চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় বিবেচনাধীন এবং বাদ পড়া ভোটারের দীর্ঘ তালিকা প্রকাশ পাওয়া ইস্তক জল্পনা ভাসছে, কার নাম কেন বাদ পড়েছে বা কে রয়েছেন বিবেচনাধীন। কিন্তু কমিশনের তরফে খুঁটিনাটির ব্যাখ্যা আসেনি। তবে পরে অতিরিক্ত তালিকাগুলি প্রকাশ পাওয়া শুরুর পরে বিশ্লেষণে অনেকটাই স্পষ্ট, বাদ পড়ার তালিকায় কারারয়েছেন নিশানায়।
গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের প্রাথমিক খসড়া তালিকা। তাতে অনুপস্থিত, মৃত, স্থানান্তরিত এবং একাধিক জায়গায় নাম থাকা ভোটারদের ধরে রাজ্যে ৫৮ লক্ষ নাম বাদ পড়ে। এর পরে নানা তথ্যগ্রাহ্য অসঙ্গতির সূত্র ধরে চলতে থাকে শুনানি পর্ব। গত ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকায় আরও পাঁচ লক্ষ ৪৬ হাজার নাম বাদ পড়ে। বিবেচনাধীনের আওতায় থাকে অন্তত ৬০ লক্ষটি নাম। এর পরে ধাপে ধাপে আরও চারটি অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশ হলে, কমিশনের একটি সূত্র দাবি করেছে, ওই ৬০ লক্ষের ৪৫ শতাংশ মতো বাদ পড়েছে। কিন্তু কমিশনের তরফে বিষয়টি স্পষ্ট ভাবে খোলসা করা হয়নি। তবে তথ্য বিশ্লেষকেরা প্রথম দু’টি অতিরিক্ত তালিকা বিশ্লেষণ করায়, বাদের কোপে কারা পড়ছেন তা আরও খানিকটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সবর ইনস্টিটিউট নামে সামাজিক ন্যায় সংক্রান্ত একটি সংস্থার বিশ্লেষণে রাজ্যের সীমান্তবর্তী একটি কেন্দ্র কোচবিহারের সিতাইকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। সেই সিতাইয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে সাবির আহমেদ, অশীন চক্রবর্তীরা দেখিয়েছেন, প্রধানত নারী এবং মুসলিম ভোটারদের উপরেই বাদ পড়ার কোপ এসে পড়েছে।
দেখা গিয়েছে, সিতাই কেন্দ্রটিতে এমনিতে কম-বেশি ৩৫ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটার রয়েছেন। গত ডিসেম্বরের খসড়া তালিকায় দেখা গিয়েছিল সামগ্রিক ভাবেও ৩৪.৮০ শতাংশ মুসলিম বাদ পড়েছেন। নথির জোরে বা পুরনো ভোটার হিসেবে সংখ্যালঘুরা মোটামুটি সুরক্ষিতই বলে মনে করা হয়। কিন্তু ফেব্রুয়ারির চূড়ান্ত তালিকায় দেখা যায় মুসলিমদের ৫৮.৬ শতাংশ চলে এসেছেন তথ্যগ্রাহ্য অসঙ্গতির আওতায়। এবং দু’টি অতিরিক্ত তালিকা ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে বাদ পড়া ভোটারদের মধ্য়ে মুসলিম হচ্ছেন ৮৭.৯৫ শতাংশ। খসড়া তালিকা থেকেই বাদের কোপে মেয়েদের নামও ছিল দলে ভারী। পরের ধাপেও সেই ধারা অটুট। দ্বিতীয় অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশ পর্যন্ত সিতাইয়ে বাদ পড়া মেয়েদের নাম ৫৪.৭৫ শতাংশ এবং বাদ পড়া মুসলিম নাম ৫৪.০৪ শতাংশ। ফেব্রুয়ারির শেষের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা ধরলে সিতাইয়ে ভোটার সংখ্যা আগের থেকে কমেছে। ২০২১এর ভোটার তালিকার থেকে তা মাত্র হাজার দেড়েক বেশি।
কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী সঙ্গীতা বাসুনিয়া আঙুল তুলছেন, ‘‘বেছে বেছে মুসলিম এবং মহিলাদের নাম বাদ দিতে নিশানা করা হয়েছে, সন্দেহ নেই। বিশেষত মুসলিম মহিলাদের নাম নিয়ে অজ্ঞতা বা বিভ্রান্তির মাসুল তাঁরা অনেকেই দিয়েছেন।’’ সিপিএমের জেলা কমিটির সদস্য শুভ্রালোক দাসও বলছেন, বাদ পড়া বা বিবেচনাধীন নামগুলি নিয়ে দিনহাটার মহকুমা শাসকও অন্ধকারে। বহু বার বলা সত্ত্বেও পঞ্চায়েতে কোনও নাম টাঙানো হয়নি।
সিতাইয়ে বিজেপির আহ্বায়ক দীপক রায় অবশ্য বলছেন, যা নাম বাদ পড়েছে, তা নিয়ম মেনেই হয়েছে। তবে সীমান্তবর্তী এলাকায় বাদ পড়া ভোটারদের পরিচয়ের বৈধতা নিয়ে তিনিও প্রশ্ন তুলছেন না। তৃণমূল বা বিজেপি অবশ্য নাম বাদ পড়ার বিষয়টি ভোটে প্রভাব পড়বে না বলে দাবি করছে। দু’পক্ষই সম্ভাব্য জয়ের আস্ফালনে মুখর। বাদ পড়া বা বাদের আশঙ্কায় থাকা ভোটাররা তাতে নিশ্চিন্তি খুঁজে পাচ্ছেন না।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)