শেষ দফায় ভোট ঢুকছে শহরেও, নজর বুথের ভিড়েই

প্রথম দফায় যেখানে ভোট হয়েছিল, তার অনেক এলাকা বিজেপির ‘শক্ত ঘাঁটি’ বলে পরিচিত ছিল। দ্বিতীয় দফায় দক্ষিণবঙ্গের যে আসনগুলিতে ভোট, সেগুলির বেশির ভাগ এলাকা তৃণমূল কংগ্রেসের ‘ঘাঁটি’ বলেই পরিচিত। এই দফায় যে ১৪২টি আসনে ভোট, তার মধ্যে ২০২১-এ ১৮টি বিজেপি, একটি আইএসএফ এবং বাকি ১২৩টিতেই জিতেছিল তৃণমূল।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ ০৫:২৩

—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।

রাজ্যে প্রথম দফার ভোটে নজর কেড়েছিল ভোটদানের হার। শুধু শতাংশের হিসাবে নয়, মোট ভোটদাতার সংখ্যাও ২১ লক্ষ বেড়েছিল। এই আবহে, আজ, বুধবার সাতটি জেলার ১৪২টি আসনে দ্বিতীয় দফার ভোট। এর মধ্যেই রয়েছে কলকাতা-সহ বিস্তীর্ণ শহরাঞ্চল। শহরে ভোটদানের হার কেমন থাকে, সে দিকে নজর রয়েছে গোটা রাজনৈতিক শিবিরেরই। এরই মধ্যে প্রথম দফার থেকেও এই-পর্বে বেশি সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনী, রাজ্য পুলিশ এবং ভোট-পর্যবেক্ষকেরা।

প্রথম দফায় যেখানে ভোট হয়েছিল, তার অনেক এলাকা বিজেপির ‘শক্ত ঘাঁটি’ বলে পরিচিত ছিল। দ্বিতীয় দফায় দক্ষিণবঙ্গের যে আসনগুলিতে ভোট, সেগুলির বেশির ভাগ এলাকা তৃণমূল কংগ্রেসের ‘ঘাঁটি’ বলেই পরিচিত। এই দফায় যে ১৪২টি আসনে ভোট, তার মধ্যে ২০২১-এ ১৮টি বিজেপি, একটি আইএসএফ এবং বাকি ১২৩টিতেই জিতেছিল তৃণমূল। এরই মধ্যে কলকাতা, দুই ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলির মতো জেলাগুলিতে ২০১১ থেকে বিভিন্ন নির্বাচনে কার্যত একচ্ছত্র তৃণমূল। ফলে, শাসক দলের এমন শক্ত জমিতে বিজেপি কতটা দাঁত ফোটাতে পারে, সেটার উপরে অনেকাংশে নির্ভর করছে তাদের নির্বাচনী সাফল্য। পাশাপাশি, শহরতলির বিভিন্ন এলাকায় বাম এবং আইএসএফের প্রচারে চোখে পড়ার মতো জনসমাগম হয়েছে। এর প্রতিফলন ভোট-বাক্সে দেখা যায় কি না, সে দিকেও নজর রয়েছে নানা শিবিরের।

এমন পরিস্থিতিতে ভোটের আগের দিন সব রাজনৈতিক দলই ভোটারদের উদ্দেশে নির্ভয়ে ভোটের আহ্বান জানিয়েছে। সন্ধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, “ভয় না-পেয়ে নিজেদের অধিকার রক্ষার স্বার্থে প্রত্যেকে শান্তিতে ভোট দিন।” ভোটারদের উদ্দেশে তাঁর পরামর্শ, “ভোট দেওয়ার পরে ‘ভিভি প্যাট’-এ দেখে নিন, আপনার দেওয়া প্রতীকেই আপনার ভোট পড়েছে কি না।” উল্টো দিকে, ভবানীপুরে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী, বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, “গ্রাম ৯৩% ভোট দিয়েছে। শহরের মানুষের কাছে আবেদন, ৯৫% ভোট দিন। নির্বাচন কমিশন এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভরসায় আমরা ভোটে লড়ছি না। মানুষের সমর্থনের জোরেই ভোটে লড়ছি। মানুষ এ বার পরিবর্তন করবেন।”

সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর বক্তব্য, ‘‘প্রথম দফার পরে বিজেপি ও তৃণমূল, দু’পক্ষই নিজেদের মতো আসন জয়ের দাবি করছে। আমরা আবেদন জানাচ্ছি, যে কোনও রকম প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে, নির্ভয়ে ভোট দিন। বিজেপির বিকল্প তৃণমূল নয়, তৃণমূলের বিকল্পও বিজেপি নয়। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কাজের দাবিতে তরুণ প্রজন্ম লড়ছে। নির্ণায়ক শক্তি হবে বামেরাই।’’ দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে রাজ্যের নানা জায়গায় যে সব ধরনের ঘটনা ঘটেছে, সে দিকে ইঙ্গিত করে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য অধীর চৌধুরী বলেছেন, ‘‘শেষ দফায় শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিয়ে আশাও আছে, থাকছে আশঙ্কাও। আমরা চাই, মানুষ শান্তিতে নিজের ভোট যাতে নিজে দিতে পারেন, সেটা নিশ্চিত করুক কমিশন।’’

ভোটকে কেন্দ্র করে কমিশনও কড়া ভূমিকা নিয়েছে। বিশেষ নজর রয়েছে ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলায়। সূত্রের খবর, ১৪২টি আসনের ৪৩৮৮টি বুথকে ‘অতি স্পর্শকাতর’ হিসাবে চিহ্নিত করেছে কমিশন। সংশ্লিষ্ট বুথগুলির ভিতরে দু’টি ও বাইরে একটি করে ক্যামেরা থাকবে। থাকবে অতিরিক্ত বাহিনীও। সংশ্লিষ্ট সব জেলা প্রশাসনকে ক্যামেরা ও ভুয়ো ভোট নিয়ে ফের এক বার সতর্ক-বার্তা দিয়েছে কমিশন। বলা হয়েছে, ক্যামেরায় ‘কারিকুরি’ হলে, বুথে পুনর্নির্বাচন হবে। ভুয়ো ভোটদানের অভিযোগেও হবে কঠোর আইনি পদক্ষেপ। কারণ, গোটা ভোট-চিত্র ক্যামেরায় ধরা থাকবে। বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত বলেছেন, “কেউ ভুয়ো ভোট দিলে, অন্যের হয়ে ভোট দিলে বা একাধিক বার ভোট দিলে, তাঁর ছবি থেকে যাবে। তাঁকে চিহ্নিত করে আইনি পদক্ষেপ করা হবে। এর শাস্তি এক বছর পর্যন্ত জেল।” পাশাপাশি, রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ আগরওয়াল জানিয়েছেন, সব পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে কথা হয়েছে। অভিযোগ হলেই পদক্ষেপ করা হবে। কমিশনের অনুমতি ছাড়া পুলিশ পর্যবেক্ষকেরা সরাসরি পদক্ষেপ করতে পারবেন না। কিন্তু গোলমাল-অশান্তি হলে সেই অনুমতি কমিশন দেবে। পুলিশ কর্তব্য পালন না-করলে পদক্ষেপ করা হবে। সিইও বলেছেন, “কেউ কোনও ক্ষতি করতে পারবেন না। গোটা প্রশাসন তৎপর। নিজের ভোট নিজে গিয়ে দিন।”

পাশাপাশি, রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে ভোটদানের হার কী হবে, তা নিয়ে চর্চা আছে। তৃণমূলের বক্তব্য, এ বারেও ৯০%-এর মতো ভোট পড়তে পারে এবং তাকে প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা বলে দেখাতে চাইবে বিজেপি। কিন্তু সেই ভোটদানের হার অস্বাভাবিক বা শাসক দলের বিরুদ্ধে ভোট নয়। তৃণমূলের হিসাব, এই ১৪২টি আসনে গত বার ভোটদানের হার ছিল প্রায় ৮৫%। এসআইআর-এর পর এই বারে মোট ভোটার কমেছে। ফলে, ’২১-এর সম সংখ্যক ভোট পড়লেও, ভোটদানের হার হবে ৯০.৫০%।

এরই মধ্যে তৃণমূলের রাজ্যসভার নেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন বলেছেন, “পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি যে বড় ভাবে হারবে, সেই ইঙ্গিত পেয়েই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, রাজ্যে দু’মাস কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকবে। পাশাপাশি, বিজেপি সরকার গড়া নিয়ে নিশ্চিত হলে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতিবিদ অশোক লাহিড়ীকে টিকিট না-দিয়ে তাঁকে নীতি আয়োগের উপাধ্যক্ষ হিসাবে নিয়োগ করত না।” এর সঙ্গেই, বিজেপি নেতা দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে হাইকমিশনার হিসাবে নিয়োগকে সামনে রেখেও তৃণমূলের বক্তব্য, জয় নিয়ে গোড়া থেকে সন্দিহান বলেই তাঁকে ভোটে দাঁড় করায়নি বিজেপি।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal Politics Last phase

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy