আবালবৃদ্ধবনিতার ভিড়। তপ্ত গরমেও মানুষের উচ্ছ্বাসের শেষ নেই। সেই তেরঙা জনস্রোতের মধ্যে একটি ছোটখাট চেহারা।গলায় রজনীগন্ধার মালা। নরম-গোলাপি ফুল ছাপ দেওয়া সাদা সালোয়ার-কামিজ। চুল ঢেকে গলায় নেওয়া ওড়না। বাঁ হাতে আদ্যি কালের ছোট ডায়ালের ঘড়ি। এক গোছা চুড়ি পরা অন্য হাত আশ্বস্ত করার ভঙ্গিমায় শূন্যে তোলা। মানুষটিকে না-চিনলে ভিড় এবং উচ্ছ্বাসের বহর দেখে তাঁর পরিচয় নিয়ে ভুল হতে বাধ্য। তৃণমূল কংগ্রেসের একাংশ বলছে, তিনি ফের কংগ্রেসে ফিরে গিয়ে ভুল করেছেন। কেউ বলছেন, তাঁর জন্য রতুয়া কিংবা চাঁচল উপযুক্ত ছিল। ওড়নার একাংশ দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে মৌসম বেনজির নূর বললেন, ‘‘কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল ৪ তারিখ (মে)দেখা যাবে!’’
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বরকত গনি খান চৌধুরীর পরিবারের সদস্য হিসেবে লোকসভায় পা রাখেন ২০০৯ সালে। পরবর্তী নির্বাচনেও কংগ্রেসের টিকিটে জয়। পরের বার লোকসভা ভোটের আগে তাঁর তৃণমূলে যোগ এবং নির্বাচনে পরাজয়। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে রাজ্যসভায় পাঠিয়েছিলেন।
কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক দিন আগে সেখান থেকে পদত্যাগ করে ঘরে ফেরা মৌসমের। যখন মালদহ, মুর্শিদাবাদের মতো কংগ্রেসের এক কালের শক্ত ঘাঁটিতে কেবলই তৃণমূলে ভেড়ার নজির, স্রোতের বিপরীতে হঠাৎ সাঁতার কেন? মৌসম বললেন, ‘‘পারিবারিক সিদ্ধান্ত। আমাদের বোঝাপড়া হয়েছে, আমরা পরিবারের সকলে একসঙ্গেই থাকব।’’
এক সময় মালদহের সঙ্গে সমার্থক ছিলেন গনি খান। মৃত্যুর এতগুলো বছর পরেও কি তিনি প্রাসঙ্গিক? এক তৃণমূল নেতা বলেন, ‘‘সুজাপুর, মালতীপুর, রতুয়া, চাঁচল, মোথাবাড়ি, মানিকচকের মতো আসনগুলিতে এখনও ওঁর জন্য অনুভূতি মানুষের মধ্যে কাজ করে।’’ গোটা রাজ্যের মতোই মালদহ জুড়ে প্রচারে তৃণমূল-বিজেপির জোর টক্কর। কংগ্রেসকে সেখানে খুঁজে পাওয়া কঠিন। এই বাস্তবতা মেনে নিয়েও এক টোটো চালক বলেন, ‘‘গনি খান বেঁচে থাকলে এ সব জায়গায় কংগ্রেসকে চিন্তা করতে হত না!’’
গনি-পরিবারের উত্তর প্রজন্ম ইশা খান চৌধুরী সাংসদ হয়েছেন। জেলা সভাপতিও বটে। তৃণমূল ছেড়ে মৌসমও ফিরেছেন। তা হলে কি গনি-আবেগেই হারানো জমি পুনরুদ্ধার করতে চায় কংগ্রেস? জেলার এক বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ বলেন, ‘‘জেলায় কংগ্রেস বলে আলাদা কিছু নেই। যা আছে, তা ওই পরিবারই। মানুষ ওঁদেরই চেনেন। ভোট পেলে ওঁরাই পাবেন।’’
রাজ্যে ২০ বছর পরে বিধানসভায় একলা লড়ছে কংগ্রেস। গুরুত্বপূর্ণ এবং পুরোনো নেতাদের প্রায় সকলকেই ভোট-যুদ্ধে শামিল করেছে দল। লক্ষ্য, হারানো জমির কিছুটাও যদি পুনরুদ্ধার করা যায়। আর লক্ষ্য পূরণে কংগ্রেস শীর্ষ নেতৃত্ব তাকিয়ে আছেন মালদহ এবং মুর্শিদাবাদের দিকে।
যে কেন্দ্রে মৌসম প্রার্থী হয়েছেন, সেখানে প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে ছিলেন প্রাক্তন বিধায়ক এবং রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রীর পুত্র আলবিরুনি। তাঁর কথায়, ‘‘দল প্রার্থী করেনি বলে অন্য দলে তো আর যাব না। মৌসম পরিচিত মুখ। ও দাঁড়িয়েছে, ভালই হবে।’’ মৌসম নিজে পারিবারিক আসন সুজাপুর ছেড়ে মালতীপুরে আসা নিয়ে বলেছেন, ‘‘আমাদের পরিবারের সকলেই কখনও না কখনও ওই আসন থেকে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু আমি মালদহ উত্তরের সাংসদ ছিলাম। কর্মীরা আমাকে চেয়েছিলেন। তাই দল মনে করেছে, আমাকে এখানে পাঠালে ভাল ফলাফল হবে।’’
বামেদের সঙ্গে জোট করে লড়ে গত বিধানসভা নির্বাচনের তুলনায় লোকসভায় সুজাপুর, মোথাবাড়ি, মালতীপুর, রতুয়ার মতো আসনে কংগ্রেসের ভোট ভাল রকম বেড়েছে। এ বারও কি সেই ফল ধরে রাখা সম্ভব হবে? মৌসমের জবাব, ‘‘ইচ্ছাকৃত ভাবে গত বিধানসভা নির্বাচনে এনআরসি-আতঙ্ক মানুষের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এ বার আর সেই ভয় নেই। মানুষ কংগ্রেসকেই ভোট দেবেন।’’
মৌসম নিজে যে আসন থেকে লড়ছেন, সেই আসনে তাঁর প্রতিপক্ষ তৃণমূলের জেলা সভাপতি তথা ওজনদার বিধায়ক আব্দুর রহিম বক্সী। লড়াই কি তবে বেশ কঠিন? মৌসমের জবাব, ‘‘আমার জীবনে কোনও লড়াই সহজ ছিল না। তাই প্রতিপক্ষ কে, সে সব নিয়ে ভাবছি না। জেতার জন্যই লড়াই করছি।’’
জেলা জুড়ে কংগ্রেসের উত্থানের চেষ্টার মাঝে বিশেষ ভাবে নজর কাড়ছে মালতীপুর। জেলার রাজনৈতিক শিবিরের একাংশ মনে করিয়ে দিচ্ছে, বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর গাড়ির উপরে আক্রমণ হওয়ার পর তিনি রহিম বক্সীকে সরাসরি হারানোর চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত এই সব আসনে বিজেপি প্রার্থী জিতবেন না, সেটা শুভেন্দুর অজানা নয়। তবে তৃণমূলকে হারিয়ে নিজের চ্যালেঞ্জ রক্ষা করতে শুভেন্দু আড়ালে বিশেষ কোনও পরিকল্পনা নিয়েছেন কি না, সেই দিকেও নজর রয়েছে অনেকের। মালদহে প্রচারে এসে শুভেন্দু গনি-পরিবারের প্রশংসা করেছেন। যা এক প্রকার বার্তা বলেও মনে করছে রাজনৈতিক শিবিরের একাংশ।
তবে এ সব আমল দিতেনারাজ তৃণমূল। শাসক দলের জেলা সভাপতি বলেন, ‘‘গনি খান সাহেব মালদহের জন্য অনেক কিছু করেছেন। কিন্তু তার মানে এই নয়, তাঁর পরিবারের সবাইকে মানুষ চাইবে। মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূলের উন্নয়নের পক্ষেই ভোট দেবেন।’’ যদিও মৌসম মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘‘মানুষ আজও আমাদের গনি খানের উত্তরাধিকারী হিসেবেই বিবেচনা করেন।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)