E-Paper

নজরদারি সত্ত্বেও মারণ ব্যবসা চলছেই দক্ষিণের বাজি-গড়ে

রাজ্যের একাধিক বেআইনি বাজি কারখানায় বিস্ফোরণে প্রাণহানি হয়েছে। তবু থামেনি সেই কারবার। ভোটের আগে বাজির আড়ালে বিস্ফোরক তৈরির অভিযোগও উঠছে। নির্বাচন কমিশন কড়া নজরদারির বার্তা দিলেও, বাস্তবে তা কতটা মানা হবে, থেকেই যাচ্ছে সেই প্রশ্ন।

শুভাশিস ঘটক

শেষ আপডেট: ৩০ মার্চ ২০২৬ ০৮:৫৬
মহেশতলার একটি দোকানে বাজির পসরা।

মহেশতলার একটি দোকানে বাজির পসরা। —নিজস্ব চিত্র।

কড়া নিরাপত্তা ও‌ পুলিশের ঘন ঘন তল্লাশি অভিযানের ফাঁকেও বাজি কারখানার দরজায় গিয়ে দাঁড়ালে হালকা বারুদের গন্ধ নাকে আসে!

ভোটের মুখে রাজ্যের সমস্ত বাজি কারখানার উপরে কড়া নজরদারি চালানোর নির্দেশ জারি করেছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। কিন্তু তাতে রাজ্যের বাজি-চিত্রে আদৌ কোনও বদল ঘটেছে কি?

দক্ষিণ ২৪ পরগনায় বেআইনি শব্দবাজির আঁতুড়ঘর বলে পরিচিত চম্পাহাটি, বেগমপুর ও দক্ষিণ গড়িয়া পঞ্চায়েতের ৩০-৪০টি গ্রাম। বর্তমানে ওই সব গ্রামে প্রায় প্রতিদিনই চলছে পুলিশি অভিযান। কিন্তু তাতে বাজি তৈরি বা বিক্রি, কোনওটাই বন্ধ হয়নি। পুলিশের সঙ্গে লুকোচুরিতে চলছে সব কিছু। নির্বাচন কমিশনের ফতোয়া জারির পরে ওই সবএলাকায় অভিযান চালিয়ে নিষিদ্ধ বাজি বাজেয়াপ্ত করার পাশাপাশি সে সব তৈরি ও মজুত করার অভিযোগে কয়েক জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে বারুইপুর পুলিশ জেলার কর্তাদের দাবি। তাঁরা জানাচ্ছেন, বেশ কিছু ছোট-বড় বাজি কারখানা পুলিশের তরফে বন্ধ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে ওই সব এলাকায় বাজির সমস্ত দোকান বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশকর্তারা। সেই মতো কাজও হয়েছে বলে পুলিশের দাবি।

সম্প্রতি ওই এলাকায় গিয়ে দেখা গেল, পুলিশের তরফে মাইকে চলছে বাজি-বিরোধী প্রচার। গ্রামগুলির নানা জায়গায় দিন-রাত রয়েছে পুলিশ পিকেট। হারাল গ্রামে যাতায়াতের পথে পুলিশি পাহারা। কিন্তু এত সব কড়াকড়ির মধ্যেও গ্রামগুলিতে ঘুরে বেড়ালে কয়েকটি কারখানা থেকে এখনও তাজা বারুদের হালকা গন্ধ নাকে আসছে। বাজির দোকান বন্ধ। কিন্তু দোকানের আশপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন মালিক ও কর্মচারীরা। দোকানের সামনে দাঁড়ালেই এগিয়ে আসছেন তাঁরা। জানতে চাইছেন, কী লাগবে? সব রকম বাজি হাতে তুলে দেওয়ার আশ্বাসও দিচ্ছেন। দরদামও করা যাচ্ছে। বাজি হাতে তুলে দেওয়ার, অথবা প্রয়োজনে নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ারও আশ্বাস দিচ্ছেন তাঁরা।

হারাল ও সোলগলিয়ার মতো একাধিক এলাকার ছোট-বড় কারখানায় এখনও বাজি মজুত রয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। সোলগলিয়ায় রাস্তার পাশেই বড় একটি কারখানায় গিয়ে দেখা গেল, দরজা বন্ধ। কিন্তু সেই দরজার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে, প্রচুর বাজি রোদে শুকোতে দেওয়া হয়েছে। কারখানার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেই নাকে আসছে বারুদের গন্ধ। কারখানার মালিক আক্রম আলি মোল্লার কথায়, ‘‘আমার কারখানার বৈধ লাইসেন্স রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশের বিষয়টি আমি জানি। বর্তমানে বাজি তৈরি হচ্ছে না। মজুত বাজি শুকিয়ে প্যাকিং করার কাজ চলছে। সেগুলি এখন বিক্রি করা হবে না। কিন্তু ওই সব বাজি রোদে না দিলে নষ্ট হয়ে যাবে। তাই রোদে শুকোনো হচ্ছে।’’ ওই সব গ্রামের বাজি ব্যবসায়ীদের একাংশের কথায়, ‘‘এখানে বিকল্প কোনও কর্মসংস্থান নেই। বাজি তৈরির কাজ আমাদের রক্তের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। সেই জন্য হাজার বাধা এলেও বাজি তৈরি বন্ধ করা যাবে না।’’

বাজি ব্যবসায়ীদের একাংশ জানালেন, এই সব গ্রামে বেশ কয়েক জন প্রভাবশালী বাজি প্রস্তুতকারক ও ব্যবসায়ী রয়েছেন। তাঁরা বেশির ভাগই শাসকদলের নেতাদের ঘনিষ্ঠ। পুলিশও তাঁদের সমঝে চলে। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের কড়া নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ওই প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের কারখানায় এখনও বাজি তৈরির কাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তবে, পরিমাণে অনেকটাই কম। সেই কাজ চলছে প্রায় নিঃশব্দে, লোকচক্ষুর আড়ালে। শেষ রাত থেকে সকাল সাড়ে ৭টা-৮টা পর্যন্ত বরাত অনুযায়ী বাজি তৈরির কাজ চলছে। দিনের আলো ভাল ভাবে ফোটার আগেই বাজি তৈরি বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এই ভাবে প্রতিদিন অল্প পরিমাণে বাজি তৈরি হচ্ছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের একাংশের। বড় বড় নেতাদের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় পুলিশ-প্রশাসন ওই সমস্ত প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর কারখানায় বিশেষ অভিযান চালায় না বলে অভিযোগ। যেন এক নীরব বোঝাপড়া।

সম্প্রতি এলাকার একটি কারখানায় বিস্ফোরণের ঘটনায় একাধিক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু তার পরেও বাজি তৈরি বন্ধ হয়নি। স্থানীয় বাজি ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, ‘‘সব ব্যবসাতেইঝুঁকি রয়েছে। এখানেও তা-ই। মৃত্যুর ঘটনা ঘটতেই পারে। তা ব্যবসারই একটি অঙ্গ।’’ এখানকার তিনটি পঞ্চায়েতের ৩০-৪০টি গ্রামের এক লক্ষের কাছাকাছি নারী-পুরুষ বাজি তৈরিতে সিদ্ধহস্ত। বিকল্পকর্মসংস্থান না থাকায় কড়া নিষেধাজ্ঞা বা পুলিশি অভিযান, বাজির ব্যবসা কোনও কিছুতেই আটকে থাকে না। ‘হারাল আতশবাজি ব্যবসায়ী সমিতি’র তরফে সুধাংশু দাস বললেন, ‘‘জাতীয় নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ জারি হওয়ার পরে সমস্ত কারখানার মজুত বাজি এবং বাজি তৈরির মশলা ও রাসায়নিক সরিয়ে ফেলা হয়েছে। বাড়িতে বাড়িতে বাজি তৈরিবন্ধ রাখা হয়েছে। সংগঠনের তরফে নজরদারি চালানো হচ্ছে। প্রচার অভিযানও চলছে। কার্যত বাজি তৈরি বন্ধ এখন।’’

যদিও গ্রামগুলিতে ঘুরলেই বোঝা যায়, সুশান্তের দাবি ঠিক নয়। গ্রামের ভিতরে মাঠের মধ্যে অথবা বাঁশবাগানের ফাঁকে একাধিক ছোট ছোট কারখানা রয়েছে। সেগুলির পাশ দিয়ে যাতায়াত করলেই নাকে আসছে বারুদের গন্ধ। অর্থাৎ, ভিতরে বাজি তৈরি চলছে পুরোদমে।

(চলবে)

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Firecrackers West Bengal Assembly Election Firecrackers Market

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy