ভোটের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আগে সাংবাদিক বৈঠক ডেকে প্রার্থীর হাতে দলের প্রতীক তুলে দেওয়া হচ্ছে! এ ছবি আগে পশ্চিমবঙ্গে কেউ কখনও দেখেছেন বলে মনে করতে পারছেন না। অন্য কোনও রাজ্যে কখনও এ রকম হয়েছে বলেও কারও স্মৃতি সাক্ষ্য দিচ্ছে না। অতএব, শুভেন্দু অধিকারীকে ঘিরে এই মুহূর্তে বিজেপি-তে যা ঘটছে, তা কিছুটা অভূতপূর্বই।
বিজেপি যে সচেতন ভাবেই সেই অভূতপূর্ব ছবি তৈরি করছে, তা-ও দলের নেতারা অস্বীকার করছেন না। কারণ, ভোট ঘোষণার পরে প্রথম বার পশ্চিমবঙ্গে এসে অমিত শাহ তেমন এক আবহ তৈরি করে দিয়ে গিয়েছেন। দলের সাম্প্রতিক কালের রীতি মেনে ‘মুখ্যমন্ত্রী মুখ’ ঘোষণা থেকে বিজেপি বিরতই থাকছে। কিন্তু এ নির্বাচনে রাজ্যে শুভেন্দুই যে বিজেপির সবচেয়ে বড় ‘মুখ’, সে বার্তা ক্রমশ স্পষ্ট করে তুলতে বিজেপি দ্বিধা করছে না।
নন্দীগ্রামের কর্মসূচিতে শুভেন্দু অধিকারী। ছবি: সংগৃহীত।
সোমবার হলদিয়ায় গিয়ে শুভেন্দু নন্দীগ্রাম আসনের বিজেপি প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন দাখিল করেছেন। শুভেন্দুর মনোনয়ন পেশ পর্ব যে একটি ‘বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা’, সে কথা প্রমাণ করতে বিজেপি চেষ্টার ত্রুটি রাখেনি। রবিবার থেকেই সে চেষ্টা শুরু হয়েছিল। কলকাতায় ৬ নম্বর মুরলীধর সেন লেনে বিজেপির রাজ্য দফতরে সাংবাদিক বৈঠক ডেকে রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য দলের প্রতীক সংক্রান্ত নথি তুলে দেন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দুর হাতে। শুধু তা-ই নয়, শমীক সেখানে দলের তরফে আনুষ্ঠানিক ভাবে ব্যাখ্যাও করেন যে, কেন শুভেন্দু এ বারের ভোটে জোড়া আসনে প্রার্থী। তিনি জানান, শুভেন্দু নিজেই মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে চেয়ে ভবানীপুরে প্রার্থী হওয়ার আর্জি জানিয়েছিলেন। তবে নন্দীগ্রাম যে আস্থা শুভেন্দুর উপরে রেখেছে, তা মাথায় রেখে দল তাঁকে নন্দীগ্রাম থেকেও সরাতে চায়নি। তাই দু’টি আসনেই তাঁকে প্রার্থী করা হয়েছে।
সোমবার শুভেন্দুর মনোনয়ন পেশ পর্বে তাঁর সঙ্গে কোন কোন নেতা থাকছেন, তা-ও রবিবারই ঘোষণা করেছিল বিজেপি। কেন্দ্রীয় নেতা তথা দেশের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান তো বটেই, রাজ্য বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি দিলীপ ঘোষও যে শুভেন্দুর সঙ্গে সোমবার থাকবেন, তা আগাম জানিয়ে বিজেপি ‘উৎসাহ’ বাড়িয়ে তোলার কৌশল নিয়েছিল। ঘটেছেও তেমনই। সোমবার হলদিয়ায় মনোনয়ন জমা দেওয়ার মিছিলে শুভেন্দুর আয়োজনে আসা সংগঠিত ভিড় তো ছিলই। রথের আদলে তৈরি ট্রাকে শুভেন্দু-দিলীপকে একসঙ্গে দেখতে জমায়েতও ছিল চোখে পড়ার মতো। দিলীপ ট্রাকে দাঁড়িয়ে রাস্তার ধারের জমায়েতের দিকে পুষ্পবৃষ্টি করতে করতে এগোচ্ছিলেন। দলের কর্মী-সমর্থকরা সে দৃশ্যে কতটা উৎসাহিত, তা টের পেয়ে এক সময়ে ধর্মেন্দ্র সরেই যান শুভেন্দুর পাশ থেকে। সেখানে দাঁড় করিয়ে দেন দিলীপকে।
শুভেন্দু অধিকারীর পাশে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। ছবি: সংগৃহীত।
আগামী ২ এপ্রিল ভবানীপুর আসনে শুভেন্দুর মনোনয়ন পেশ করার কথা। বিজেপি সূত্রের দাবি, সে দিন রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতার পাশে দেখা যেতে পারে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে। বিজেপি-র তরফে আনুষ্ঠানিক ভাবে শাহের সেই সফরসূচি সম্পর্কে কোনও ঘোষণা এখনও করা হয়নি। কিন্তু শাহ সে দিন শুভেন্দুর মিছিলে থাকলে ভবানীপুরের লড়াই নিঃসন্দেহে আরও বড় মাত্রা পাবে। এমনিতেই বিরোধী দলনেতা স্বেচ্ছায় মুখ্যমন্ত্রীর ‘খাসতালুকে’ ভোটে দাঁড়িয়ে তাঁকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ভবানীপুর সরগরম। এ বার ভবানীপুরের জন্য শুভেন্দুর মনোনয়ন জমা দেওয়ার মিছিলে শাহ হাজির হয়ে গেলে লড়াই শুধু মমতা বনাম শুভেন্দু থাকবে, নাকি শাহও পরোক্ষে সে লড়াইয়ের অংশীদার হয়ে যাবেন, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছে।
নন্দীগ্রাম আসনের জন্য মনোনয়ন জমা দিলেন শুভেন্দু। ছবি: সংগৃহীত।
শুধু শাহের কর্মসূচি নয়, ভবানীপুরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কর্মসূচিও আগেই নির্ধারিত হয়েছে। প্রচারের শেষ লগ্নে মোদী কলকাতায় রোড শো করবেন বলে বিজেপি সূত্রে আগেই জানানো হয়েছিল। সে রোড শো যে ভবানীপুর ছুঁয়েই যাবে, তা-ও জানানো হয়েছিল। এ বার সম্ভাব্য ‘শাহি’ কর্মসূচির কথাও শোনা যাচ্ছে। অর্থাৎ, ভবানীপুর আসনে মমতা বনাম শুভেন্দু লড়াইকে বিজেপি যে এ বারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় ‘রাজনৈতিক ঘটনা’ হিসাবে তুলে ধরতে চাইছে, তা নিয়ে সংশয় নেই। সংশয়ের অবসান অবশ্য গত ২৮ মার্চই ঘটে গিয়েছিল। সে বার্তা দিয়েছিলেন শাহ। মমতার ১৫ বছরের শাসনকালের বিরুদ্ধে ‘চার্জশিট’ প্রকাশ করতে সে দিন কলকাতায় ছিলেন শাহ। সেই মঞ্চে শাহের বক্তব্যে তিন বার শুভেন্দুর নাম উচ্চারণ করেন। তিন বারই হয় রাজ্যে বিজেপি-কে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রশ্নে, নয়তো তৃণমূলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার প্রসঙ্গে। রাজ্য বিজেপি-র আর কোনও নেতার নাম সে দিন শাহের মুখে শোনা যায়নি। মুখ্যমন্ত্রী মুখ হিসাবে কারও নাম ঘোষণা না-করলেও শুভেন্দু যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুখ, তা স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন শাহ। এ বার রাজ্য বিজেপির প্রথম সারিতে থাকা শমীক এবংদিলীপকেও একই লক্ষ্যে ময়দানে নামিয়ে দেওয়া হল। প্রতীক সংগ্রহ থেকে মনোনয়ন জমা, প্রচারপর্ব থেকে ভোটযুদ্ধ, প্রতিটি ধাপেই যে শুভেন্দুকে সবচেয়ে বড় ‘মুখ’ হিসাবে তুলে ধরতে ধরতেই বিজেপি ভোটের দিকে এগোবে, তা ক্রমশই স্পষ্ট হচ্ছে।