‘লড়াই চলবে’, নাম বাদে চোয়াল শক্ত শতায়ু বৃদ্ধার

উত্তর গোয়াড়ার মণ্ডলপাড়ায় বাস ছপিয়ার। ১৯৬০ সালে তাঁর স্বামী নিয়ামত শেখের মৃত্যু হয়। পরিচারিকার কাজ করে দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে বড় করেছেন। এখন তাঁর দেখাশোনা করেন মেয়ে আলিমা বিবি ও নাতিরা।

কেদারনাথ ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ০৫:২৮
ছপিয়া বিবি শেখ।

ছপিয়া বিবি শেখ। ছবি: জাভেদ আরফিন মণ্ডল।

শেষ কোন নির্বাচনে তিনি ভোট দেননি, মনে করতে পারেন না। সরকারি নথি অনুযায়ী, এখন তাঁর বয়স ১০১। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হলেও, নিজের সব কাজ নিজেই করতে পারেন। পূর্ব বর্ধমানের কালনা বিধানসভার হাটকালনা পঞ্চায়েত এলাকার সেই বাসিন্দা ছপিয়া বিবি শেখের নাম বাদ গিয়েছে ভোটার তালিকা থেকে। ভোটাধিকার ফিরে পেতে ট্রাইবুনালে আবেদন করেছেন শতায়ু ছপিয়া। তাঁর প্রশ্ন, ‘‘একশো বছর পার করে শুনতে হল, আমি নাকি অযোগ্য ভোটার। এত বছর তা হলে কী ভাবে ভোট দিয়ে এলাম!’’

উত্তর গোয়াড়ার মণ্ডলপাড়ায় বাস ছপিয়ার। ১৯৬০ সালে তাঁর স্বামী নিয়ামত শেখের মৃত্যু হয়। পরিচারিকার কাজ করে দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে বড় করেছেন। এখন তাঁর দেখাশোনা করেন মেয়ে আলিমা বিবি ও নাতিরা। আলিমা জানান, অন্তত বার তিরিশ ভোট দিয়েছেন তাঁর মা। গত বিধানসভা এবং লোকসভা নির্বাচনেও ভোট দেন। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) পর্বে পরিবারের সবার সঙ্গে, তাঁর ফর্মও পূরণ করে জমা দেওয়ার পরে, শুনানির নোটিস আসে।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ২ জানুয়ারি সন্ধ্যায় তাঁর বাড়িতেই শুনানির ব্যবস্থা করে কালনা ১ ব্লক প্রশাসন। ঘটনাচক্রে, সে দিনই ছিল তাঁর ১০১তম জন্মদিন। বৃদ্ধাকে কেক দিয়ে শুভেচ্ছা জানান প্রশাসনের প্রতিনিধিরা। তবে চূড়ান্ত তালিকায় তাঁর নাম ছিল ‘বিবেচনাধীন’। সম্প্রতি বৃদ্ধা জানতে পারেন, তাঁর এবং দুই নাতির নাম বাদ পড়েছে ভোটার তালিকা থেকে। পড়শিরা জানান, এই খবর পেয়ে ভেঙে পড়েন ছপিয়া। বার্ধক্য ভাতা বন্ধের আশঙ্কায় কান্নাকাটিও করেন।

বৃদ্ধার নাতি দুলাল শেখ বলেন, ‘‘২০০২ সালের ভোটার তালিকায় দিদিমার নাম ছিল। তা সত্ত্বেও কেন শুনানি হল, কেন নাম বাদ গেল, সবই আমাদের কাছে ধোঁয়াশা। ট্রাইবুনালে আবেদন জানানো হয়েছে।’’ ছপিয়ার বছর চারেকের ছোট বোন রহিমা বিবি বলেন, ‘‘দিদির সঙ্গে অনেক বার ভোট দিতে গিয়েছি। আমার নাম থাকলেও, দিদির নাম কেন বাদ, বুঝলাম না!’’

ওই বুথের বিএলও আজমা খাতুন বলেন, ‘‘ওঁর নাম বাদ যাওয়া আমার কাছেও অবিশ্বাস্য!’’ কালনার বিদায়ী বিধায়ক তথা তৃণমূল প্রার্থী দেবপ্রসাদ বাগের কটাক্ষ, ‘‘হয়তো উনি বিজেপিকে ভোট দেন না। তাই ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়েছে। গণতন্ত্রের নামে প্রহসন চলছে।’’ বিজেপি প্রার্থী সিদ্ধার্থ মজুমদারের পাল্টা দাবি, ‘‘এসআইআর নিয়ম মেনেই হচ্ছে। এটা রাজনৈতিক বিষয় নয়। নিজেকে বৈধ ভোটার হিসাবে প্রমাণ করার সুযোগ এখনও রয়েছে ওঁর সামনে।’’ তবে বীরভূমের দুবরাজপুরে বিজেপি সাংসদ তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের মন্তব্য, ‘‘এসআইআরের আগে এ রাজ্যে এমন ১১১টি আসন ছিল, যেখানে সংখ্যালঘু ভোট ২০ শতাংশের বেশি ছিল। ’২১ সালের নির্বাচনে সেই আসনগুলির ১০৬টি জিতেছিল তৃণমূল। এ বার এসআইআরের জন্য সব হিসাব গন্ডগোল হয়ে গিয়েছে।’’

গোড়ায় ভেঙে পড়লেও, এখন চোয়াল শক্ত ছপিয়ার। বলছেন, ‘‘ট্রাইবুনালে ছাড়পত্র পেলে, এ বারই ভোট দেব। তা না হলে, অধিকার বুঝে নেওয়ার লড়াই চলবে। ভবিষ্যতে আমি ভোট দেবই।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

SIR Election Commission

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy