E-Paper

অশান্তি হলে পেট চলে কই, প্রশ্ন সেই অকুস্থলে

কালিয়াচক-২ বিডিও দফতরের সেই ক্যান্টিনে বসে কথাগুলো বলছেন মনোহর সাহা। বয়স ৮০ ছুঁই ছুঁই। যে দিন বিক্ষোভের জেরে তিন মহিলা-সহ সাত বিচার বিভাগীয় আধিকারিক মাঝরাত পর্যন্ত আটকে ছিলেন এই দফতরে, সে দিন সবটা তাঁর চোখের সামনেই ঘটেছিল।

বিপ্রর্ষি চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:৪৪
মালদহে ভোটার তালিকা থেকে ‘নাম বাদ পড়ার’ প্রতিবাদে বিক্ষোভ স্থানীয় বাসিন্দাদের।

মালদহে ভোটার তালিকা থেকে ‘নাম বাদ পড়ার’ প্রতিবাদে বিক্ষোভ স্থানীয় বাসিন্দাদের। — ফাইল চিত্র।

দাদা, একটা চা খাবেন?

নামেই সরকারি অফিস ক্যান্টিন। জরাজীর্ণ অবস্থা। তেলচিটে টেবিল। টুল আর বেঞ্চি মিলিয়ে বসার জায়গা। সেগুলোও অধিকাংশ ভাঙা। চিনা মাটির সাদা পেয়ালা উপুড় করে রাখা। আদ্যি কালের উনুন। পাশে চা করার পাত্র। মাছি ভনভন করছে। নরম পানীয়ের বাতিল বোতলের অর্ধেকটায় সর্ষের তেল রাখা। আর কয়েকটা বিস্কুটের বয়াম।

কালিয়াচক-২ বিডিও দফতরের সেই ক্যান্টিনে বসে কথাগুলো বলছেন মনোহর সাহা। বয়স ৮০ ছুঁই ছুঁই। যে দিন বিক্ষোভের জেরে তিন মহিলা-সহ সাত বিচার বিভাগীয় আধিকারিক মাঝরাত পর্যন্ত আটকে ছিলেন এই দফতরে, সে দিন সবটা তাঁর চোখের সামনেই ঘটেছিল। সে দিনের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে চোখ থেকে জল বেরিয়ে এল। সামলে নিয়ে বললেন, ‘‘প্রতি দিন দোকানে লোক থিকথিক করত। সে দিনের পর থেকে আর লোক আসে না। বিক্রি নেই। সকাল থেকে এক গামলা জলও ফোটাতে পারিনি। অশান্তি করে কী লাভ হল? আমাদের পেট চলবে কী করে?’’

এই প্রথম নয়, এর আগেও গোষ্ঠী সংঘর্ষের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংবাদ শিরোনামে উঠে এসেছিল মোথাবাড়ি। রবিবার সকাল। বাজারের ভিড় সামলাতে সামলাতেই এক দোকানদার বললেন, ‘‘আমাদের মোথাবাড়ি এমনটা ছিল না। শান্তিপ্রিয় জায়গা ছিল।’’ তার কথা টেনে নিয়েই এক ক্রেতা বললেন, ‘‘৪৪ বছর এখানে আছি। এখানেই পড়াশোনা। ২০০৬ থেকে স্কুল মাস্টারি করি। এই রকম ঘটনা ইদানিং ঘটছে।’’ অশান্তির ঘটনা প্রসঙ্গে আর এক জনের মন্তব্য, ‘‘আগের বার যে ঘটনা ঘটেছিল, তার জন্য প্রশাসন দায়ী। ইচ্ছাকৃত গাফিলতির জন্যই ঘটেছিল।’’

বাইপাস ছেড়ে রেল গেট পেরিয়ে মোথাবাড়ি মোড়ের দিকে এগোলে এক দিকে বিস্তীর্ণ আম বাগান। অন্য দিকে কৃষি জমি। মাঝখানে মসৃণ পিচঢালা রাস্তা এগিয়ে চলেছে। এক ঝলক দেখলে মনেই হবে না নির্বাচন দোরগোড়ায়! কালেভদ্রে একটা-আধটা দেওয়াল লেখা। তবে মোড়ে মোড়ে তোরণ খাটানো। কোনটা জলসার, তো কোনওটা হরিনাম সংকীর্তনের। তবে কিছু দূর এগিয়ে মসজিদ পাড়া পেরোলে ধীরে ধীরে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রভাব বোঝা যায় পতাকায়, দেওয়াল লেখায়। রায় পাড়ায় ঢুকলে অবশ্য পতাকার রং পাল্টে গেরুয়া হয়ে যায়। রাস্তা দিয়ে হাঁটলে মেরুকরণ যতটা তীব্র বোঝা যায়, পথ চলতি মানুষের সঙ্গে কথা বললে ততটা আঁচ পাওয়া যায় না। প্রসাধনী দোকানের এক বিক্রেতা বললেন, ‘‘মোথাবাড়ির মানুষের মধ্যে এত বিদ্বেষ নেই। ধর্মীয় জমায়েতে বাইরে থেকে এসে মানুষের মাথা খাওয়া হয়!’’ ওই দোকানির বন্ধু ধর্মে মুসলিম। দোকানির ঠোঙা থেকেই মুড়ি নিয়ে মুখে দিয়ে বললেন, ‘‘আমি আর ও ভাল বন্ধু। কিন্তু আপনি যদি নেমন্তন্ন করে আমাকে চেয়ার-টেবিলে খেতে দেন, আর বন্ধুকে মাটিতে, তা হলে আমাদের মধ্যে যতই বন্ধুত্ব থাকুক না কেন, আপনার ব্যবহারের জন্য আমাদের দু’জনের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হতে বাধ্য।’’ তিনি কি সরকারের তোষণ নীতির দিকে ইঙ্গিত করছেন? কথা টেনে নিয়ে দোকানি বললেন, ‘‘সরকারের কি কাজ ইমাম ভাতা দেওয়া কিংবা মন্দির করা?’’

বেলা বাড়তেই বাড়ে সূর্যের তেজ। বাজারে ভিড় কমছে। তবে ভারী হল বুটের শব্দ। বিরাট সংখ্যায় কেন্দ্রীয় আধা-সামরিক বাহিনীর জওয়ান ঘিরে রেখেছে বিডিও দফতর। বেলা বাড়ছে। বাড়ছে তৎপরতা। সংখ্যা বাড়ছে জওয়ানের। কিছু ক্ষণের মধ্যেই জাতীয় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিকেরা ঢুকলেন। বাজারের কোলাহল মিলিয়ে গিয়ে অকস্মাৎ সব থমথমে হয়ে গেল। বিডিও অফিসের উল্টো পারে দাঁড়িয়ে সেই রণসজ্জা দেখতে দেখতে এক জন বলে ফেললেন, ‘‘এই মোথাবাড়ি চেনা দায়!’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Mothabari Election Commission

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy