E-Paper

নজিরবিহীন বদলিতে ‘দূর’ই এখন ‘কাছে’র

নতুন স্বরাষ্ট্রসচিব সংঘমিত্রা ঘোষ দীর্ঘদিন নারী-শিশু এবং সমাজকল্যাণ দফতরের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। প্রচারের আলো থেকে দূরে।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৭ মার্চ ২০২৬ ০৯:০৩
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। ফাইল চিত্র।

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। ফাইল চিত্র।

দীর্ঘদিন ধরেই তাঁরা কার্যত কম গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত ছিলেন, ছিলেন ক্ষমতার বৃত্ত থেকে ‘দূরে’। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের নজিরবিহীন রদবদলে রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষ দায়িত্বে এখন দক্ষ সেই আধিকারিকেরাই। ভোট পরিচালনার প্রশ্নে তাঁরাই এখন কমিশনের চোখ-কান।

বর্তমান সরকারের আমলে শিক্ষায় নিয়োগ-দুর্নীতির অভিযোগ সাড়া ফেলেছে। প্রশাসনিক সূত্রে খবর, যে সময় ওই বিতর্কিত নিয়োগের কাজ শুরু হয়, দুষ্মন্ত নারিয়ালা ছিলেন স্কুল শিক্ষা দফতরের সচিব। আচমকাই তাঁকে বদলি করে নবান্ন। দীর্ঘদিন বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের দায়িত্বে থাকার পরে উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দফতরের অতিরিক্ত মুখ্যসচিব। জিটিএ-র প্রধানসচিব পদের অতিরিক্ত দায়িত্বও দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। আধিকারিকদের একাংশের বক্তব্য, বিধি মেনে কাজ করেন নারিয়ালা। প্রতিটি খরচের পাই-পয়সার হিসাব রাখা তাঁর অভ্যাস।

অন্য দিকে, নতুন স্বরাষ্ট্রসচিব সংঘমিত্রা ঘোষ দীর্ঘদিন নারী-শিশু এবং সমাজকল্যাণ দফতরের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। প্রচারের আলো থেকে দূরে। কিছু দিন স্বাস্থ্য দফতরে উচ্চ পদে থাকলেও, আচমকাই তাঁকে সেই পদ থেকে সরিয়ে দেয় সরকার। বিধি মেনে কাজ করার প্রশ্নে তাঁর কড়া ধাত পরিচিত প্রশাসনিক মহলে।

রাজ্য পুলিশের নতুন ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্ত পুলিশ মহলে ‘মিস্টার ডিপেন্ডবল’ বলে পরিচিত। ভাঙড় থেকে মুর্শিদাবাদ—গত কয়েক বছরে রাজ্যে যেখানেই বড় কোনও হিংসা-অশান্তি ছড়িয়েছে, সেখানেই পাঠানো হয়েছে সিদ্ধিনাথকে। তৃণমূল সরকারের আমলে যত বার দার্জিলিং উত্তপ্ত হয়েছে, তত বার তাঁকেই সামাল দিতে হয়েছে। আবার উত্তরবঙ্গে কেএলও-র জঙ্গি কার্যকলাপ থেকে জঙ্গলমহলে মাওবাদী দমন কর্মসূচি— সিদ্ধিনাথের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল সরকারের কাছে। তবু রাজ্য পুলিশের শীর্ষ কোনও পদে তাঁকে সে ভাবে দেখা যায়নি। রাজ্য পুলিশের ডিজি পদের জন্যও বিবেচিত হয়নি তাঁর নাম। অবশ্য অতীতের একটি লোকসভা ভোটে নির্বাচন কমিশনই তাঁকে এডিজি (আইনশৃঙ্খলা) পদে নিয়োগ করেছিল। এ বার কমিশনের নির্দেশে রাজ্য পুলিশের শীর্ষপদে বসার আগে তিনি ছিলেন ‘কারেকশনাল সার্ভিসেস’-এর দায়িত্বে।

কলকাতার নতুন পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দও উত্তরবঙ্গের কেএলও জঙ্গি দমনে বিশেষ ভূমিকায় ছিলেন। ভুটানের সঙ্গে যৌথভাবে রাজ্য পুলিশের অভিযানের অন্যতম নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। সিদ্ধিনাথের মতো মাওবাদী দমন-অভিযানেও তাঁর ভূমিকা ছিল। অজয়ের হাতেই তৈরি হয় রাজ্য পুলিশের এসটিএফ এবং কাউন্টার ইনসারজেন্সি ফোর্স। দার্জিলিং থেকে মুর্শিদাবাদ—সিদ্ধিনাথের মতো অজয়ও ছিলেন সরকারের অন্যতম তুরুপের তাস । মাঝে হায়দারাবাদে পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ছিলেন তিনি।

নতুন এডিজি (আইনশৃঙ্খলা) অজেয় রানাডে কলকাতা পুলিশের কাজ করার পরে জাহাজ মন্ত্রকের দায়িত্বে চলে গিয়েছিলেন। ফিরেএসে হাওড়ার পুলিশ কমিশনার এবং পরে আইজি (দক্ষিণবঙ্গ) পদের দায়িত্ব। তার পর থেকেই তিনি ক্রমশ তুলনায় গুরুত্বহীন পদে চলে যেতে থাকেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলাতে তাঁর দক্ষতাও পুলিশমহলে প্রতিষ্ঠিত।

মনোজ পন্থ অবসর নেওয়ার পরে আট জন সিনিয়র অফিসারকে টপকে নন্দিনী চক্রবর্তীকে মুখ্যসচিব হিসেবে নিয়োগ করা হয়। তার আগে নন্দিনী ছিলেন স্বরাষ্ট্রসচিব। বাম আমলে একাধিক দায়িত্ব পালন করা নন্দিনী বর্তমান সরকারের শুরুতে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের সচিব ছিলেন। সেই পদ থেকে সুন্দরবন উন্নয়ন দফতর হয়ে স্টেট গেজেটিয়ার পদেও পাঠানো হয়েছিল তাঁকে। পরে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও উদ্যানপালন, পর্যটন, অপ্রচলিত শক্তি দফতরেও কাজ করেন নন্দিনী। রাজভবনে (এখন লোকভবন) প্রাক্তন রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোসের সচিব পদে তাঁকে বসায় সরকার। রাজনৈতিক একটি সভায় তাঁকে দেখা যাওয়ার পরে নন্দিনীকে সরিয়ে দেন বোস। নন্দিনী ফেরেন পর্যটন দফতরে। ফের শুরু হয় তাঁর উত্থান। সেখান থেকে স্বরাষ্ট্র হয়ে সরাসরি মুখ্যসচিব। রবিবার তাঁকেই সরিয়ে দায়িত্বে আনা হয় দুষ্যন্তকে। তবে আপাত ভাবে বিতর্কহীন জগদীশপ্রসাদ মীনা প্রচারকে দূরে রেখে একাধিক জেলার জেলাশাসক, মুখ্যমন্ত্রীর দফতর বা কর্মিবর্গ এবং প্রশাসনিক সংস্কার দফতরে কাজ করেছিলেন। কিছু দিন আগে কমিশন তাঁকে অন্য রাজ্যের ভোট-পর্যবেক্ষক নিয়োগও করেছিল। রবিবার সরিয়ে দেওয়া হয় তাঁকেও।

মাওবাদী দমন অভিযান থেকে কেন্দ্রের স্পেশাল অপারেশন গ্রুপে কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সদ্য প্রাক্তন ডিজি পীযূষ পাণ্ডেও। যখন এই পদে বসেছিলেন, তখন এসআইআরের কাজে রাজ্য জুড়ে চলছিল অশান্তি। সুপ্রিম কোর্ট সতর্ক করেছিল রাজ্য পুলিশকে। কলকাতার সদ্য প্রাক্তন সিপি সুপ্রতিম সরকার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সিঙ্গুরআন্দোলনের সময় ছিলেন হুগলির পুলিশ সুপার। সেখান থেকে কলকাতা পুলিশের নানা দায়িত্ব সামলে বিধাননগরের পুলিশ কমিশনার। কলকাতা পুলিশের নগরপাল হিসেবে কাজে যোগ দেওয়ার আগে তিনি ছিলেন রাজ্য পুলিশের এডিজি (দক্ষিণবঙ্গ)। বিনীত গোয়েলের পেশাদার জীবনে অবশ্য উত্থান-পতন লেগেই আছে।

রিজওয়ানুর কাণ্ডের পরে কলকাতা পুলিশের উপরমহলে বড়সড় রদবদল হলে বিনীত গোয়েল কলকাতা পুলিশের ডিসি (সদর) হন। এডিজি (এসটিএফ) পদের দায়িত্বও সামলান তিনি। কলকাতার পুলিশ কমিশনার থাকাকালীন আর জি কর-কাণ্ডে বিস্তর অস্বস্তিতে পড়তে হয় বিনীতকে। পরে কলকাতার পুলিশ কমিশনার পদ থেকে সরিয়ে তাঁকে ফের পাঠানো হয়েছিল রাজ্য পুলিশের এসটিএফে। সেখান থেকেই তাঁকে করা হয়েছিল ডিজি (আইনশৃঙ্খলা)।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Gyanesh Kumar ECI

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy