২০২১ সালের ভোটে তৃণমূল প্রথম স্লোগান দিয়েছিল ‘খেলা হবে’। সেই প্রচারে দেখা গিয়েছিল বিভিন্ন জনসভায় মঞ্চ থেকে ফুটবল ছুড়ছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই ভোট জিতে তৃণমূল সরকারে আসার পর গত পাঁচ বছরে মফস্সল, গ্রামে ‘খেলা হবে’ নামে অনেক টুর্নামেন্ট হয়েছে। সেই সব টুর্নামেন্টে মূলত জড়িয়েছিল ক্রিকেট এবং ফুটবল। কিন্তু এ বার ভোটের ময়দানে সেই খেলায় জুড়ে যাচ্ছে লুডোও।
তৃণমূল নতুন প্রচারের আঙ্গিক প্রকাশ্যে আনতে চলেছে— লুডো। যে লুডোতে থাকবে ছক্কা, সাপ-লুডোর ঘর। আনন্দবাজার ডট কম-এর হাতে সেই লুডোর বোর্ডের ছবি এসেছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, সাপ-লুডোর ঘরে ‘সিঁড়ি’ হচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নানা জনকল্যাণমূলক প্রকল্প। আর ‘সাপ’ হয়ে হাজির হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার বা বিজেপির নেতারা।
তৃণমূল যে সাপ-লুডোর বোর্ড প্রকাশ করতে চলেছে, তা জুড়ে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প। তবে সেই সব প্রকল্প রয়েছে সিঁড়ির তলায়। সেই সিঁড়ি ধরে উঠে গেলেই পৌঁছে যাওয়া যাবে এমন ঘরে, যেখানে থাকবে প্রকল্পের উপভোক্তাদের ছবি। আবার কোথাও কোথাও সিঁড়ির তলায় রয়েছে প্রকল্পের বাস্তব রূপের ছবি। সিঁড়ি দিয়ে উঠলে পৌঁছে যাওয়া যাবে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নামে। ধরা যাক, বোর্ডের ৯ নম্বর ঘরে রয়েছে ‘বাংলার বাড়ি’। সেই ঘরে থাকা সিঁড়ি ধরে ঘুঁটি পৌঁছে যাবে সোজা ৩০ নম্বর ঘরে। সেখানে দেখানো হয়েছে সরকারের ওই প্রকল্পে কী উপকার হচ্ছে। তেমনই বোর্ডের ১২ নম্বর ঘরে রয়েছে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’। ওই ঘরে থাকা সিঁড়ি ধরে সোজা পৌঁছে যাওয়া যাবে ৯৬ নম্বর ঘরে। অর্থাৎ, ওই খেলা জিততে গেলে প্রয়োজন মাত্র চার। উল্লেখ্য, গোটা বোর্ডে ওটাই সবচেয়ে লম্বা সিঁড়ি।
তবে ১০০ বা ‘জয় বাংলা’র ঘরে পৌঁছোতে গেলে খেলোয়াড়দের পেরোতে হবে ‘দু’মুখো সাপ’। তার এক দিকে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আর অন্য দিকে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের মুখের ছবি। বোঝানো হয়েছে, ওই দুই ঘরে ঘুঁটি গেলে সাপের মুখে প়ড়তে হবে খেলোয়াড়কে। নেমে আসতে হবে নীচে। বোর্ড জুড়ে যে সব ঘরে সাপের মুখ রয়েছে সেখানে কোনও কোনও বিজেপি নেতার ছবি রয়েছে। হয় সেটা শুভেন্দু অধিকারী, নয় সুকান্ত মজুমদার, দিলীপ ঘোষ বা শমীক ভট্টাচার্য। সেই সব ছবির পাশে লেখা ‘কেন্দ্রীয় বঞ্চনা’র অভিযোগের কথা। উল্লেখ্য, সাপ-লুডো খেলার নিয়ম— ছক্কা ফেলতে হয় বোর্ডে। সেখানে যে সংখ্যা থাকবে, তা ধরে এগোয় ঘুঁটি। ১ থেকে ১০০-তে পৌঁছোতে কখনও কেউ সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে উঠে যান, আবার কখনও কেউ সাপের মুখে পড়ে নীচে নেমে যান। এ ভাবে যিনি আগে ১০০-তে পৌঁছোতে পারবেন, তিনিই জিতবেন।
আরও পড়ুন:
সূত্রের খবর, এই লুডো গ্রামেগঞ্জে বিলি করবে তৃণমূল। কেন? কারণ, এখনও গ্রাম, মফস্সলের বিভিন্ন জায়গায়, মূলত মহিলারা রান্নাবান্না, সংসারের কাজের পরে দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত একসঙ্গে গল্পগুজব করেন। গ্রাম-মফস্সলে সেই গল্পগুজবের আসরে লুডো একটা উপাদান। সেখানে খেলা হয়। সেই খেলায় ঘুঁটি খাওয়া থাকে। ভোটের বাজারে সেই লুডোকে গ্রাম-মফস্সলের সেই অংশের মধ্যে প্রচারে আনতে চাইছে তৃণমূল। প্রথম লক্ষ্য, মহিলা। দ্বিতীয় লক্ষ্য, গ্রামীণ এবং মফস্সল এলাকার জনগণ, যারা অবসর কাটায় চার দেওয়ালের বাইরে। হয় তাস খেলে, লুডো খেলে, না-হয় বটগাছের নীচে বা মাচায় বসে আড্ডা মেরে। পশ্চিমবঙ্গের মানচিত্রে শহর বা শহরতলি যা রয়েছে, তার থেকে অনেক বেশি অংশ জুড়ে রয়েছে এই জনপদ। সেখানে প্রচারে তৃণমূল এই ‘লুডো’কে অস্ত্র করতে চলেছে।
লুডো বাঙালির ঘরোয়া আসরে বহু প্রাচীন খেলা। যে খেলার সঙ্গে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করতে পারে বৃদ্ধ থেকে তরুণ প্রজন্ম। একটা সময় লোকাল ট্রেনকে বলা হত ‘তাসের দেশ’। সেখানে ব্রিজ, ২৯, কলব্রে ইত্যাদি তাসের খেলার যে রমরমা ছিল, তা একটা সময় সন্ত্রাসের জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিল। ঘটনাচক্রে, মমতা যখন ইউপিএ-২ জমানায় রেলমন্ত্রী ছিলেন, তখন থেকেই লোকাল ট্রেনে এই ‘তাসের দেশ’ ভাঙতে শুরু করে। এখন হাওড়া, শিয়ালদহের বিভিন্ন শাখার লোকাল ট্রেনের বগিগুলো ‘তাসের দেশ’ থেকে ‘লুডোর দেশে’ পরিণত হয়েছে। কারণ এখন মোবাইলেই লুডো খেলা যায়। অনেকের মতে, সেই প্রেক্ষিতে লুডো এখন সর্বজনীন রূপ নিয়েছে। তার সঙ্গে বর্তমান সময় এবং এ রাজ্যের বিশেষ করে মহিলা এবং বৃদ্ধদের পুরাতন নাড়ির যোগ রয়েছে। সেই লুডোকেই এ বার অস্ত্র করতে চাইছে তৃণমূল, যা দু’-এক দিনের মধ্যেই আনুষ্ঠানিক ভাবে উন্মোচিত হতে পারে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, প্রচুর পরিমাণে ভোট পড়লে তা সাধারণত স্থিতাবস্থা বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী হয়। অর্থাৎ, ক্ষমতাসীন সরকারের বিপক্ষে যায় জনতার রায়। তবে দীর্ঘলালিত এই ধারণার প্রতিযুক্তিও ছিল। তৃণমূলের তরফে গত লোকসভা এবং বিধানসভা ভোটের উদাহরণ দিয়ে দাবি করা হচ্ছিল, অনেক ভোট পড়লেও এ রাজ্যে তা শাসকের পক্ষেই গিয়েছে বরাবর। বিজেপির পাল্টা যুক্তিতে আবার ছিল ২০১১ সালের ‘পরিবর্তনের ভোট’। সে বারও প্রচুর ভোট পড়েছিল এবং ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে নতুন সরকার গড়েছিলেন মমতা। এ বারের ভোটে এসআইআর সুবিধা করে দিল বিজেপির।
- ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) যে হয়রানিকে প্রচারে হাতিয়ার করেছিল তৃণমূল, তা কাজে এল না। পশ্চিমবঙ্গবাসী ভোট দিলেন বিজেপির পক্ষেই। ফলে এ রাজ্যেও ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার তৈরি হতে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গ জয় করেছে বিজেপি। গত লোকসভা নির্বাচনেও যে দল সে ভাবে দাঁত ফোটাতে পারেনি, দু’বছরের ব্যবধানে তারাই ২০০-র গণ্ডি ছুঁয়ে ফেলেছে। জেলায় জেলায় পদ্মের ঝড়ে উড়ে গিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থীরা।
-
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভেঙে দিলেন রাজ্যপাল আরএন রবি, ইস্তফা না-দিলেও মমতা এখন ‘প্রাক্তন’ মুখ্যমন্ত্রী! রাজ্য কার?
-
বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী মোদী! রাজ্যে প্রচারে এসে দিয়ে গিয়েছিলেন কথা
-
ভোট-পরবর্তী গোলমালে রুজু ২০০ এফআইআর! কেউ কেউ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অশান্তি পাকাতে চাইছেন: ডিজি সিদ্ধনাথ
-
‘কমিশন ১০টি গণনাকেন্দ্রের ছয় ঘণ্টার ফুটেজ দিক, দেখাক কিছু হয়নি, আমি মেনে নেব এটাই জনাদেশ’! চ্যালেঞ্জ অভিষেকের
-
৪৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে রাজ্যে ২০৭টি আসনে জয় পেল বিজেপি! ৮০টি আসনে জয়ী তৃণমূল, তাদের ভোটের হার কত