খোলা আকাশের নীচে, ছাদে, বালুচরে কিংবা সবুজ ঘাসে চিত হয়ে শুলেন। মাথার উপরে অজস্র ঝলমলে বিন্দু দেখতে দেখতে খুঁজতে শুরু করলেন শুকতারা, কালপুরুষ কিংবা সপ্তর্ষি মণ্ডল! সরলরেখায় চারটি উজ্জ্বল বিন্দু চোখে পড়তেই ভাবলেন, সেটি নিশ্চয়ই কালপুরুষের ধনুক কিংবা চারটে তারার বর্গক্ষেত্রে একটি নক্ষত্র জ্বলজ্বল করতে দেখে ধরে নিলেন, সেটি নির্ঘাত কালপুরুষের শিকারি কুকুর ‘লুব্ধক’। রাতের আকাশে এমন তারা গোনার অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। এ যুগে দাঁড়িয়ে মনে হতে পারে সে সব ‘গত জন্মের’ কথা! কারণ, এ কালে তেমন সুযোগ নেই!
রাতবিরেতে খোলা আকাশের নীচে শোয়ার ব্যবস্থা যদি বা করেও ফেললেন, তার পরেও তারার দেখা মিলবে না। আকাশ-ঢাকা ইমারত আর রাতভর না ঘুমোনো বিলবোর্ডের আলোর দৌলতে অমাবস্যার রাতেও মিশকালো হয় না আকাশ। হয়তে তাই মানুষ তারার দেখা পেতে পাড়ি দিচ্ছেন অন্যত্র। যেখানে আলোর দূষণ অন্ধকারে জেগে ওঠা তারাদের বিরক্ত করে না।
তাই যে সব ভ্রমণপ্রেমী মানুষ এত দিন পাহাড়, নদী, জঙ্গল, ঐতিহাসিক স্থান দেখতে বেড়াতে বেরোতেন, এখন তাঁরাই বেড়ানোর পরিকল্পনা করছেন রাতের আকাশে ঝলমলে তারা দেখার জন্য। যাচ্ছেন ভিন্ জেলায়, ভিন্ রাজ্যে, এমনকি, কখনও-সখনও ভিন্ দেশেও। বেছে নিচ্ছেন এমন সব জায়গা, যেখানে আকাশে আলোর দূষণ নেই। সূর্য ডুবলেই আঁধারে ডোবে চারপাশ। রাতের আকাশে চোখ পাতলে একটি-দু’টি নয়, কোটি কোটি হিরের কুচির মতো তারা ছড়িয়ে থাকে আকাশময়। মনে হয়, মুঠো মুঠো হিরের বালি কেউ ছড়িয়ে দিয়েছে আকাশের কালো জমিতে।
ভাগ্য সহায় হলে তেমন তেমন জায়গায় ছায়াপথেরও দেখা মেলে। আর তেমনই বিরল দৃশ্যের সাক্ষী হতে ভ্রমণপ্রেমীদের মধ্যে কদর বাড়ছে ‘অ্যাস্ট্রো ট্যুরিজ়ম’ বা তারা দর্শনের ভ্রমণের।
দেশে কোথায় কোথায় তারা দেখতে যাচ্ছেন মানুষ?
উত্তরবঙ্গ
উত্তরবঙ্গের বহু অল্পপরিচিত পাহাড়ি গ্রাম রয়েছে, যা পাহাড়ি শহরাঞ্চলের আলোর দূষণকে আড়াল করে ঝকঝকে আকাশ দেখার সুযোগ দেয়। তেমন পাহাড়ি গ্রামে তারা দেখার সুযোগ প্রচুর। ঝাণ্ডি, রিশপ, বক্সা, লামাহাটা, তিনচুলে, সিটং, নামথিং পোখরি লেক ইত্যাদি জায়গা তো বটেই, সিঙ্গলিলা ন্যাশনাল পার্কের বিভিন্ন ট্যুরিস্ট স্পট— যেমন, সন্দাকফু, টোংলু, চিতরে, রিমবিক, ধোতরে, টামলিং, জাউবাড়ি, শ্রীখেলার মতো জায়গাতেও দূষণমুক্ত পরিচ্ছন্ন আকাশের দেখা মিলতে পারে। এর মধ্যে সন্দাকফু-সহ সিঙ্গলিলার কিছু এলাকা, সিটং, পোখরি লেক থেকে ছায়াপথ দর্শনেরও সুযোগ আছে।
পশ্চিমবঙ্গের সিঙ্গলিলা জাতীয় উদ্যান থেকে ছায়াপথ দর্শন।
দক্ষিণবঙ্গ
রাজ্যের দক্ষিণ দিকের জেলাগুলিতে আলোর দূষণের মাত্রা বেশি। বাতাসের দূষণও অনেক সময় পরিচ্ছন্ন আকাশ দেখার অন্তরায় হতে পারে। যে কারণে প্রচণ্ড বৃষ্টির পরে আকাশ পরিষ্কার হলে তারা দেখা যায়। কারণ, তখন বাতাসে দূষণের মাত্রা কমে যায়। তবে দক্ষিণবঙ্গের কিছু প্রত্যন্ত এলাকায় তারা ভরা আকাশ দেখার সুযোগ রয়েছে। পশ্চিম মেদিনীপুরের গড়বেতা, গনগনির মতো গ্রামীণ এলাকায় কিংবা পূর্ব মেদিনীপুরের তাজপুর, মন্দারমণির মতো সমুদ্রোপকূলেও তারা দর্শন, এমনকি, ছায়পথ দর্শনের সুযোগ মিলতে পারে।
দক্ষিণবঙ্গের মন্দারমণি।
ডেবরিগড়-হিরাকুঁদ-ভিতরকণিকা, ওড়িশা
পড়শি রাজ্যের বারগড় জেলার ডেবরিগড় আলোর দূষণ বর্জিত এবং পরিচ্ছন্ন আকাশের জন্য তারা দর্শনে আগ্রহী পর্যটকদের কাছে প্রিয়। এখানকার নেচার ক্যাম্পে তারা দেখার সুব্যবস্থাও রয়েছে। রযেছে ‘স্টার গেজ়িং রুম’, টেলিস্কাপ এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন দূরবিন। এ খান থেকে বিভিন্ন গ্রহ, এমনকি নক্ষত্রপুঞ্জ দেখতে ভিড় জমান পর্যটকেরা। এ ছাড়া হিরাকুঁদ বাঁধ, ভিতরকণিকা এবং কিছু উপকূল অঞ্চলও তারা দর্শনের জন্য আদর্শ।
হানলে-প্যাংগং-নুব্রা, লাদাখ
প্যাংগং হ্রদ, লাদাখ।
লাদাখের প্যানগং লেকের চারপাশে অন্ধকার নামলেই আকাশের ‘প্রজেক্টরে’ শুরু হয় তারাদের স্লাইড শো। প্যানগং ঘিরে থাকা উপত্যকার কোলে হোটেল কিম্বা রিসর্টের বারান্দা থেকে পাওয়া যায় তারাদের 'গ্যালারি ভিউ'।
স্পিতি উপত্যকা, হিমাচল প্রদেশ
হিমাচল প্রদেশের স্পিতি উপত্যকা।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার ফুট উচ্চতায় এক শীতল মরুভূমি স্পিতি। এই জায়গাটি ‘অ্যাস্ট্রো-ফোটোগ্রাফার’দের স্বর্গরাজ্য। স্পিতির কিব্বর বা ল্যাংজা গ্রামের মতো উঁচুতে অবস্থিত জনপদগুলি থেকে আকাশের যে রূপ দেখা যায়, তা ভারতের আর কোথাও মেলা ভার। এখানে আকাশ এতটাই পরিষ্কার যে, টেলিস্কোপ ছাড়াই খালি চোখে ছায়াপথ স্পষ্ট দেখা যায়।
কচ্ছের রান, গুজরাট
গুজরাটের কচ্ছের রণ।
ধুধু সাদা নুনের মরুভূমি। তার উপর যখন রাতের আঁধার নামে, তখন ঝিকমিকে সাদা জমি আর আকাশের তারাদের মেলা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। বিশেষ করে শীতের রাতে কচ্ছের রানে আকাশ দেখার অভিজ্ঞতা অতুলনীয়। দিগন্ত বিস্তৃত খোলা আকাশ থাকার কারণে এখানে বিভিন্ন নক্ষত্রপুঞ্জও স্পষ্ট দেখা যায়।
জৈসলমের, রাজস্থান
থর মরুভূমির বালিয়াড়িতে তাঁবু খাটিয়ে রাত কাটান অনেকে। সেখান থেকেও তারা দেখার অভিজ্ঞতা হতে পারে অসাধারণ। শহরের আলো থেকে অনেকটা দূরে বালিয়াড়ির উপর শুয়ে আকাশ দেখলে মনে হতে পারে, তারারা ঠিক মাথার উপরেই ঝুলে রয়েছে।
বেনিতাল, উত্তরাখণ্ড
উত্তরাখণ্ডের বেনিতাল।
উত্তরাখণ্ডের চামোলি জেলার এই ছোট গ্রামটিকে ভারতের প্রথম ‘অ্যাস্ট্রো ভিলেজ’ হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। এখান থেকে আকাশ দেখার জন্য বিশেষ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র এবং গ্যালারিও তৈরি করা হয়েছে। হিমালয়ের কোলে বসে গ্রহ-নক্ষত্র চিনতে বেনিতাল যাচ্ছেন বহু তারা-পাগল মানুষ।
নীল আইল্যান্ড, আন্দামান ও নিকোবর
আন্দামান ও নিকোবরদ্বীপপুঞ্জের নীল আইল্যান্ড।
সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন শুনতে শুনতে তারা দেখার এমন রোমাঞ্চকর পরিবেশ খুব কম জায়গাতেই মেলে। রাতের সমুদ্রের গাঢ় নীল জল আর আকাশের গাঢ় রং মিলেমিশে যায় যখন, আকাশ ভরা তারার আলোর প্রতিফলনে তখন নীল আইল্যান্ডের সৈকত হয়ে ওঠে মায়াবী।
কুর্গ, কর্নাটক
কর্নাটকের কুর্গ।
দক্ষিণ ভারতের এই শৈলশহরে আকাশ অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। কুয়াশা না থাকলে কুর্গের আকাশ তারাময় হয়ে ওঠে। সেই দৃশ্য এতটাই মনভোলানো যে, সেখানকার হোমস্টে এবং রিসর্টগুলিতে এখন টেলিস্কোপের মাধ্যমে গ্রহ-নক্ষত্র দেখার ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে।