মালদহে অশান্তির ঘটনায় বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশনকে একই বন্ধনীতে রেখে পাল্টা তোপ দাগলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একই সঙ্গে সংযমরক্ষা এবং প্ররোচনায় পা না-দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে দিলেন বার্তাও। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, “আমি তো আপনাদের সকলের হয়ে লড়ছি!”
বৃহস্পতিবার দুপুরে মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘিতে দলীয় প্রার্থীর সমর্থনে প্রচারসভা করেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই সভা থেকেই তিনি পাশের জেলা মালদহের ঘটনা নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।
মালদহের ঘটনা বিজেপির ‘পরিকল্পনাপ্রসূত’ বলে অভিযোগ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, “এটা ওদের গেমপ্ল্যান। বিজেপি চায় এখানকার নির্বাচন বাতিল করে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করতে।” মুর্শিদাবাদেরই সুতির সভায় আরও এক ধাপ এগিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে ‘চক্রান্তকারী’ বলে তোপ দাগেন মুখ্যমন্ত্রী। বলেন, “বিজেপি অনেক পরিকল্পনা করেছে। গভর্নমেন্ট অফ ইন্ডিয়া (ভারত সরকার) পরিকল্পনার দোসর। অমিত শাহ চক্রান্তের ব্লুপ্রিন্ট (নীল নকশা) তৈরি করছেন।” বিজেপির পাশাপাশি নাম না-করে মিম প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়েইসি এবং নিলম্বিত (সাসপেন্ড হওয়া) তৃণমূল বিধায়ক তথা নবগঠিত ‘আম জনতা উন্নয়ন পার্টি’-র প্রধান হুমায়ুন কবীরকে নিশানা করেন মুখ্যমন্ত্রী। বলেন, “হায়দরাবাদ থেকে কেউ উড়ে এল আর বিজেপি একটা গদ্দারকে টাকা দিয়ে আপনাদের উত্তেজিত করল। আপনাদের দিয়ে রাস্তা অবরোধ করাল, বিচারকদের ঘেরাও করাল। ফলাফলটা কী হল?”
প্রসঙ্গত, ওয়েইসি মূলত হায়দরাবাদেরই রাজনীতিক। তাঁর এবং হুমায়ুনের দল এই ভোটে জোট বেঁধে লড়াই করছে। মালদহ, মুর্শিদাবাদের মতো সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলাকে ‘পাখির চোখ’ করে প্রচারও শুরু করে দিয়েছেন ওয়েইসি-হুমায়ুন। ‘হায়দরাবাদ’ এবং ‘গদ্দার’ শব্দ ব্যবহার করে মুখ্যমন্ত্রী নাম না করে ওয়েইসি এবং হুমায়ুনকেই নিশানা করেছেন।
সাগরদিঘির সভায় মুখ্যমন্ত্রী আরও একবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, প্রশাসনিক কোনও বিষয়ে তাঁর আর কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। মালদহের ঘটনা নিয়েও প্রশাসনের তরফে তাঁকে কিছু বলা হয়নি বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “আমার হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে রাজ্যের বদনাম করা হয়েছে। নতুন মুখ্যসচিব (পরিস্থিতি) নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি। আমায় জানানওনি।” এই সূত্রেই কমিশনের আধিকারিক অপসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। কমিশনের উদ্দেশে তিনি বলেন, “দেখেছেন তো, যাঁদের নিযুক্ত করছেন, তাঁরা কেমন কাজ করছেন? যাঁরা আসলে কাজ করতেন, তাঁদের তামিলনাড়ু, কেরলে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তাঁরা চিনতেন, জানতেন। সবাই সব কিছু পারে না।”
মালদহের ঘটনায় রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সুপ্রিম কোর্ট। বৃহস্পতিবার ওই সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে রাজ্যের মুখ্যসচিব, রাজ্য পুলিশের ডিজি, মালদহের জেলাশাসক এবং পুলিশ সুপার (এসপি)-কে শো কজ় করেছে শীর্ষ আদালত। তাঁদের কারণ দর্শানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে সভায় বলেন, “ঠিক বলেছে সুপ্রিম কোর্ট।” তার পরেই আদালতের নির্দেশের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে তিনি বলেন, “আপনারা কি জানেন না, যাঁরা আন্দোলন করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে সিবিআই করেছে, এনআইএ করেছে?”
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার আশঙ্কায় বহু মানুষের ‘ন্যায্য ক্ষোভ’ রয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু সেই ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে আইন নিজেদের হাতে তুলে না-নেওয়ার অনুরোধও করেন তিনি। মমতা বলেন, “আপনাদের ন্যায্য ক্ষোভ রয়েছে। কিন্তু আইন হাতে তুলে নেবেন না। লড়াইয়ের রাস্তাটা বন্ধ করে দেবেন না। রাজ্যের বদনাম হয়েছে। নতুন মুখ্যসচিব সামলাতে পারেননি। আপনারা চান আমি অপমানিত হই? আর কত অপমানিত হব?” প্রতিশ্রুতি আদায়ে তাঁর উপর মানুষের বিশ্বাসকে বাজি ধরেছেন মমতা। সভামঞ্চের সামনে থাকা মানুষজনের উদ্দেশে তিনি বলেন, “যদি আমার উপর বিশ্বাস থাকে, তা হলে দয়া করে উত্তেজনায় পা দেবেন না। রক্ষা করুন বাংলাকে। নিজেদের অধিকার রক্ষা করুন। আমি তো বলেছি আপনাদের, কাউকে আমি বার করতে দেব না। কাউকে ডিটেনশন ক্যাম্পে যেতে হবে না।”
সাগরদিঘির সভায় মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে কমিশন পরিচালিত প্রশাসন। জনগণের উদ্দেশে মমতার পরামর্শ, “যাঁদের নাম বাদ পড়েছে তাঁরা আবেদন করুন। আমরা আপনাদের হয়ে ট্রাইবুনালে লড়ব।” নাম বাদ পড়ার কারণে বিচারকদের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই বলেও জানান তিনি।
ভোটার তালিকায় নাম বাদ পড়ার প্রতিবাদে বুধবার দফায় দফায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল মালদহের মোথাবাড়ি, সুজাপুর-সহ বিভিন্ন এলাকা। কলকাতা-শিলিগুড়ি (১২ নম্বর) জাতীয় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখায় জনতা। কালিয়াচক-২ ব্লক অফিসের বাইরেও বিক্ষোভ শুরু হয়। তখন ওই ব্লক অফিসের ভিতরে ছিলেন এসআইআর-এর কাজে নিযুক্ত সাত জন বিচারবিভাগীয় আধিকারিক। ব্লক অফিসে তাঁদের ঘেরাও করে রাখা হয়। বিকেল ৪টে থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত আটকে থাকার পর পুলিশ গিয়ে তাঁদের উদ্ধার করে। বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়িতে হামলার চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আন্দোলনকারীদের পাল্টা অভিযোগ, ঘেরাও হয়ে থাকা বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের উদ্ধার করার সময় পুলিশ লাঠিচার্জ করে। তার পর বিচারকদের নিয়ে কনভয় যখন যাচ্ছিল, তখন একটি গাড়ি একজন আন্দোলনকারীকে ধাক্কা মারে বলে বলে অভিযোগ।