E-Paper

ভাতার প্রলেপে ঢাকা পড়ছে না কাজের দাবি, নজরে পাখিরা

সাগরের বাসিন্দা পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার খোকনকে কাজের সন্ধানে উড়ে যেতে হয়েছে অসমের গুয়াহাটিতে।

মিলন হালদার

শেষ আপডেট: ১১ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৫৬
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

মুড়িগঙ্গায় ভেসেলের সঙ্গে উড়ে চলেছে পাখির ঝাঁক। কখনও উঠে যাচ্ছে অনেকটা উপরে। হঠাৎ নেমে আসছে নদীর জলে। ভেসেল থেকে কিচিরমিচির করা পক্ষীকূলের দিকে খাবার ছুড়ে দিচ্ছেন অনেক সাগরযাত্রী। পাখিদের দেখতে দেখতে শেখ খোকন বললেন, ‘‘ভাতা দিয়ে কী উন্নতি সম্ভব? চাই কর্মসংস্থান।’’

সাগরের বাসিন্দা পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার খোকনকে কাজের সন্ধানে উড়ে যেতে হয়েছে অসমের গুয়াহাটিতে। দু’দিনের জন্য এসেছেন বাড়িতে। ‘‘এখানে কাজের সুযোগ থাকলে কী ভিন্‌-রাজ্যে যেতে হত’’, প্রশ্ন খোকনের।

সাগর, কাকদ্বীপ, পাথরপ্রতিমা বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূল অবশ্য ভাতার ডানায় ভর করে ভোটের আকাশে উঁচুতে উঠতে চাইছে। শাসক দলের অধিকাংশ নেতা-কর্মীর কাছে ভাতা আর উন্নয়ন সমার্থক। সাগরের তৃণমূল প্রার্থী বঙ্কিমচন্দ্র হাজরা, কাকদ্বীপের তৃণমূল প্রার্থী মন্টুরাম পাখিরা তাই বলছেন, ‘‘দিদি (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) বাংলার মানুষকে লক্ষ্মীর ভান্ডার, যুব সাথী-সহ আরও কত শত ভাতা দিচ্ছেন। উন্নয়নের এই জোয়ারে বিরোধীরা দিশাহারা।’’ একই দাবি সাগরের শেখ আনোয়ার, সঞ্জীব পুরকাইতদেরও। তাঁদের কথায়, ‘‘সবুজ সাথী, কন্যাশ্রী—তৃণমূল কত কিছু দিচ্ছে। তাই তাদের ফের ক্ষমতায় আসা উচিত। বিজেপি নেতাদের মুখে শুধু ধর্মের কথা।’’

সাগর, পাথরপ্রতিমা, কাকদ্বীপে অবশ্য অন্য সুরও প্রবল। বাসিন্দাদের একটা বড় অংশের দাবি, এলাকায় কোনও কর্মসংস্থান হয়নি। তরুণ, যুবকেরা তাই পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ করতে ভিন্‌ রাজ্যে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। ভাতা দিয়ে সে কথা ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা হচ্ছে। পাথরপ্রতিমার সৌরভ দিন্দার প্রশ্ন, ‘‘ভাতা দিয়ে কী হবে? ১,৫০০ টাকায় সংসার চলে নাকি!’’ এলাকার চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছিলেন সুকুমার খাটুয়া। কেরলে রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। ভোটের জন্য ফিরেছেন রাজ্যে। সুকুমার বলেন, ‘‘আমার স্ত্রী লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকা পান। এলাকায় কাজ পাওয়া যায় না। ওই ভাতা দিয়ে কী হবে? লোকে বুঝতে পারছে না বলে টাকা নিচ্ছে।’’ কাকদ্বীপের মৎস্যজীবী প্রাণহরি দাসও জানান, এলাকায় সব সময় হাতের কাছে কাজ নেই বলে তাঁর তিন ছেলে কেরলে কাজ করতে গিয়েছেন। কর্মহীন তরুণদের বৈকালিক আড্ডা থেকে উড়ে আসছে প্রশ্ন, ‘‘আপনিই বলুন মাসে ১৫-২০ হাজার টাকার চাকরি ভাল, না ভাতা!’’

সাগরতটে কোনও রকমে মুদিখানার দোকান চালানো বধূ রুমা মণ্ডল জানান, তাঁর স্বামী বেকার। তিনি আর তাঁর শাশুড়ি ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর টাকা পান। রুমার কথায়, ‘‘কাজের বিকল্প কখনও লক্ষ্মীর ভান্ডার হতে পারে না। কিন্তু কাজ নেই। তাই লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকা নিচ্ছি। কিছু তো পাওয়া যাচ্ছে।’’ সাগরের চেমাগুড়ির বাসিন্দা শীর্ষেন্দু শিট বলছেন, ‘‘ছেলে সামনের বছর মাধ্যমিক দেবে। ও কি তার পরে যুব সাথীর লাইনে দাঁড়াবে? ভাতা খুবই অসম্মানের। কাজ চাই। পাল্টানো দরকার।’’

বিরোধী দলগুলিও এই বিষয়গুলিকে তুলে ধরেই জোরালো প্রচার চালাচ্ছে। কাকদ্বীপের সিপিএম প্রার্থী নারায়ণ দাস বলেন, ‘‘এলাকার হাজার হাজার মানুষ পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে বাইরে চলে গিয়েছেন। আমাদের লক্ষ্য স্থানীয় ভাবে কর্মসংস্থান করে তাঁদের ফেরানো।’’ পাথরপ্রতিমার বিজেপি প্রার্থী অসিত হালদারের কটাক্ষ, ‘‘প্রচুর ভাতা দিয়ে তৃণমূল এত উন্নয়ন করেছে, যে মানুষ তা দেখতেই পাচ্ছেন না। তাই বুথে-বুথে গিয়ে তৃণমূলকে উন্নয়নের পাঁচালি পড়ে শোনাতে হচ্ছে।’’ সাগর, পাথরপ্রতিমা, কাকদ্বীপে লড়াই এ বার চতুর্মুখী। কাকদ্বীপের কংগ্রেস প্রার্থী নাসিরুদ্দিন আহমেদের দাবি, ‘‘লড়াইটা শুধু বিজেপি আর তৃণমূলের মধ্যে হবে না। এই দুই দলের বাইনারি আমরা ভাঙতে পেরেছি। আমাদেরও অন্যতম দাবি স্থানীয় ভাবে এলাকার মানুষের জন্য কাজের বন্দোবস্ত করা। ’’

মুড়িগঙ্গার বুকে উঁচুতে উঠে যাচ্ছে পাখি। নেমেও আসছে। সেই মুড়িগঙ্গা নদীর উপরে সেতু তৈরি শুরু হয়েছে। বঙ্কিম হাজরা জানান, কাজ চলছে জোরকদমে। সেতু তৈরিতে খরচ পড়ছে এক হাজার ৭০০ কোটি টাকা। বিরোধীদের পাল্টা দাবি, ভোটের আগে লোক দেখানো কাজ হচ্ছে। ভোটের পরে সব বন্ধ হয়ে যাবে।

কাকদ্বীপে বিভিন্ন কারণে দলীয় প্রার্থী মন্টুরামের উপরে ক্ষুব্ধ তৃণমূলের একাংশ। সাগরের তৃণমূল প্রার্থীবঙ্কিম বলেন, ‘‘আমিও শুনেছি, মন্টুবাবুর বিরুদ্ধে পোস্টার দিয়েছে কে বা কারা। কিন্তু তাঁর কোনও দোষ নেই। মূলত, মন্টুবাবুর ভাইয়ের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।’’ মন্টুরাম দাবি করেন, গোষ্ঠী-দ্বন্দ্ব নেই। সব বিরোধীদের কারসাজি। আর ভাইয়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ উড়িয়েদেন তিনি।

সিপিএম, বিজেপির দাবি, দুর্নীতির টাকার ভাগবাঁটোয়ারা নিয়ে তৃণমূলের কোন্দল শুধু কাকদ্বীপে নয়, সাগর, পাথরপ্রতিমাতেও রয়েছে। পাথরপ্রতিমার তৃণমূল প্রার্থী সমীরকুমার জানার দাবি, ‘‘মানুষকে দেওয়া ভাতার মধ্যে দিয়ে রাজ্যের অর্থনৈতিক বিকাশ হচ্ছে। মানুষ আমাদের ভুল বুঝবেন না।’’

ভাতার ডানায় ভর করে অনেক উঁচুতে উড়ছে তৃণমূলের ভোটপাখিরা। স্থানীয় ভাবে কর্মসংস্থানের দাবি কি তাদের টেনে নামাবে? ‘কৃষকবন্ধু’ প্রকল্পের টাকা পাওয়া পাথরপ্রতিমার যুবক সুবীর গিরির মন্তব্য, ‘‘পাখি তো। বলা যায় না। সময় হলেই দেখা যাবে!’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

gangasagar

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy