বছর তিনেক ধরেই কথা হচ্ছিল। এই বার বোধ হয় ভারতে এসেই গেল ‘আনকন্ডিশনাল ক্যাশ ট্রান্সফার’। ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম বা সর্বজনীন সহায়ক আয় ঠিক নয়— তাতে দেশের সব মানুষেরই টাকা পাওয়ার কথা— নরেন্দ্র মোদী বা রাহুল গাঁধীরা বিভিন্ন চেহারায় যে নগদ হস্তান্তরের কথা বলছেন সম্প্রতি, সেটা টার্গেটেড ট্রান্সফার। অর্থাৎ, অভাবের কোনও নির্দিষ্ট মাপকাঠির ওপর ভিত্তি করে কিছু মানুষকে বেছে নিয়ে তাঁদের টাকা দেওয়া। 

প্রশ্ন উঠবেই, গরিবের জন্য তো গ্রামীণ কর্মসংস্থান যোজনা আছে। কাজের বিনিময়ে মজুরি— যাকে ‘কন্ডিশনাল ক্যাশ ট্রান্সফার’ বলতে পারি। সেটার বদলে নগদ হস্তান্তরের ব্যবস্থায় বাড়তি লাভ কী? সত্যি কথা বলতে, একশো দিনের কাজ আর মিনিমাম ইনকাম গ্যারান্টি, দুটোরই ভাল-মন্দ দু’দিকই আছে।এনআরইজিএ-র যেমন সবচেয়ে বড় সুবিধা, যাঁরা নিতান্তই নাচার, একমাত্র তাঁরাই গায়েগতরে খেটে এই সামান্য মজুরি নিতে আসবেন। ফলে, যাঁদের জন্য এই প্রকল্প, তার সুফল মূলত তাঁদের কাছেই পৌঁছবে। এতে সরকারের খরচ কম। আর কেউ কাজ চাইলেই সরকার তখনই কাজের ব্যবস্থা করতে বাধ্য, ফলে এই প্রকল্প এক ধরনের বিমারও কাজ করে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, একশো দিনের কাজের ফলে বাজারে মজুরি বেড়েছে, ফলে এই প্রকল্পের পরোক্ষ সুফল যাঁরা প্রকল্পের সুযোগ নিচ্ছেন না, তাঁরাও খানিকটা পাচ্ছেন। এই প্রকল্প থেকে যে গ্রামীণ পরিকাঠামো গড়ে উঠছে, তারও সামাজিক মূল্য আছে।  

অন্য দিকে, প্রত্যক্ষ নগদ হস্তান্তরের সুবিধা বিস্তর। যেমন, রাজকোষ থেকে টাকা সরাসরি প্রাপকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যায় বলে পারিপার্শ্বিক বা প্রাতিষ্ঠানিক খরচ নেই। আমলা থেকে স্থানীয় ঠিকাদার, বিভিন্ন স্তরের ওপর নির্ভরশীলতাও নেই। যে হেতু এই নগদ হস্তান্তর নিঃশর্ত, এর কোনও ‘অপরচুনিটি কস্ট’ও নেই। একশো দিনের কাজের টাকা পেতে খাটতে হয়, সময় খরচ করতে হয়, মিনিমাম ইনকাম গ্যারান্টির ক্ষেত্রে সেই বালাই নেই। অর্থাৎ, এই টাকা পাওয়ার জন্য অন্য কিছু ছাড়তে হয় না। অর্থনীতির প্রাথমিক পাঠ বলবে, একশো দিনের কাজ আর নগদ হস্তান্তরে যদি সমান টাকা পাওয়া যায়, তবে দ্বিতীয় বিকল্পটা সব সময় ভাল, কারণ তাতে বাড়তি পাওয়া যাচ্ছে সময়টুকু। চাইলে সেই সময়ে কিছু বাড়তি টাকা আয় করতে পারেন কেউ, বা বিশ্রাম নিতে পারেন। 

কোনটা বাছব তবে? একশো দিনের কাজ, না সহায়ক আয়? কিন্তু দুটোর মধ্যে যে একটাকে বাছতেই হবে, সেই বাধ্যবাধকতা কোথায়? হ্যাঁ, টাকার জোগান একটা মস্ত চিন্তা। সেই প্রসঙ্গে আসার আগে আমাদের প্রস্তাবটা সংক্ষেপে বলি।  

ধরা যাক, মূল উদ্দেশ্য হল, সবার যাতে একটা ন্যূনতম আয়ের সুরক্ষা থাকে। যদি সবার আয় সহজেই জানা যেত, তা হলে এই ন্যূনতম আয়ের নীচে যাঁদের আয়, সরকার ঠিক সেই তফাতটা নগদ হস্তান্তরের মাধ্যমে পূরণ করে দিতে পারত। মুশকিল হল, ভারতে প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ অসংগঠিত ক্ষেত্রে নিযুক্ত। আয়কর বিভাগের আওতায় আছেন মাত্র ৫-৬ শতাংশ মানুষ। তাই জনসংখ্যার একটা বিপুল অংশের ক্ষেত্রে কার আয় কত, তা নির্ধারণ করা সোজা নয়। এক দিকে আয় ঠিক ভাবে জানা নেই, অন্য দিকে আয় কম বললে বিনা পরিশ্রমে বা ঝক্কিতে বাড়তি পয়সা পাওয়া যাবে— দুটো ব্যাপার মিললে অনেকে এই প্রকল্পের অন্যায় সুযোগ নিতে পারে। তার খরচ পোহাতে হবে করদাতাদেরই। 

আর একটা সম্ভাবনা হল, যাঁরা দারিদ্ররেখার তলায় তাঁদেরকে সমান পরিমাণে একটা নগদ হস্তান্তর করা হল। তার ওপরে যাঁদের আয়, সরকার তাঁদের কোনও প্রত্যক্ষ অর্থসাহায্য করবে না। এখানে দুটো সমস্যা। প্রথমত কে দারিদ্রসীমার নীচে, বিচার করা মুশকিল। আর, ন্যূনতম আয়সীমার তলায় আয় হলে সরকারের থেকে নগদ হস্তান্তর পাওয়া যাবে, তার ওপরে হলে কোনও সরকারি অর্থসাহায্য পাওয়া যাবে না, এমন নীতিতেও আগের প্রস্তাবের মতোই সমস্যা হতে পারে, কারণ মানুষের প্রবণতা হবে আয় কম দেখানো, অথবা কম উপার্জন করা। 

বরং ধরা যাক, সবাইকে একটা স্বল্প পরিমাণ আয় নগদ হস্তান্তরের ব্যবস্থা হল। তার জন্যে কারও আয় জানার কোনও প্রয়োজন রইল না, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আর প্যান কার্ড থাকলেই সেটা সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। রঙ্গরাজন কমিটির হিসেবকে ২০১৮-১৯ সালের মূল্যস্তরে ধরলে দারিদ্রসীমার গড় আয় দাঁড়াবে মাসে মাথাপিছু ১,৬০০ টাকার মতো। ধরা যাক সবাই শর্তহীন ভাবে এই অঙ্কটি, বা রাজস্বের পরিমাণ বুঝে তার থেকে কম একটা পরিমাণ, পাবেন। এখন, এই অঙ্কটি জীবনধারণের জন্যে খুবই অল্প। এ বার, পাশাপাশি এনআরইজিএ চালু থাকলে যাঁদের ইচ্ছে ও সাধ্য আছে, তাঁরা পরিশ্রম করে তাঁদের মোট আয় ওই নগদ হস্তান্তরের পরিমাণের থেকে বাড়াতে পারেন। অর্থাৎ, যে আয়ের নীচে কোনও মানুষের পক্ষে ন্যূনতম সুযোগসুবিধা সমেত বেঁচে থাকা মুশকিল, তার থেকে কম হারে যদি শর্তহীন নগদ হস্তান্তর দেওয়া হয়, তার সঙ্গে অন্য আয় যোগ করেও যদি ন্যূনতম আয়ের থেকে কম দাঁড়ায় তা হলে সরকারকে সেই তফাত মেপে সেই পরিমাণ অর্থ হস্তান্তর করতে হবে না। যাঁর যেমন প্রয়োজন, সেই অনুযায়ী একশো দিনের প্রকল্পে কাজ করে বাড়তি রোজগার করে নিতে পারবেন।   

যাঁরা শারীরিক শ্রমে অক্ষম, যেমন অসুস্থ মানুষ, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা বা শিশু, তাঁরা স্বভাবতই একশো দিনের কাজ প্রকল্পের সুযোগ নিতে অপারগ। আবার, গবেষণায় দেখা গিয়েছে, কর্মসংস্থান প্রকল্পের বাইরের কাজে মজুরির হার যত বাড়ে (কিন্তু এই প্রকল্পের হারের চেয়ে কম থাকে), ততই একশো দিনের কাজ প্রকল্পটি গরিবের জন্য অলাভজনক হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, শারীরিক ভাবে অক্ষম হোন বা না-ই হোন, সরকারি অর্থসাহায্য নিঃশর্তে এলে সবারই লাভ। কিন্তু আবার নিঃশর্তে মোটা টাকা দেওয়ার সামর্থ্য সরকারের নেই। অতএব, মাঝামাঝি ব্যবস্থা হিসেবে ভাবা যেতে পারে আমাদের প্রস্তাবটি— সরকার একটা অল্প-পরিমাণ সর্বজনীন ন্যূনতম আয়ের ব্যবস্থা করবে। তার বাইরে রোজগার করতে চাইলে থাকবে একশো দিনের কাজ। এতে আয় মাপার সমস্যা অথবা দারিদ্রভাতা পাওয়ার জন্যে কাজ কম করার প্রবণতা, দুটোই এড়ানো যাবে। 

কর্মক্ষমদের রোজগারের সুযোগ বেশি। তাতে আপত্তির কারণ নেই। শারীরিক বা বয়সজনিত কারণে যাঁরা কর্মক্ষম নন তাঁরা অন্তত সর্বজনীন ন্যূনতম আয় পাবেন। মানব উন্নয়নের সূচকগুলোয় এই বন্দোবস্তের বিপুল প্রভাব পড়বে। শুধু একশো দিনের কাজ দিয়ে তত দূর যাওয়া কঠিন। আবার, একশো দিনের কাজ তুলে দিলে খেটে উপার্জনের একটা বড় সুযোগ কেড়ে নেওয়া হবে।  

এই প্রস্তাবের সবচেয়ে কাছাকাছি আসতে পারে রাহুল গাঁধীর মিনিমাম ইনকাম গ্যারান্টি প্রকল্প। কারণ, যাঁর যত প্রয়োজন নিজের তাগিদেই খেটে তিনি সেই মত অনুদান পাবেন, তার জন্যে তাঁর আয় জানার দরকার হবে না। তবে এখনও অবধি এই প্রস্তাবের রূপরেখার বেশি কিছু পাওয়া যায়নি। টাকা কোথা থেকে আসবে, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা দরকার।

প্রশ্ন উঠবে, দুটো প্রকল্প পাশাপাশি চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য কি ভারতের আছে? মোট সরকারি খরচের মাত্র ২.৫ শতাংশ এনআরইজিএ-র খাতে ব্যয় হয়, যা হল জাতীয় আয়ের মাত্র ০.৩২ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের হিসেব অনুযায়ী, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যত অনুদান আছে, তা জাতীয় আয়ের প্রায় ১০.৬ শতাংশ এবং এর এক-তৃতীয়াংশ যায় সচ্ছল শ্রেণির মানুষের হাতে, যা সমর্থন করার কোনও যুক্তি নেই। সরকারি ব্যয়ের প্রায় ৩.১ শতাংশ চলে যায় শুধু সারের দামে ভর্তুকি দিতে। শুধু তা-ই নয়, সরকার প্রতি বছর নানা সংস্থাকে যে করের ছাড় দেয়, সেই অনাদায়ী রাজস্ব হল জাতীয় আয়ের ৬.৫ শতাংশ। সেখানে আমরা যদি জনপ্রতি ১০০০ টাকাও বেসিক ইনকাম হিসেবে সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে দিই, মোট ব্যয় হবে জাতীয় আয়ের ৫.৬ শতাংশ। এর সঙ্গে এনআরইজিএ-র খাতে ব্যয় যোগ করলেও মোট ব্যয় জাতীয় আয়ের ৬ শতাংশ ছাড়াবে না। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ছেঁটে এই খাতে খরচের টাকা বার করা সম্ভব।  

প্রশ্ন উঠতে পারে, যাঁরা দরিদ্র নন তাঁরাও সর্বজনীন ন্যূনতম আয় পাবেন, এটা কি সামাজিক ন্যায়ের বিচারে কাম্য? এই প্রকল্পের খরচ যদি অংশত আয়, বিলাসদ্রব্য বা সম্পদের ওপর নতুন কর বসিয়ে মেটানো হয়, তা হলে যাঁরা দরিদ্র নন তাঁদের কাছ থেকে সরকার যা দেবে তার বেশি আদায় করতে পারবে।  

আমাদের প্রস্তাবিত প্রকল্পের জন্যে করবৃদ্ধি বা অপ্রয়োজনীয় ব্যয়হ্রাসের মতো কাজগুলো করার সাহস কি সরকার দেখাতে পারবে? সেটা দীর্ঘ আলোচনার প্রশ্ন। আপাতত সে তর্ক থাকুক। কিন্তু এইটুকু বলা যায় যে, যতটা টাকা লাগবে তা দিতে না পারার মতো অবস্থা রাজকোষের নয়। আসল প্রশ্ন হল, গরিব মানুষের উন্নয়নকে কি সরকার এতখানি গুরুত্ব দিতে প্রস্তুত? এই প্রশ্নটা অর্থনীতির নয়। রাজনীতির। উত্তরও খুঁজতে হবে সেখানেই।

 

মৈত্রীশ ঘটক লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্স-এ অর্থনীতির শিক্ষক