একশো চুয়ান্ন বছর আগে বিষ্ণুপুর থেকে মান্দারনের পথে বাংলা উপন্যাসের জন্ম দিয়েছিলেন তিনি। আজ তাঁর জন্মদিন।

আজ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিন। বাঙালির অনেক প্রত্যাশার দায় এই বৃহৎ বাঙালিটিকে নিতে হয়েছে। কাঁঠালপাড়ায় বঙ্কিমের জন্মস্থান, দু’-চারটি সরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা তাঁর নাম-জড়িয়ে-থাকা স্কুল-কলেজে তাঁর মূর্তিতে নিয়মরক্ষার মাল্যদান ছাড়া, বিশেষ কোনও উদ্‌যাপন আজ এ বঙ্গে ঘটবে বলে মনে হয় না। অথচ, রবীন্দ্রনাথের আগে আধুনিক বাঙালি চিন্তাবিদ সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র ছাড়া, আর কেউ ছিলেন না।

বঙ্কিমচন্দ্র কেবল ঔপন্যাসিক বা প্রাবন্ধিক নন, এক গভীর চিন্তক। ধর্ম, রাজনীতি, সমাজনীতি এবং ইতিহাস সম্পর্কে তাঁর একটি নিজস্ব দর্শন ছিল। হিন্দুত্বে আস্থা রেখেও, সে দর্শন গভীর ও ব্যাপক। বঙ্কিমচন্দ্রের সেই হিন্দুত্বও নিছক কোনও দেবতার জয়ধ্বনি নয়, কোনও সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ‘আনন্দ মঠ’ উপন্যাসটির কারণে বঙ্কিমচন্দ্রকে সঙ্কীর্ণ হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রকট মূর্তি হিসেবে দেখার একটা ‘ট্র্যাডিশন’ আজও সমানে চলছে।

বঙ্কিমচন্দ্রের জাতীয়তা তার চেয়েও বড় কিছু। বস্তুত, ভারতীয় ইতিহাসে বঙ্কিমচন্দ্র জাতীয়তার অন্যতম স্রষ্টা। সে জাতীয়তার বোধ যতটা হিন্দু, তার চেয়েও বেশি আর্য। যে কোনও জাতীয়তারই মূলে থাকে গোষ্ঠীচেতনা, বঙ্কিমচন্দ্রের জাতীয়তারও ছিল। আর তার প্রধান নির্ভর ছিল বাঙালি ও বাংলা ভাষা। আরও বিশদে বললে, মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙালির গোষ্ঠীকে ভর এবং লক্ষ করেই ভারতবাসীর মধ্যে জাতীয়তার বোধ তৈরি করতে চেয়েছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। সফল কতটা হয়েছিলেন, সে বিচার ইতিহাস করবে। কিন্তু এ কথা মনে রাখা ভাল, যে ঊনবিংশ শতাব্দীর সেই দ্বিতীয়ার্ধে ভারতবর্ষে বাঙালির এই কোণঠাসা অবস্থা হয়নি। তখনও বাংলার ভাবনা আর সমগ্র ভারতের ভাবনার মধ্যে আজ আর কালের তফাত ছিল।

বঙ্কিমের ইতিহাস-চিন্তা তাই রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের ‘প্রথমশিক্ষা বাঙ্গালার ইতিহাস’ (১২৮১) বইটির সমালোচনা-সূত্রে প্রকাশিত হয় বঙ্কিম সম্পাদিত ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায়। ওই সমালোচনায় বঙ্কিম লিখছেন, ‘সাহেবেরা যদি পাখী মারিতে যান, তাহারও ইতিহাস লিখিত হয়, কিন্তু বাঙ্গালার ইতিহাস নাই। গ্রীন্‌লণ্ডের ইতিহাস লিখিত হইয়াছে, মাওরি জাতির ইতিহাসও আছে, কিন্তু যে দেশে গৌড়, তাম্রলিপ্তি, সপ্তগ্রামাদি নগর ছিল, যেখানে নৈষধচরিত, গীতগোবিন্দ লিখিত হইয়াছে, যে দেশ উদয়নাচার্য্য, রঘুনাথ শিরোমণি ও চৈতন্যদেবের জন্মভূমি, সে দেশের ইতিহাস নাই। মার্শমান্, স্টুয়ার্ট্ প্রভৃতি প্রণীত পুস্তকগুলিকে আমরা সাধ করিয়া ইতিহাস বলি; সে কেবল সাধ-পুরাণ মাত্র’।

কিন্তু শুধু ইতিহাসের জন্য ইতিহাস নয়, ‘অহঙ্কার অনেক স্থলে মনুষ্যের উপকারী; এখানেও তাই। জাতীয় গর্ব্বের কারণ লৌকিক ইতিহাসের সৃষ্টি বা উন্নতি; ইতিহাস সামাজিক বিজ্ঞানের এবং সামাজিক উচ্চাশয়ের একটি মূল। ইতিহাসবিহীন জাতির দুঃখ অসীম। এমন দুই একজন হতভাগ্য আছে যে, পিতৃপিতামহের নাম জানে না; এবং এমন দুই এক হতভাগ্য জাতি আছে যে, কীর্ত্তিমন্ত পূর্ব্বপুরুষগণের কীর্ত্তি অবগত নহে। সেই হতভাগ্য জাতিদিগের মধ্যে অগ্রগণ্য বাঙ্গালী’।

ইতিহাস, অনেক জায়গায় আবেগ এবং কিছুটা অনৈতিহাসিকতা-মিশ্রিত ইতিহাসও তাই বঙ্কিমসাহিত্যের প্রধান অবলম্বন। বাংলা উপন্যাসের জন্মও তাই হল ইতিহাসের হাত ধরে, ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে, বিষ্ণুপুর থেকে মান্দারনের পথে। নির্জীব, এলানো বাংলা ভাষার প্রবাহকে ঝুঁটি ধরে নাড়িয়ে দিয়ে শুরু হল ‘দুর্গেশনন্দিনী’, বাংলা ভাষায় প্রথম সার্থক উপন্যাস, ‘৯৯৭ বঙ্গাব্দের নিদাঘশেষে একদিন একজন অশ্বারোহী পুরুষ বিষ্ণুপুর হইতে মান্দারণের পথে একাকী গমন করিতেছিলেন। দিনমণি অস্তাচলগমনোদ্যোগী দেখিয়া অশ্বারোহী দ্রুতবেগে অশ্ব সঞ্চালন করিতে লাগিলেন। কেন না, সম্মুখে প্রকাণ্ড প্রান্তর; কি জানি, যদি কালধর্মে প্রদোষকালে প্রবল ঝটিকা বৃষ্টি আরম্ভ হয়, তবে সেই প্রান্তরে, নিরাশ্রয়ে যৎপরোনাস্তি পীড়িত হইতে হইবে। প্রান্তর পার হইতে না হইতেই সূর্যাস্ত হইল; ক্রমে নৈশ গগন নীলনীরদমালায় আবৃত হইতে লাগিল। নিশারম্ভেই এমন ঘোরতর অন্ধকার দিগন্তসংস্থিত হইল যে, অশ্বচালনা অতি কঠিন বোধ হইতে লাগিল। পান্থ কেবল বিদ্যুদ্দীপ্তিপ্রদর্শিত পথে কোন মতে চলিতে লাগিলেন’।

বাংলা ভাষার এই দীপ্তি দেড়শো বছরেরও বেশি আগে সম্ভব হয়েছিল। নিছক উপন্যাস লেখার জন্য উপন্যাস লিখলে তা সম্ভব হত বলে মনে হয় না। বঙ্কিমচন্দ্র সে পথে যাননি।  বাংলা ভাষাকে তিনি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, তার প্রকাশযোগ্যতাকে বিস্তার দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই বিস্তারকে আমরা মনে রাখিনি। ‘সাহিত্যসম্রাট’ তকমা লাগিয়ে আদর করে শিকেয় তুলে রেখেছি বঙ্কিম রচনাবলিকে। আর, প্রয়োজনমতো ব্যবহার করেছি তাঁকে। ব্যবহার করার সময়, নিজেদের স্বার্থেই মনে রাখিনি সমগ্র বঙ্কিমকে। ‘আনন্দ মঠ’-এর প্রথম দিককার সংস্করণগুলি উল্টে দেখিনি, দেখলে চোখে পড়ত, সেখানে সন্তানদলের প্রতিপক্ষ ইংরেজ। ভাল করে তাঁর প্রবন্ধগুলি পড়িনি। পড়লে খুঁজে পেতাম এই বঙ্কিমকেও, যিনি বলছেন, ‘মনুষ্যজাতিমধ্যে কাহারই বহুবিবাহে অধিকার নীতিসঙ্গত হইতে পারে না’। এর সঙ্গে যোগ করছেন পাদটীকা, ‘কদাচিৎ হইতে পারে বোধ হয়। যথা অপুত্রক রাজা, অথবা যাহার ভার্যা কুষ্ঠাদি রোগগ্রস্ত। বোধ হয় বলিতেছি, কেন না, ইহা স্বীকার করিলে পুরুষের বিপক্ষেও সেইরূপ ব্যবস্থা করিতে হয়’।

১৮৩৮-এর ২৬ জুন জন্ম হয়েছিল বঙ্কিমচন্দ্রের। আর বছর কুড়ি পরে তাঁর জন্মের দু’শো বছর হবে। তখন এ বঙ্গে উদ্‌যাপনের ঢল নামবে হয়তো। আপাতত মূর্তিপুজোর অভ্যেস ছেড়ে, ‘বঙ্কিমী-বাংলা’ বলে দূরে সরিয়ে না রেখে, নতুন করে পড়া শুরু করা যাক গোটা বঙ্কিমকে।

লেখক উপ পরিচালক, গ্রন্থন বিভাগ, বিশ্বভারতী