অভিযোগ বনাম উন্নয়নের তরজায় কঠিন লড়াই ফিরদৌসির

বেহাল রাস্তা, নিকাশির সমস্যা, দলীয় কর্মীদের বিরুদ্ধে সরকারি ও বেসরকারি জমি দখলের অভিযোগ, পুরপ্রতিনিধি ও পঞ্চায়েত স্তরে দুর্নীতি— সব বিষয়ে এলাকায় ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছে বলে দাবি বিরোধীদের।

শুভাশিস ঘটক

শেষ আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৩৬
বর্ষায় বেহাল দশা এলাকার রাস্তার।

বর্ষায় বেহাল দশা এলাকার রাস্তার। —ফাইল চিত্র।

জলাজমি ভরাট করে তৈরি কারখানায় ২৭ শ্রমিকের মৃত্যু থেকে শুরু করে দুর্নীতি, তোলাবাজি ও মাদক কারবারের অভিযোগ— একাধিক তিরে বিদ্ধ সোনারপুর উত্তরের তৃণমূল প্রার্থী ফিরদৌসি বেগম। এই ক্ষোভের আবহেই তিন বারের বিজয়ীর জন্য চতুর্থ বারের জয়ের লড়াই কঠিন হচ্ছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

বেহাল রাস্তা, নিকাশির সমস্যা, দলীয় কর্মীদের বিরুদ্ধে সরকারি ও বেসরকারি জমি দখলের অভিযোগ, পুরপ্রতিনিধি ও পঞ্চায়েত স্তরে দুর্নীতি— সব বিষয়ে এলাকায় ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছে বলে দাবি বিরোধীদের। পাশাপাশি, শাসকদলের যোগসাজশে গাঁজা ও মাদক ব্যবসা বেড়েছে বলেও অভিযোগ। এমনকি, বিধায়ক-ঘনিষ্ঠ কিছু দলীয় কর্মী ও পুরপ্রতিনিধির সঙ্গে মাদক কারবারিদের যোগাযোগ রয়েছে বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের একাংশের।

এই আবহেই গত ২৫ জানুয়ারি খেয়াদহ-২ পঞ্চায়েতের নাজিরাবাদ এলাকায় বেআইনি ভাবে জলাজমিতে গড়ে ওঠা একটি মোমো কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ২৭ জন শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনাও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। অভিযোগ, জলাজমি ভরাট করে অবৈধ নির্মাণ শাসকদলের স্থানীয় নেতাদের মদতেই হয়েছে। আইনের তোয়াক্কা না করে আদিবাসীদের জমি দখল ও জলা ভরাটের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়েরাও। অভিযোগ, অবৈধ জমি দখল ও বিক্রির কোটি টাকার লেনদেনের ভাগ পৌঁছচ্ছে দলের শীর্ষ স্তর পর্যন্ত। বিরোধীদের দাবি, এই অর্থই স্থানীয় রাজনীতির নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা নিচ্ছে।

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সোনারপুর উত্তরে মূলত দ্বিমুখী লড়াইয়ের আভাস। এক দিকে তৃণমূলের তিন বারের বিধায়ক ফিরদৌসি বেগম, অন্য দিকে বিজেপির প্রার্থী, প্রাক্তন পুলিশকর্তা দেবাশিস ধর। তবে এই লড়াইয়ে সিপিএম ও কংগ্রেস প্রার্থীরাও সক্রিয় ভাবে ময়দানে রয়েছেন, এবং শাসকদলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলিকেই হাতিয়ার করছেন তাঁরা।

তবে শাসকদলের নেতাদের দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি তুলে ধরে। তাঁদের বক্তব্য, গত ১৫ বছরে সোনারপুর উত্তর এলাকায় উন্নয়নের জোয়ার এসেছে। রাস্তাঘাট, আলো, পানীয় জল, নিকাশি— সব ক্ষেত্রেই উন্নতি হয়েছে। গড়িয়া, সোনারপুর এবং পঞ্চায়েত এলাকায় একের পর এক বড় রাস্তা তৈরি হয়েছে বিধায়কের উদ্যোগে। বিভিন্ন এলাকায় সৌন্দর্যায়ন, পাকা রাস্তা এবং পরিচ্ছন্ন বাজার গড়ে তোলা হয়েছে। বাম আমলের অন্ধগলিকে রাজপথে পরিণত করার দাবিও করছেন তাঁরা। গড়িয়া-সোনারপুর অঞ্চলের দীর্ঘদিনের নিকাশি সমস্যার সমাধানে খাল সংস্কারের কাজও হয়েছে বলে দাবি শাসক শিবিরের।

ফিরদৌসি বলেন, “গত ১৫ বছরে সোনারপুর উত্তরে রাস্তা, পানীয় জল থেকে শুরু করে নানা পরিষেবার উন্নয়ন হয়েছে। সুফল পেয়েছেন সাধারণ মানুষ। আমার কাজ এবং রাজ্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পে মানুষ উপকৃত হয়েছেন।” তবে তাঁর সংযোজন, “বিধায়কের হাতে সব উন্নয়ন থাকে না। পুরসভা ও পঞ্চায়েতের নিজস্ব বরাদ্দ রয়েছে। তারা তাদের মতো কাজ করে। আইনশৃঙ্খলা বা মাদক ব্যবসার বিষয়টি পুলিশের দেখার কথা।”

অন্য দিকে, বিজেপি প্রার্থী দেবাশিস শাসকদলের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ শানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, “কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্পের কাজ কাটমানির খেলায় কার্যত ভেস্তে গিয়েছে। রাস্তা তৈরি বা নিকাশি সংস্কারের কাজ হওয়ার পরেও ভগ্নদশা কাটেনি।” নির্বাচনী প্রচারের ফাঁকে তিনি বলেন, “সোনারপুর উত্তরের মানুষ দুষ্কৃতীরাজ ও শাসকদলের গুন্ডামিতে আতঙ্কিত। প্রতিবাদ করলেই মারধর, হুমকি, পুলিশের মিথ্যা মামলা—এই পরিস্থিতি চলছে।”

নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে দেবাশিসের দাবি, “আমি বরাবর ‘রাফ অ্যান্ড টাফ’। দলদাস হতে পারিনি বলেই চাকরি ছেড়েছি। মানুষের ন্যায্য অধিকার পাইয়ে দেওয়ার জন্য সরাসরি রাজনীতিতে এসেছি। এলাকায় মাদক কারবার এক রাতেই বন্ধ করার উপায় আমার জানা আছে।”

তাঁর আরও অভিযোগ, “কেন্দ্রীয় সরকারের অম্রুত প্রকল্পে প্রায় ১৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে রাজপুর-সোনারপুর পুরসভায়। কিন্তু প্রকল্প কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে। বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও কাজ কচ্ছপের গতিতে চলছে। কোটি কোটি টাকা নয়ছয়ের অভিযোগ রয়েছে। জল প্রকল্পের নামে রাস্তা খুঁড়ে রাখা হয়েছে সর্বত্র।” দেবাশিসের আরও দাবি, এই প্রকল্পের দায়িত্বে রয়েছেন বিধায়কের স্বামী নজরুল আলি মণ্ডল। তাঁর অভিযোগ, দুর্নীতির টাকা সমবায় ব্যাঙ্ক ও ব্যবসার মাধ্যমে সাদা করা হচ্ছে। দেবাশিস বলেন, “গুন্ডামি ও সরকারি সম্পত্তি দখল—সব বন্ধ হবে।”

রাজপুর-সোনারপুর পুরসভার ১৭টি ওয়ার্ড ও পাঁচটি পঞ্চায়েত এলাকা নিয়ে গঠিত সোনারপুর উত্তর বিধানসভা কেন্দ্র। বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই টাকা দিতে হচ্ছে। সম্পত্তি বিক্রি করতে গেলে স্থানীয় নেতা বা পুরপ্রতিনিধিকে ২০ হাজার টাকা দিতে হয় বিক্রেতাকে। সমপরিমাণ টাকা যায় ক্রেতার পকেট থেকেও। না দিলে নানা ভাবে হেনস্থার শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ। একই সঙ্গে নির্মাণ ক্ষেত্রেও সিন্ডিকেট রাজের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের কথায়, পছন্দ মতো নির্মাণ সামগ্রী কেনার সুযোগ নেই। শাসকদল-ঘনিষ্ঠ সিন্ডিকেটের কাছ থেকেই বেশি দামে নিম্ন মানের সামগ্রী নিতে বাধ্য হন তাঁরা।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, সরকারি বরাদ্দে গড়িয়া, সোনারপুর, কামরাবাদ, নরেন্দ্রপুর এলাকায় বড় রাস্তা ও সৌন্দর্যায়নের কাজ করেছেন বিধায়ক। কিন্তু উদ্বোধনের পরেই শাসকদলের পুরপ্রতিনিধি ও ঘনিষ্ঠ নেতারা রাস্তার দু’পাশ দখল করে বিক্রি করে দিয়েছেন। ফলে ৪০ ফুট রাস্তা কার্যত ২০ ফুটে নেমে এসেছে।

সিপিএম প্রার্থী মোনালিসা সিংহের কথায়, “এলাকায় আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। মানুষকে মানুষ বলে মনে করা হয় না। সামান্য বৃষ্টিতেই বাড়িতে জল ঢুকে যায়। মহিলাদের নিরাপত্তা বড় প্রশ্ন। এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে বিধানসভায় কথা বলতেই প্রার্থী হয়েছি।”

কংগ্রেস প্রার্থী, চিকিৎসক জগন্নাথ কুমিরও একই সুরে বলেন, “এই আতঙ্কের পরিবেশ থেকে মানুষকে মুক্তি দিতেই লড়াই করছি।”

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালে বিধানসভায় ফিরদৌসি বেগম প্রায় ৩৭ হাজার ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে সেই ব্যবধান কমে প্রায় ৩২ হাজারে দাঁড়িয়েছে। এ দিকে, ভোটার তালিকার সংশোধনে প্রায় ১৩ হাজার নাম বাদ পড়ার বিষয়টিও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে উন্নয়ন বনাম দুর্নীতির অভিযোগ, শাসক ও বিরোধীদের তরজায় জিতবে কে, তার উত্তর মিলবে ৪ মে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Sonarpur

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy