মায়ের মৃত্যুতেও মেলেনি রেহাই

শনিবার সন্ধ্যাতেও ভোটার স্লিপ বিলি করছিলেন তুষারকান্তি। সে সময়েই এক পরিচিতের ফোন এল তাঁর কাছে। ফোন তুলে বললেন, ‘‘ভোটের কাজ করছি। মায়ের পারলৌকিক কাজের কোনও বন্দোবস্ত করতে পারিনি।’’

হিন্দোল ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৩২
ভোটের কাজে বিএল‌ও তুষার কান্তি পাল।

ভোটের কাজে বিএল‌ও তুষার কান্তি পাল। — নিজস্ব চিত্র।

পরনে সাদা ধুতি, উড়নি। একমুখ দাড়ি। এক পলকেই বোঝা যায়, পারলৌকিক অশৌচ চলছে। তবু সেই অবস্থাতেই উত্তর ২৪ পরগনার ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের নোয়াপাড়ায় বাড়ি-বাড়ি ঘুরে ভোটার স্লিপ বিলি করছেন এক বিএলও। কেউ অবাক হচ্ছেন, কেউ বা প্রশ্ন করছেন, ‘‘এই অবস্থাতেও ছুটি মেলেনি?’’ কাঁচড়াপাড়ার উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক তুষারকান্তি পাল বলছেন, ‘‘না। মায়ের গুরুতর অসুস্থতার সময়েও ছুটি মেলেনি। গত ২০ এপ্রিল মা চলে গিয়েছেন। তার পরেও রেহাই মেলেনি।’’

শনিবার সন্ধ্যাতেও ভোটার স্লিপ বিলি করছিলেন তুষারকান্তি। সে সময়েই এক পরিচিতের ফোন এল তাঁর কাছে। ফোন তুলে বললেন, ‘‘ভোটের কাজ করছি। মায়ের পারলৌকিক কাজের কোনও বন্দোবস্ত করতে পারিনি।’’ তাঁর অভিযোগ, শুক্রবার রাতে চার্জ অফিসারকে নিজের অসহায়তার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু উত্তর মিলেছে, ‘‘বিএলও মারা না গেলে রেহাই পাবে না।’’ অনেকেই বলছেন, পারিবারিক বিপর্যয় বা নিকটাত্মীয়ের মৃত্যুতে যুদ্ধক্ষেত্রেও ছুটি মেলে। ভোটের কাজ কি তার থেকেও বড়?

কমিশন সূত্রের বক্তব্য, “বিএলওদের নিয়োগ থেকে কাজ দেওয়ার মূল ভার জেলা প্রশাসনের উপরেই থাকে। অনেক জেলাতে অসুস্থতা-সহ একাধিক কারণে বহু বিএলও অব‍্যাহতি পেয়েছিলেন। ফলে এই বিষয়টি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনেরই দেখা দরকার ছিল।” বিএলও-দের অনেকেই বলছেন, শেষ ক’মাসে সব কিছু যেন মাথায় উঠেছে। দিন-রাতের হিসাবও গুলিয়ে যাচ্ছে। হাজারো সমস্যাতেও রেহাই মিলছে না। বিএলও হিসেবে কর্মরত জগদ্দলের এক শিক্ষিকা রিয়া দত্ত বলেন, “এত কিছু সামলাতে গিয়ে হিমসিম খাচ্ছি। সংসার, একরত্তি মেয়ে— কাউকেই সময় দিতে পারছি না।’’

২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর থেকে নোয়াপাড়া বিধানসভার ১০৭ নম্বর এলাকার পার্ট ৭-এর বিএলও হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন তুষারকান্তি। ফেব্রুয়ারির শেষে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তাঁর মা। পরিবারে মা ছাড়া মানুষ বলতে তুষারকান্তি একাই। তাই একা হাতেই ঘর এবং বিএলও-র কাজ চালিয়ে গিয়েছেন তিনি। ১২ মার্চ মাকে ব্যারাকপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ-য়ে ভর্তি করাতে হয়। অবস্থার অবনতি হলে ৯ এপ্রিল কল‌্যাণী এমস-এ স্থানান্তরিত করা হয়। ভেন্টিলেশনে ছিলেন তাঁর মা। তুষারকান্তির দাবি, সেই সময় থেকেই তিনি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চেয়ে একাধিক বার কর্তৃপক্ষের কাছে দরবার করেন। লিখিত আবেদনও জমা দেন। কিন্তু অভিযোগ, আবেদনপত্রের প্রাপ্তিস্বীকারটুকু করা হয়নি। তুষারকান্তি বলেন, “ইআরও, চার্জ অফিস এবং সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্মীদের কাছেও বিষয়টি জানিয়েছিলাম। কেউ পাশে দাঁড়ায়নি।’’

তুষারকান্তি জানান, ১৬ এপ্রিল থেকে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত থেকে ওয়েব কাস্টিং সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন শুরু করেন তিনি। ২০ এপ্রিল মারা যান তাঁর মা। তার পরেও রেহাই মেলেনি। পারলৌকিক অশৌচের পোশাক পরেই ভোটার স্লিপ বিলি করার কাজ করতে হয়েছে তাঁকে। সে সব কাজের ফাঁকেই আক্ষেপের সুরে তুষারকান্তি বলছেন, ‘‘মানবিক কারণে অব্যাহতি দেওয়া হলে শেষ সময়ে একটু মায়ের পাশে থাকতে পারতাম।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

BLO Noapara

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy