রাজ্যে ১৩ থেকে ১৮ বছরের সব ছাত্রীই এখন ‘কন্যাশ্রী’। পাশাপাশি, আর্থ-সামাজিক অবস্থানের উপর ভিত্তি করে শিক্ষা বিস্তারের একাধিক সরকারি প্রণোদনার ফলে, সরকারি হিসাব অনুসারে, রাজ্যে স্কুল-ছুট মেয়ের সংখ্যা প্রায় ১১.৫ শতাংশ কমে গিয়েছে। রাজ্যে বাল্যবিবাহও ক্রমশ কমছে। ২০১৮তে মাধ্যমিকে মোট এগারো লক্ষ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫৬ শতাংশই মেয়ে। মাত্র কয়েক বছর আগেও মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়া ছেলে ও মেয়ের উল্টো অনুপাত দেখা যেত। ২০১১তেই মাধ্যমিক পরীক্ষায় সাফল্যের দিক থেকে মেয়েরা বেশ পিছিয়ে ছিল। ২০১৪ সালের পর থেকে ছবিটা বদলাতে শুরু করে। ২০১৮ সালে মাধ্যমিকে দেখা যাচ্ছে, মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের পিছিয়ে পড়ার ব্যবধান ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে। মাদ্রাসা বোর্ডের পরীক্ষায় মেয়েরা আরও এগিয়ে। ২০১৮তে হাই মাদ্রাসার পরীক্ষায় পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি পরীক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশই মেয়ে। গত কয়েক বছর ধরে মেধা তালিকাতে মেয়েরাই মধ্যমণি।

সরকারি প্রণোদনা তো আছেই, সমাজের মনও বদলাচ্ছে। মেয়েরা লেখাপড়া শিখলে পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষার ক্ষেত্রে সুবিধা হবে বলে মনে করছেন অনেক অভিভাবক। আদিবাসী মেয়েরা ছাড়া, অন্যান্য পিছিয়ে পড়া সামাজিক গোষ্ঠী, বিশেষত মুসলমান মেয়েদের মধ্যেও লেখাপড়ার প্রতি ঝোঁক বেড়েছে। এ ছাড়া, ব্যাঙ্কের কাজ ও সরকারি অন্য সুযোগসুবিধা নিতে আজকাল অফিসে ছোটাছুটি করতে হয়। বাড়ির মেয়ে-বৌরা লেখাপড়া জানলে তাতে সুবিধা। কাজেই, ইদানীং শিক্ষিত পাত্রী খোঁজার উপর ঝোঁক বেড়েছে।

কিন্তু, ছেলেগুলো কোথায় গেল? শিক্ষাক্ষেত্রে মেয়েদের সাফল্য গর্বের বিষয়, কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ছেলেদের ছিটকে পড়াতে কি উদ্বেগের কারণ নেই? অভিজ্ঞতা বলছে, সমাজ এখনও ছেলেদের ‘সংসারের রক্ষক ও ত্রাতা’ হিসেবে দেখে। আর্থিক অবস্থা নির্বিশেষে, খুব অল্প বয়স থেকেই পুত্রসন্তানকে পরিবারের আর্থিক দায়ভার নেওয়ার মন্ত্র শেখানো হয়। পৌরুষের এই চাপ মাথায় নিয়ে আর্থিক ভাবে অসচ্ছল পরিবারের সন্তানদের স্কুলে যেতে হয়। ছেলেদের মধ্যে স্কুল-ছুট প্রবণতার কারণ খুঁজতে গিয়ে কথা বলে কিংবা সমীক্ষা করে দেখা যাচ্ছে, লেখাপড়ায় ছেলেদের প্রবল অনাগ্রহ। অথচ একই পরিবার থেকে মেয়েরা বিদ্যালয়ে যাচ্ছে এবং নিষ্ঠার সঙ্গে পড়াশুনা করছে। 

এখনও সামাজিক ঝোঁকটা হচ্ছে লেখাপড়ার সঙ্গে অর্থকরী কাজের যোগ ও আর্থিক উন্নতির সম্পর্কের উপরেই। ফলে, অনেক ক্ষেত্রেই লেখাপড়া শেষ করে কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য সাধন না ঘটা, প্রধানত সরকারি চাকরি জোগাড় করতে না পারার জন্যই ‘লেখাপড়া শিখে কী লাভ?’ সিদ্ধান্তটা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। লেখাপড়া করে সময় নষ্ট না করে, অল্প বয়স থেকে হাতের কাজ ও অন্য কাজ শিখলে আর্থিক ভাবে সচ্ছলতার একটা সুযোগ থেকে। শিক্ষার ‘অপরচুনিটি কস্ট’ বেশ চড়া।

লেখাপড়া শিখলে উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ বাড়ে, এ কথা জানা। তবে লেখাপড়া করলেই সরকারি অথবা অন্য সংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান হবে, এ কথা জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে কি? সরকারি পরিসংখ্যান থেকে পরিষ্কার, সংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের সুযোগ রাজ্যে ক্রমশ সঙ্কুচিত হচ্ছে। কেন্দ্র ও রাজ্য স্তরে সরকারি নতুন প্রকল্পের ঘোষণা হলেও প্রকল্প রূপায়ণের জন্য মানবসম্পদের পর্যাপ্ত  নিয়োগ হচ্ছে না। এ রাজ্যের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও শোচনীয়। বাম আমলে শিল্প ধ্বংস হয়ে কর্মসংস্থানের পথ বন্ধ হয়েছিল, এই আমলেও তার সুরাহা হল না। এমনকি, শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় অস্বচ্ছতার কারণে ২০১২ সালের পর থেকে শিক্ষক নিয়োগ থমকে আছে। কবে শিকে ছিঁড়বে, সেই ভরসায় ছেলেরা বসে থাকতে নারাজ। তারা কর্মসংস্থানের পথ খুঁজে নিচ্ছে।

আর তাই রাজ্য থেকে হাজার হাজার ছেলে ভিন্‌ রাজ্যে অসংগঠিত ক্ষেত্রে যোগ দিতে পাড়ি দিচ্ছে। রাজ্যে সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত জেলা মুর্শিদাবাদ, মালদা ও উত্তর দিনাজপুরের অল্পবয়সীদের দলে দলে ভিন্ রাজ্যে, এমনকি মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। সম্প্রতি কেরল সরকার সে রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকদের অবস্থা জানতে এক সমীক্ষা করে। তাতে দেখা যায়, সেখানকার প্রতি জেলায় পশ্চিমবঙ্গ থেকে যাওয়া লক্ষাধিক অল্পবয়স্ক শ্রমিক বিভিন্ন অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করে। এই অল্পবয়সী ছেলেদের এই সময় স্কুলে থাকার কথা।

সুযোগ সাম্যের জন্য দীর্ঘ লড়াইয়ের ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে মেয়েদের অগ্রগতি হয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে ছেলেদের পিছিয়ে পড়াও বিপুল অসাম্য তৈরি করবে, যা অন্য ধরনের সামাজিক সমস্যার জন্ম দিতে পারে। দিচ্ছেও। আমরা কি তার আগমনের প্রতীক্ষাতেই বসে থাকব?

 

প্রতীচী ইনস্টিটিউট –এ কর্মরত