ববির অঙ্কে মেলাতে হচ্ছে মমতা-আবেগ

খিদিরপুরের লাইফলাইন লম্বা- চওড়া কার্ল মার্কস সরণি ভাগভাগি হয়ে রয়েছে। সে ভাগ মূলত তৃণমূল কংগ্রেস আর বিজেপিরই। তার পরে সিপিএম, কংগ্রেস।

রবিশঙ্কর দত্ত

শেষ আপডেট: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:২৫
(বাঁ দিকে) ফিরহাদ হাকিম এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (ডান দিকে)।

(বাঁ দিকে) ফিরহাদ হাকিম এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (ডান দিকে)। — ফাইল চিত্র।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলা ভেসে যাচ্ছে লাগোয়া অঞ্চলে। মাইকে শোনা যাচ্ছে— ববিকে ভোট দেবেন, কি দেবেন না?

আর তাঁর মঞ্চ ঘিরে তিন দিকের মানুষ হাত আর গলা তুলে আশ্বস্ত করছেন তৃণমূল নেত্রীকে। আরও নিশ্চিত হতে মমতা তার পরেও বললেন, ‘‘আমার মায়ের অপারেশনের সময় তিন বোতল রক্ত লেগেছিল। ববিকে ডাকলাম। ও বলল, আমিই আসছি।’’

এ রাজ্যের ভোটারের মন বোঝার ক্ষেত্রে সামনে সারিতে থাকা তৃণমূল নেত্রীর এই বক্তৃতাই প্রমাণ, ভোট এখানে শুধু অঙ্কেরই নয়, অনেকখানি আবেগেরও।

কলকাতা বন্দরের প্রায় ৫০% সংখ্যালঘু ভোটের সঙ্গে সেই আবেগেরই সম্পর্ক মমতার। তাই রাজ্যের মন্ত্রী এবং কলকাতার মেয়র হলেও, এই কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী হিসেবে ফিরহাদ (ববি) হাকিমের কাজকর্মের হিসাব দেওয়ার পরেও মমতাকে নামতে হয়েছে প্রচারের একেবারে শেষ পর্বে। রাজনৈতিক জীবনের শুরুর সময়ে অথবা দক্ষিণ কলকাতার সাংসদ হিসেবে গড়ে তোলা নিজের সেই সম্পর্কই সচেতন ভাবে মনে করিয়ে দিচ্ছেন ‘দিদি’। প্রতি নির্বাচনেই এ ভাবে রাজনীতি আর ব্যক্তিগত সম্পর্ক মিলিয়ে মিশিয়ে দিয়ে যান। তাতেই হইহই করে জিতে যায় তৃণমূল। শেষ বিধানসভা ভোটেও ফিরহাদ জিতেছেন ৬৯ শতাংশ ভোট পেয়ে। এই ধারায় বদল এসেছে গত লোকসভা ভোটে। বিজেপির ভোট তিন শতাংশ বেড়ে ২৪ থেকে ২৭%-এ শতাংশে পৌঁছেছে।

বদল এসেছে এখানকার অঙ্কে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-এ বাদ যাওয়া ভোটারের সংখ্যা। তাই তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি কলকাতা বন্দরের ভোটেও সতর্ক থাকতে হচ্ছে তৃণমূলকে। গত লোকসভা ভোটে দক্ষিণ কলকাতা কেন্দ্রের অন্তর্গত কলকাতা বন্দরে তৃণমূলের ভোট কমেছে প্রায় ১৪%। তৃণমূলের ভোট ৬৯ থেকে নেমে এসেছে ৫৫%-এ। দ্বিতীয় শক্তি হিসেবে বিজেপি শেষ বিধানসভা ভোটের তুলনায় লোকসভা ভোটে কিছুটা এগিয়েছে ঠিকই, তবে তা তিন শতাংশই। বিজেপির ভোট ঊর্ধ্বমুখী হলেও ভাগাভাগির এই হিসেব তৃণমূলের চিন্তার কারণ নয়। চিন্তা শুরু হয়েছে এসআইআর-এ মনোনয়ন জমা পর্যন্ত বাদ পড়া ৭১ হাজার ৮৩৭ ভোট নিয়ে। অঞ্চল ভিত্তিক হিসেবেও তা নিশ্চিন্ত থাকতে দিচ্ছে না ববিকে।

খিদিরপুরের লাইফলাইন লম্বা- চওড়া কার্ল মার্কস সরণি ভাগভাগি হয়ে রয়েছে। সে ভাগ মূলত তৃণমূল কংগ্রেস আর বিজেপিরই। তার পরে সিপিএম, কংগ্রেস। প্রচারের আলো-ঝলমলে বিলবোর্ড, পতাকা, প্রতীক, ফ্লেক্সের এই আনুপাতিক উপস্থিতিই যেন কলকাতা বন্দর কেন্দ্রের ভোটে রাজনৈতিক বিন্যাসের প্রতীক হয়ে রয়েছে। মন্ত্রী ও মেয়র ফিরহাদের সামনে এখানে বিজেপিরও শক্তপোক্ত প্রার্থী রাকেশ সিংহ। তাঁর পক্ষে বিজেপির দিল্লির নেতা, বিহারের জনপ্রিয় সিনেমা-সঙ্গীত তারকারাই আসেননি, আলাদা করে ঘুরেছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও। এখনও ভোটের গুনতিতে বিজেপি পিছনে তবে রাকেশের বর্ণময় উপস্থিতি তার অনেকটা ঢাকা দিয়ে রেখেছে। সিপিএমের প্রার্থী ফৈয়াজ আহমেদ খান দীর্ঘ দিনের পুরপ্রতিনিধিই নন, এখানে ‘লাল ঝান্ডা’ তাঁর ডাক নাম। ভোটের অঙ্কের এই লড়াইয়ে বন্দরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তাঁদেরও। সিপিএম তা ধরে রাখতে না-পারলে পরিস্থিতি ও ফলে অবশ্যই ছাপ পড়বে।

খিদিরপুরের ভূকৈলাস ময়দানে মমতার ওই সভা আয়োজনের ফাঁকে সে কথা মেনে নিয়ে তৃণমূলের এক সংগঠক বলেন, ‘‘কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। তবে যে হয়রানি হয়েছে, তা বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট আরও এককাট্টা করে ফেলেছে।’’ আর তৃণমূলের প্রধান প্রতিপক্ষ বিজেপির রাকেশ সরাসরি ‘হিন্দু-ঐক্য’ চাইছেন। বিজেপির প্রতীক পদ্মের থেকে শ্রীরামচন্দ্রের ছবি ছাপা পতাকাই বেশি নজরে আসছে তাঁর প্রচারে। এক দিকে এসআইআর-এর অঙ্ক ‘ম্যানেজ’ করতে ব্যস্ত তৃণমূল। অন্য দিকে ‘ববির বন্দর’-এর বিপরীতে গেরুয়া ঝড়তোলার জন্য চেষ্টা করছেন রাকেশ। দীর্ঘ দিন জেলবন্দি রাকেশ ভোটের আগেই জামিন পেয়েছেন। তার পরে প্রার্থী হয়েছেন। তাঁর অনুগামীরা বলেন, ‘‘রাকেশ ভাইয়াকে ববিদা ভয় পান!’’ পয়লা বৈশাখে ধুতি-পাঞ্জাবি পরে মাছ হাতে ভোটের প্রচারে নেমে বুঝিয়েছেন লড়াইয়ে থাকতেচাইছেন তিনি।

আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকা এলাকা, তার অনুন্নয়ন কিছুই ভোটের চর্চায় আসতে পারছে না। নাগরিক পরিষেবা, অস্বাস্থ্যকর গলি-বস্তির জীবন ও দারিদ্রের কথা চাপা পড়ছে দুই প্রধানের স্লোগানে। ময়ূরভঞ্জ রোডের এক যুবক হাঁটুতে হাত ছুঁইয়ে দেখাচ্ছিলেন জমা জল আর পচা জল কোন কোন রাস্তায় মানুষের সঙ্গী! বলছিলেন, ‘‘চাকরি-বাকরি তো নেই। সে সব কথা বলারও তো কেউ নেই। অটো চালাও নয়তো সিন্ডিকেটেনাম লেখাও!’’

অপরিসর পাড়ায় বেআইনি নির্মাণের বিপদ আর তা নিয়ে গোষ্ঠী-দ্বন্দ্ব, তোলাবাজি, মারামারির মতো উপরি যন্ত্রণা ক্রমেই বাড়ছে। রামকমল স্ট্রিটের মুখে দাঁড়িয়ে এক প্রৌঢ় এ সব প্রত্যাশাই শোনালেন। বললেন, ‘‘রাজনীতি বিপথে চলে গিয়েছে।’’

চোখের সামনে অঙ্ক রয়েছে। তা নির্ভুল কষতে আবেগও মিশছে। কিন্তু আরও একটা ভোটে মানুষের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি মিশছে কি না, সাম্প্রতিক কালের ভোটের রাজনীতিতে বিরল হলেও কলকাতার বন্দরে তার অপেক্ষাই একমাত্র ইতিবাচক।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Mamata Banerjee FirhadHakim

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy