• কাজী নুদরত হোসেন।
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

পথে নেমেই রাষ্ট্রকে পথ দেখাচ্ছে ওরা

Youth are showing direction to the whole nation
প্রেসিেডেন্সি কলেজের ছাত্রদের ধর্না। ফাইল চিত্র

স্বস্তিহীনতার কুয়াশাঘেরা এক অচেনা সময়ের আবর্তে আমরা আটকা পড়েছিলাম বেশ কয়েকটা দিন। দমবন্ধ সেই অসহনীয়তার ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে আসার রাস্তা কী করে মিলবে, নিত্যকার চেনা ছন্দের জীবনযাপনে আবার আমজনতা কী ভাবে সুস্থিতি নিয়ে ফিরবে— এ দুশ্চিন্তা সচেতন নাগরিক মাত্রেই সেই সময়টায় করেছেন। সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনকে কেন্দ্র করে অশান্তির জন্য উদ্বেগ আর আশঙ্কার এক অস্বাভাবিক আবহে ক্রমশ দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল জনজীবন। সাম্প্রদায়িক বিভেদচেতনাকে আরও চাগিয়ে তোলার কৌশলী প্রক্রিয়াও এক শ্রেণির রাজনৈতিক কারবারি সন্তর্পণে চালাচ্ছিলেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছিল। রাষ্ট্রনৈতিক এ সমস্যার জট এখনও না কাটলেও দমবন্ধ ভীতিময় পরিবেশটা কিছুটা কেটেছে। তাই,যাবতীয় দুর্ভাবনাকে পাশে রেখেই এখন আমজনতা, স্বাভাবিক গতানুগতিক জীবনের ছন্দটা খুঁজে পেতে চাইছে।

অসমে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তৈরি জাতীয় নাগরিক পঞ্জি বা এনআরসি-র চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ ও তার পরিণামে উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিতে ঘটতে থাকা ঘটনার ঢেউ যে বাংলাতেও এসে পড়ছে এবং এখানকার জনমনকে আন্দোলিত করছে, সেটি বিলক্ষণ বোঝা যাচ্ছিল। ১১ অগস্ট রাজ্যসভায় পাশ হওয়া ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল’ রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরে আইনে পরিণত হওয়ার পর থেকেই অসম, ত্রিপুরায় জনরোষের ভয়াবহ চিত্র প্রচারমাধ্যমে আসতে থাকে। অসমে উদ্দাম বিক্ষোভ, অগ্নিসংযোগ, পুলিশের গুলিচালনায় একাধিক প্রাণহানির ঘটনায় উদ্বিগ্নতা যখন ক্রমশ বাড়ছে, তখনই আমাদের রাজ্যের কয়েকটি জায়গায় লাগামহীন তাণ্ডব জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলল। সরকারি সম্পত্তিতে অবিবেচকের মতো আগুন ধরানোর ঘটনাও ঘটতে দেখা গেল। সাম্প্রদায়িক গণ্ডগোলের হাড় হিম করা আশঙ্কায় শান্তিকামী শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষজন তখন ভেতরে ভেতরে সন্ত্রস্ত হয়ে উঠছিলেন।

এ রাজ্যে অশান্তির গতি যখন একটু স্তিমিত হল, প্রতিবাদ কিংবা সমর্থনের লড়াইটা যখন মিটিং-মিছিলকে আশ্রয় করে আপাতস্বস্তির পথ খুঁজে নিচ্ছে, তখনই প্রতিবাদ আন্দোলনের গতিস্রোত বাংলার সীমা ছাড়িয়ে দেশের বিস্তৃত ক্ষেত্রে ছড়িয়ে গেল। দেশের অগণিত শহর-জনপদে সাধারণ মানুষের জমে ওঠা ক্ষোভ, বিস্ফোরিত রূপ নিয়ে বেরিয়ে আসতে দেখা গেল। এই প্রথম যেন একটা ভিন্নতর গণ-জাগরণের ছবি ফুটে উঠল দেশ জুড়ে। প্রশাসনের বিধি নিষেধকে উপেক্ষা করে অগণিত মানুষের বিক্ষোভ প্রদর্শনের ঘটনায় দেশে এখনও এক টালমাটাল পরিস্থিতি। সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন এবং নাগরিকপঞ্জি তৈরির পক্ষে যাঁরা ছিলেন, হঠাৎ উত্তাল হয়ে ওঠা বিক্ষোভ আন্দোলনের ব্যাপকতায় তাঁরাও যেন বেসামাল।

লক্ষণীয় এটাই যে, বৃহত্তর যে জনজাগরণ তা স্পষ্টরূপে আবর্তিত হচ্ছিল বিভেদচেতনার বিরুদ্ধে, ভারতবর্ষের শাশ্বত ঐক্যভাবনাকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে। সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা  জাতীয় নাগরিকপঞ্জির বিষয় নয়, দেশের গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেরক্ষতার মৌলিক আদর্শ রক্ষার লড়াইটাই তখন দেশব্যাপী মুখ্য হয়ে সামনে চলে এসেছে। আর এই যে দেশপ্রেমসঞ্জাত সমন্বয়চেতনার অভূতপূর্ব জাগরণ, তার বৈতালিকের ভূমিকায় দলবদ্ধ ভাবে অবতীর্ণ হতে দেখা যাচ্ছে দেশের ছাত্রসমাজকে। সাম্প্রতিক কালের প্রেক্ষাপটে যে ঘটনা অনেক কিছুর আশা দেখাচ্ছে বলে অনেকের অভিমত। শিক্ষার্থী সমাজের সমবেত প্রতিবাদে গলা মেলাল এ দেশের অগণিত আমজনতা। দেশের গৌরবময় সংবিধানের ‘কালো অক্ষরের শৃঙ্খলে বন্দী’ বহুত্ববাদী চেতনার আলোকে, ধর্মবর্ণ নির্বিশেষ ভারতবাসীর হৃদয়ে হৃদয়ে পৌঁছে দিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অসংখ্য ছাত্রছাত্রী হাতে হাত লাগিয়েছে। পথে নেমেছে। স্লোগান তুলেছে বিভেদকামীদের বিরুদ্ধে। পুলিশের লাঠি খেয়েছে। আহত হয়েছে। কিন্তু, লড়াইয়ের ময়দান ছাড়েনি। 

এই প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মানসিকতা তথা নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে নেতিবাচক একটা প্রচার বরাবরই শোনা যায় এ দেশে।অনেকেই আশঙ্কার বাণী শোনান যে, এখনকার ছাত্রছাত্রীরা প্রতিষ্ঠার ইঁদুর দৌড়ে নাম লিখিয়ে ক্রমাগত আত্মকেন্দ্রিক, কেরিয়ার-সর্বস্ব হয়ে পড়ছে। সমাজ,রাষ্ট্র ইত্যাদি বিষয়ে সম্যক ভাবে চিন্তাভাবনা করবার আগ্রহ ও অবসর তাদের নেই। কিন্তু, সব আলোচনা, পর্যালোচনাকে অসার প্রমাণ করল দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অগণিত ছাত্রছাত্রী। দেশের নাগরিকমণ্ডলীর সবচেয়ে সজীব ও শক্তিশালী অংশ যে এমন ঐক্যবদ্ধ জাগ্রত রূপ নিয়ে অভাবিত আবেগে জেগে উঠবে, তার আগাম অনুমান কারও ছিল বলে মনে হয় না। চলমান এই সময়কে ‘অচ্ছে দিন’ বা ‘বুরে দিন’, নিজের ইচ্ছেমতো যে-ভাবেই চিহ্নিত করা হোক না কেন, খণ্ডকালের ইতিহাসে ছাত্র-যুবশক্তির এই ঐক্যবদ্ধ চেতনার জাগরণ জাতির কাছে অবশ্যই নতুনতর এক ‘অচ্ছে দিন’-এর বার্তাবহ হয়ে রইল।

দেশে সাম্প্রদায়িক ভেদভাবনার আবহ হয়তো ছাত্রসমাজের একটা বিরাট অংশের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিচ্ছিল। দেশীয় অর্থনীতির সাম্প্রতিক হালহকিকত নিয়েও উদ্বিগ্নতা তাদের স্বাভাবিক। তবু, সব কিছুকে ছাপিয়ে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বহুত্ববাদী আদর্শের উপরে আঘাতের শঙ্কাটাই একযোগে তাদের রাস্তায় নেমে আসার কারণ বলে ধরা যেতেই পারে। ১৫ ডিসেম্বরের রাতে রাজধানী দিল্লির জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের হস্টেলে ঢুকে ছাত্রছাত্রীদের উপরে পুলিশের বেনজির আক্রমণের ঘটনা, দেশব্যাপী ছাত্রছাত্রীদের নীরবতা আর নির্লিপ্তির সব বাঁধকে যেন ভেঙে দিয়েছিল অকস্মাৎ। সারা দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ছাত্রছাত্রীদের মিলনক্ষেত্র এই কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েক জন ছাত্রের গুরুতর আহত হওয়ার সংবাদ বাইরে আসতেই আলোড়ন দেখা দিল শিক্ষার্থীসমাজে। আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাও এর মাঝে ঘটে গেল। দু’টি ক্ষেত্রেই আহত ছাত্রছাত্রীদের জাতধর্ম নয়, নিজের মাতৃভূমির কিছু সতীর্থের উপরে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের ঘটনাই সহস্র সবুজ মনে আগুন ধরালো যেন। রবিবারের সেই রাতেই দিল্লি ইউনিভার্সিটি, জেএনইউ, জামিয়ার ছাত্রছাত্রীরা সম্মিলিত ভাবে দিল্লি পুলিশের প্রধান কেন্দ্রে বিক্ষোভে শামিল হল। পরের দিন প্রতিবাদ আন্দোলনে দেশের চল্লিশটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়-সহ বিভিন্ন রাজ্যের অগণিত কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের যোগদানে বিষয়টি অন্য মাত্রা পেল। নজিরবিহীন ভাবে বিভিন্ন আইআইটি এবং আইআইএমের পড়ুয়ারাও নেমে এল পথে।

কোনও রকম হিংসাশ্রয়ী উন্মাদনার পথে না গিয়ে দেশজুড়ে নিজেদের বিক্ষোভকে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ অরাজনৈতিক আন্দোলনের রূপ দিতে সক্ষম হল ছাত্রছাত্রীরা। তাদের হাতেধরা ফেস্টুনের রঙে-রেখায়, প্ল্যাকার্ডের লেখায় কোথাও ধর্মীয় বিভেদমূলক আইনের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার, কোথাও বা সংবিধানের প্রতি আনুগত্যের অঙ্গীকার, আবার কোথাও সাম্প্রদায়িক ঐক্যের প্রতি দায়বদ্ধতার আহ্বানবাণী। তাদের প্রতিবাদের পথচলায় বারবার যেন একটি সুরই ধ্বনিত হচ্ছিল তখন—‘আমরা চলিব পশ্চাতে ফেলি পচা অতীত / গিরিগুহা ছাড়ি খোলা প্রান্তরে গাহিব গীত।’

পরবর্তী ঘটনা প্রবাহের গতিপ্রকৃতি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যাবে, তা এখনই বলা যায় না। ছাত্রসমাজের একটা অংশ এখনও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পথেই আছে। তাদের বিরুদ্ধ মতের ছাত্রসমাজও যে নেই, তা নয়। গণতান্ত্রিক দেশে সেটা থাকাটাও স্বাভাবিক। তবে, আমজনতার ভবিষ্যতের শান্তি ও স্বস্তির অনেকটাই নির্ভর করে আছে এ দেশের রাজনৈতিক দলগুলির নীতিনির্ধারকদের উপর। জামিয়া মিলিয়ার আইনের ছাত্রী অনুজ্ঞা ঝা-এর কান্না আর কাতরকণ্ঠে উচ্চারিত কথার মর্মবাণী তাঁদের হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছতে পেরেছে কিনা, তা সময়ই বলবে।

 

লেখক কয়থা হাই স্কুলের শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী, মতামত নিজস্ব

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন