আত্মজা এবং বদলে যাওয়া দু’টি জীবন

পীড়িত পরিবারকে ভোটের ময়দানে এর আগে একাধিক বার দেখেছে এ রাজ্য। দেখেছে সেই পরিবারগুলির গতিপথ এবং বিবর্তন।

জাগরী বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:২৬
মেয়ে আজ নেই। মা ভোটে লড়ছেন। বাবা আছেন সহযোদ্ধা হয়ে।

মেয়ে আজ নেই। মা ভোটে লড়ছেন। বাবা আছেন সহযোদ্ধা হয়ে। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

একটি হত্যা এবং বদলে যাওয়া দু’টি জীবন।

পানিহাটিতে বিজেপি প্রার্থী হিসেবে আর জি কর হাসপাতালে ধর্ষিত-নিহত চিকিৎসকের মায়ের নাম লেখা থাকবে ইভিএমে। লেখা থাকবে না, এই কেন্দ্রে আদতে প্রার্থী হয়েছে একটি হত্যা এবং বদলে যাওয়া দু’টি জীবন। ‘প্রভাবশালী না হলে সুবিচার আদায় করা যাবে না এবং বিজেপিকে পাশে না পেলে প্রভাবশালী হওয়া যাবে না’— এই বিশ্বাস সেই বদলে যাওয়া দু’টি জীবনের অর্জন।

গেল বারের বিধানসভা ভোটে ওঁরা তিন জনে একসঙ্গে ভোট দিতে গিয়েছিলেন। বাবা-মা-মেয়ে। পাঁচ বছর পরে আবার ভোট এসেছে। মেয়ে আজ নেই। মা ভোটে লড়ছেন। বাবা আছেন সহযোদ্ধা হয়ে।

পীড়িত পরিবারকে ভোটের ময়দানে এর আগে একাধিক বার দেখেছে এ রাজ্য। দেখেছে সেই পরিবারগুলির গতিপথ এবং বিবর্তন। তার পরেও পানিহাটির মা-কে নিয়ে চর্চা কিছু বেশিই। কারণ যে পীড়িতের হয়ে সবচেয়ে বেশি আওয়াজ তুলেছে যে দল, পীড়িতেরা সাধারণত সেই দলেরই টিকিট নিয়েছেন এ যাবৎ। পানিহাটিতে কি ব্যত্যয় হল?

সন্তানহারা মা-বাবা কিন্তু তা মনে করছেন না। সিপিএমের তরফে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তাব আসেনি। “এলেও রাজি হতাম না। অত দুর্বল পার্টির সঙ্গে হাত মিলিয়ে লাভ কী?” কিন্তু আন্দোলনের অন্যতম চালিকাশক্তি তো ছিল ‘দুর্বলেরাই’! বাবা দাবি করলেন, “আন্দোলনের শুরুটা রাজনৈতিক ছিল না। পরে সিপিএম সেটা হাইজ্যাক করে। আমাদের পরিবারের মধ্যে থেকেই কেউ কেউ তার জন্য দায়ী। আর বিচারের দীর্ঘসূত্রিতার জন্যও সিপিএম দায়ী।” বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য আর বৃন্দা গ্রোভারের ভূমিকায় খুশি নন, আগেও বলেছেন ওঁরা।

সিপিএমে ‘বীতশ্রদ্ধ’ হয়েই কি তবে বিজেপিতে? সেটাও পুরোপুরি বলা যাচ্ছে না। কারণ ওঁদেরই কথায়, “প্রথম থেকেই আমরা বিজেপির সমর্থন সঙ্গে রাখতে চেয়েছি।” বিচারব্যবস্থার বর্তমান কাঠামোয় কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্তের মধ্য দিয়ে সুবিচার পেতে হলে, ওঁদের মতে বিজেপিই ভরসা। তৃণমূলকে সরাতে হলেও তা-ই। “সরকার যদি বদলায়, মনে করব জাস্টিসের একটা অংশ পেলাম।” সর্বার্থেই ‘জাস্টিস’-এর একমাত্র সোপান বিজেপি, ওঁরা নিঃসংশয়। মা বলছিলেন, “আমরা সেলিম স্যারকে বলেছিলাম। মীনাক্ষীকে বলেছিলাম। দীপ্সিতা-কলতান সবাইকেই বলেছিলাম, তোমাদের উপরমহলকে বলো, তিনটে সিটে যেন প্রার্থী না দেন।” কোন তিনটে সিট? পানিহাটি, খড়দহ, ব্যারাকপুর। অর্থাৎ নির্বাচনী যুদ্ধে আর জি কর একটা রাজনৈতিক ভূমিকা নিক, ওঁরা অবশ্যই চেয়েছিলেন। শুধু সিপিএম সেই রাজনীতিটা করুক, সেটা চাননি। বিরোধী ভোট ভাগ হোক, চাননি।

ভোটে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত সেই সূত্রেই। উপনির্বাচনে টিকিট দিতে চেয়েছিল তৃণমূল, নেননি। বিধানসভার জন্য বিজেপির তরফে প্রস্তাব আগেই ছিল। রাজি হননি। মনস্থির করলেন সিপিএম প্রার্থী দেওয়ার পরে। মায়ের কথায়, “ওরা বিভিন্ন ফেসবুক পেজে আর জি করের ভিডিয়ো শেয়ার করতে শুরু করল। দেখে খুব কষ্ট হয়েছিল। ঘরে বসে দু’জনেই কাঁদছিলাম। দুপুর ৩টের পর ভাত চাপিয়ে ওর বাবাকে বললাম, তুমি একটু কৌস্তভকে (বাগচী) ফোন করো তো! ফোনেই জিজ্ঞেস করলাম, এখানে প্রার্থী কে হচ্ছেন? কৌস্তভ বলল, নারায়ণ ব্যানার্জি। আমি বললাম, উনি তো সবে সিপিএম থেকে এলেন! তৃণমূলকে হারাতে পারবেন? আমি প্রার্থী হতে চাই। কৌস্তভ বলল, তা হলে নির্দল হয়ে দাঁড়িয়ে যান। আমি বললাম নির্দল কেন দাঁড়াব? বিজেপি আমাকে টিকিট দেবে না?”

বিজেপি টিকিট দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মাথায় হাত রেখেছেন। হাই কোর্টের নতুন নির্দেশে আশ্বাস মিলেছে। ‘জাস্টিস’ ক্রমে আসিতেছে।

জেএনএমে পড়তে যাওয়া মেয়ের জন্য ভোর ৪টেয় উঠে রান্না করতেন একটা সময়ে। মেয়ের মৃত্যুর পরেও অভ্যাসবশত সেই ৪টেতেই ঘুম ভাঙত। খাঁ খাঁ ঘর গিলে খেতে আসত। ৮টা-সাড়ে ৮টা অবধি জোর করে শুয়ে থাকতেন। এখন আবার ৬টায় ওঠা। প্রচারে বেরোনোর জন্য প্রস্তুত হওয়া। পরনের শাড়িতে লেখা— জাস্টিস ফর তিলোত্তমা, মেরুদণ্ড বিক্রি নেই, শক্তিরূপেণ সংস্থিতা।

আন্দোলন মঞ্চের প্রতি আস্থা হারিয়ে গিয়েছিল অনেক দিন। তার জায়গায় আজ ভরসা দিচ্ছে ভোটের টিকিট। দিচ্ছে ক্ষমতার আস্বাদ। প্রাত্যহিকতায় জুড়ে যাচ্ছে নতুন নতুন শব্দ— কার্যালয়, ক্যাম্পেন, কর্মসূচি। পুষ্পবর্ষণের মধ্য দিয়ে প্রচারের অলিগলিতে এগিয়ে চলেছেন মা। তাঁকে ঘিরে নবলব্ধ গৈরিক সেনানী আর আধাসেনার সুরক্ষা।

এমডি রেস্পিরেটরি মেডিসিন। বাড়ির দেওয়ালে পুরনো নেমপ্লেটটা তবু সেই আগের মতো। তার পাশে থোকা থোকা করবীগুচ্ছ। যেন হাসান আজিজুল হকের বিখ্যাত গল্পের শিরোনাম— আত্মজা ও একটি করবী গাছ। পানিহাটির ভোটের আখ্যানে শিরোনাম একটু আলাদা— আত্মজা এবং বদলে যাওয়া দু’টি জীবন।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Panihati BJP RG Kar Case

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy