কলকাতা উত্তর, দক্ষিণ, উত্তর শহরতলি থেকে যাদবপুর— কলকাতা ও লাগোয়া অঞ্চলের এই চারটি সাংগঠনিক জেলায় বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি দৃশ্যত তলানিতে ছিল। এই এলাকার ২৮টি বিধানসভা কেন্দ্রের একটিতেও জয় আসবে কি না, তা নিয়েও সংশয় ছিল দলীয় স্তরে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, বিধানসভা ভোটে ২৮টির মধ্যে ১৮টি আসনে জিতেছে বিজেপি। রাজনৈতিক শিবিরের একাংশের দাবি, রাজ্য জুড়ে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি তীব্র প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা এবং হিন্দু ভোট একজোট হওয়াতেই কেল্লা ফতে হয়েছে। তবে উল্টো দাবি, রাস্তার আন্দোলনে ধারাবাহিকতা রেখেই জন-মনে আস্থা অর্জন করেছে বিজেপি।
কলকাতা উত্তর শহরতলি সাংগঠনিক জেলায় একমাত্র কামারহাটি আসন ছাড়া সব আসনেই বিজেপি জিতেছে। কলকাতা উত্তর সাংগঠনিক জেলাতেও তৃণমূলকে পিছনে ফেলে দিয়েছে পদ্ম-শিবির। এই চারটি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে রাজ্যের একাধিক ওজনদার মন্ত্রী ব্রাত্য বসু, শশী পাঁজা, অরূপ বিশ্বাস হেরেছেন। পরাজিত হয়েছেন দেবাশিস কুমার, অতীন ঘোষ, দেবব্রত মজুমদার (মলয়), শ্রেয়া পাণ্ডে, সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ও।
এই ‘সফল্যে’র নেপথ্যেই দলের একটি অংশ রাস্তার আন্দোলনের কথা বলছে। সেই সূত্রেই, ছোট-বড় নানা ঘটনাতেই সীমিত সাংগঠনিক শক্তি সত্ত্বেও উত্তর কলকাতা সাংগঠনিক জেলার নেতা-কর্মীদের বার বার অবরোধ, মিছিল, বিক্ষোভ করার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন অনেকে। উত্তর কলকাতা সাংগঠনিক জেলার সভাপতি তমোঘ্ন ঘোষ বলেছেন, “শহর লাগোয়া অঞ্চলের মধ্যে আমাদের জেলায় সব চেয়ে বেশি সন্ত্রাস হয়েছে। সেই সময় থেকে দলকে একটু একটু করে রাস্তায় নামানোর চেষ্টা করেছি। আজ তার সুফল মিলেছে।”
দক্ষিণ কলকাতা সাংগঠনিক জেলার ভবানীপুর কেন্দ্রে শুভেন্দু অধিকারী এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লড়াই অন্য মাত্রা পেয়েছিল। লোকসভা ভোটের ফলাফলের নিরিখে রাসবিহারী আসনও ছিল বিজেপির জন্য ‘সম্ভাবনাময়’। কিন্তু বেহালা পূর্ব ও পশ্চিম, এই দু’টি আসন দীর্ঘ দিন ধরেই কার্যত তৃণমূলের গড় বলে পরিচিত ছিল। সেখানেও দাপুটে জয় পেয়েছে বিজেপি। প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বেহালা পশ্চিম কেন্দ্রে এ বার প্রার্থী হয়েছিলেন রত্না চট্টোপাধ্যায়। তাঁকে হারিয়েছেন যুব মোর্চার রাজ্য সভাপতি ইন্দ্রনীল খাঁ। তিনি বলেছেন, “রাজ্যে কর্মসংস্থান নেই। আমরা ‘চাকরি চায় বাংলা’ কর্মসূচি যুবদের মধ্যে নিয়ে গিয়েছি। যুব সম্প্রদায় আমাদের প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করেছেন।” ইন্দ্রনীল তাঁর সংগঠন নিয়ে গোটা রাজ্যে বিভিন্ন বিষয়ে রাস্তায় থেকেছেন বছরভর। বেহালা পূর্ব থেকে জয়ী হয়েছেন বিজেপি প্রার্থী শংকর শিকদার। পাশাপাশি, যাদবপুর সাংগঠনিক জেলায় টালিগঞ্জ, যাদবপুর, সোনারপুর উত্তর ও দক্ষিণ আসনে জয় বিজেপির কাছেও চমক। কলকাতা লাগোয়া বিধাননগর, রাজারহাট-নিউটাউন, ব্যারাকপুরের মতো আসনেও চমক দিয়েছে বিজেপি। তবে বারাসত আসনে গোটা জেলার দলীয় প্রার্থীদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যবধানে জিতেছেন শঙ্কর চট্টোপাধ্যায়। তাঁর প্রার্থিপদ নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক বেধেছিল। রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য-ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত যুব নেতা সুবীর শীল টাকা নিয়ে শঙ্করকে প্রার্থী করেছেন, এই অভিযোগে দলেরই প্রাক্তন জেলা সভাপতি তাপস মিত্র নির্দল প্রার্থী হয়েছিলেন। তবে সব বিতর্ক উড়িয়ে দিয়েই শঙ্কর জিতেছেন ৩৪ হাজারেরও বেশি ভোটে।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার এক সদস্য মাসখানেক আগে বলেছিলেন, “এ বার চমক হতে চলেছে যাদবপুর।” ফল প্রকাশের আগে তাঁর অবশ্য মত ছিল, “কোথাও ঝড় হলে উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম দেখে হয় না। সব জায়গায় প্রভাব পড়ে।” বাস্তবেও তা-ই হয়েছে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)