ফর্ম-৬ জমা দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের তালিকায় অন্য রাজ্যের ভোটারদের নাম ঢোকাচ্ছে বিজেপি— এই অভিযোগ জানিয়ে মঙ্গলবার দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠি দিলেন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। চিঠিতে তিনি লিখেছেন, এই সংক্রান্ত অভিযোগ যদি সত্যি হয়, তা হলে তা অবৈধ, অসাংবিধানিক এবং অগণতান্ত্রিক কাজ হবে। জনগণের ভোটাধিকার রক্ষার বিষয়টিও নির্বাচন কমিশনকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন মমতা।
চিঠিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের উদ্দেশে মমতা লিখেছেন, “বিশ্বাসযোগ্য সূত্রে খবর পাওয়া গিয়েছে যে, সিইও অফিস (রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের কার্যালয়) এবং বিভিন্ন জেলায় প্রচুর সংখ্যায় ফর্ম-৬ জমা দিচ্ছেন বিজেপির এজেন্টরা। এটা ভোটার তালিকায় নাম তোলার রুটিন প্রক্রিয়া বলে মনে হচ্ছে না। বরং রাজ্যের বাসিন্দা নন, এমন মানুষদের নাম ভোটার তালিকায় ঢোকানোর অপচেষ্টা করা হচ্ছে।”
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা নন এবং রাজ্যের সঙ্গে কোনও রকম সম্পর্ক নেই, এমন মানুষদের নাম ভোটার তালিকায় ঢোকানোর চেষ্টা চলছে। একই ধরনের কাজ বিহার, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র এবং দিল্লির নির্বাচনেও হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করেন তৃণমূলনেত্রী।
একই সঙ্গে তৃণমূলনেত্রীর সংযোজন, “এটা খুবই উদ্বেগের বিষয় যে, নির্বাচন কমিশনারের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পশ্চিমবঙ্গের জনগণের গণতান্ত্রিক এবং মৌলিক অধিকারকে খর্ব করছে। বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-এর কারণে বহু মানুষ ভোটাধিকার হারিয়েছেন। ২০০ মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে।” রাজ্যে নির্বাচনী আচরণবিধি কার্যকর হয়ে যাওয়ায় মমতা মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে নয়, তৃণমূলের সভানেত্রী হিসাবে দলের প্যাডেই জ্ঞানেশকে চিঠি লিখেছেন।
মঙ্গলবারই পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনার জনসভায় মমতা অভিযোগ করেছিলেন যে, অন্য রাজ্যের ভোটারদের নাম এ রাজ্যের ভোটার তালিকায় ঢোকানো হচ্ছে। বিজেপি এবং কমিশনকে নিশানা করে তিনি বলেন, “এত লোকের নাম বাদ গিয়েছে। সেই নামগুলো এখনও তোলা হল না। আর নতুন করে বিহার, রাজস্থান, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ থেকে নাম এনে ঢোকাচ্ছে। বাংলাকেও ট্রেনে করে নিয়ে এসে ভোট দেওয়ানোর চেষ্টা করছে।” ওই সভায় তিনি এ-ও বলেন যে, “লক্ষ রাখুন কোথায় কী হচ্ছে। আমরা প্রমাণ করে দিয়েছি বস্তা বস্তা কাগজ জমা পড়েছে। কালকেও নির্বাচন কমিশনে ৩০ হাজার নাম জমা দিয়েছে। তারা বাংলার কেউ নয়। কেন দিয়েছে? কারণ ওরা বাংলাকে বধ করতে চায়।”
প্রসঙ্গত, সোমবার সন্ধ্যায় রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও)-এর কার্যালয়ে গিয়েছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সিইও দফতর থেকে বেরিয়ে অভিষেক অভিযোগ করেন যে, ফর্ম-৬ ভর্তি বস্তা নিয়ে সোমবার কমিশনে ঢুকেছিলেন বিজেপির লোকজন। উদ্দেশ্য, বিহার, উত্তরপ্রদেশের ভোটারদের পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় ঢোকানো। মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়ালকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তিনি বলেন সিইও অফিসের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ প্রকাশ করতে।
অভিষেক সিইও দফতরে ঢোকার সময়ে জানিয়ে যান, বড় চুরি ধরা পড়েছে। বেশ কিছু ক্ষণ পর বেরিয়ে আসেন তিনি। তার পর সিইও দফতরের বাইরের সাংবাদিক বৈঠক করে কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগের পর অভিযোগ করেন। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের অভিযোগ, নিজেদের ভোট সুরক্ষিত করতে বাইরের ভোটারদের পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় ঠাঁই দেওয়ার চেষ্টা করছে বিজেপি। সে জন্যই সোমবার বস্তাভর্তি ফর্ম-৬ নিয়ে সিইও দফতরে জমা দিয়ে গিয়েছেন কয়েক জন।
ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ব্যবহৃত হয় ফর্ম-৬। এই ফর্মটি প্রধানত দুই শ্রেণির আবেদনকারী ব্যবহার করেন। এক, যাঁরা প্রথম বারের মতো ভোটার হওয়ার জন্য আবেদন করছেন। দুই, যাঁরা এক সংসদীয় বা বিধানসভা কেন্দ্র থেকে অন্যটিতে বাসস্থান পরিবর্তন করছেন। বয়স এবং বাসস্থানের প্রমাণস্বরূপ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র-সহ এই ফর্মটি পূরণ করে জমা দেওয়া ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করার জন্য একটি বাধ্যতামূলক পদক্ষেপ। অভিষেকের দাবি, সেই ফর্ম নিয়ে সরাসরি সিইও দফতরে গিয়েছিলেন বিজেপির কিছু লোক। এ বার ফর্ম-৬ নিয়ে খোদ মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের কাছে অভিযোগ জানালেন মমতা।