোর ছোট-বড় জিনিস সেন্টার থেকে বিক্রির পাশাপাশি বিশ্বের প্রায় ৩৬টি দেশে রফতানি করা হয়। এখানেই থেমে নেই তাঁরা। ইতিমধ্যে এক্স-রে এবং রক্ত পরীক্ষাকেন্দ্র, দাঁতের চিকিৎসা ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। খোলা হয়েছে ভ্রাম্যমাণ ক্লিনিকও,  যেখানে ইসিজি, আলট্রাসোনোগ্রাফি, রেডিওগ্রাফির ব্যবস্থা রয়েছে। দার্জিলিঙে বসবাসকারী দরিদ্র তিব্বতি শিশুদের জন্য অবৈতনিক বিদ্যালয়টিও সেন্টারের অন্যতম কৃতিত্ব। সেখানে রয়েছে কম্পিউটার শেখানোর ব্যবস্থা।  

দার্জিলিং টিবেটান রিফিউজি সেল্ফ হেল্প সেন্টারের মূল সুরটি হল ‘রং শো’ বা নিজেকে সাহায্য করা। সেন্টারের বাসিন্দারা বুঝেছিলেন,  অন্য রাষ্ট্রে শরণার্থী হয়ে থাকার গৌরবহীন জীবনে ‘পুনর্বাসন’ শব্দটি তখনই যথাযথ হবে, যখন অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানসিক ভাবে সাবলম্বী হয়ে যাবে। অনুদান একটি পর্যায় পর্যন্ত জরুরি, কিন্তু নিজের পায়ে দাঁড়াতে গেলে এমন পথ নিতে হবে, যেখানে শরণার্থী জীবনের কুণ্ঠা থাকবে না। সেই ভাবনাই ডানা মেলেছিল। কোনও কোনও অর্থবর্ষে ৫০ লক্ষ টাকারও বেশি জিনিসপত্র এখন বিক্রি হয়। দার্জিলিং শহরের গাঁধী রোডেও সেন্টারের অফিস রয়েছে। সেন্টার প্রতিষ্ঠার সময় ১০ জনের কমিটি গড়া হয়েছিল। আজও একই ভাবে ১০ জনের কমিটির অধীনেই চলছে সেন্টারের বিরাট কর্মকাণ্ড।

শরণার্থী হয়েও নিজেদের পরিচয়ে বাঁচার এমন দৃষ্টান্ত বিরল। দার্জিলিং টিবেটান রিফিউজি সেল্ফ হেল্প সেন্টার আসলে মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার শিক্ষাই দিয়ে চলেছে ছ’দশক ধরে।

(লেখক কোচবিহার মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। মতামত ব্যক্তিগত)