E-Paper

দেওয়াল লিখন ফিকে, শহরের মুখ ঢেকেছে ব্যানারে

শহরের বহু পুরনো এলাকায় এখনও হাতে লেখা স্লোগান, রাজনৈতিক বা সামাজিক বার্তা চোখে পড়ে বটে, তবে তা যেন অনেকটাই অতীতের স্মৃতিচিহ্ন। ক্রমশ তারা ঢেকে যাচ্ছে হোর্ডিং, ব্যানারের অন্তরালে। ফলে শহরের দেওয়াল ধীরে ধীরে হারাচ্ছে তার নিজস্ব ভাষা ও পরিচয়।

হিন্দোল ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ ১০:০১
ভোটের আগে ট্যাংরা এলাকায় দেওয়াল লিখন।

ভোটের আগে ট্যাংরা এলাকায় দেওয়াল লিখন। ছবি: বিশ্বনাথ বণিক।

কলকাতার অলিগলিতে দেওয়াল লিখন এক সময়ে শুধু রাজনৈতিক প্রচারের মাধ্যমই নয়, ছিল শহরের এক বিশেষ ঐতিহ্যের চিহ্ন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দেওয়াল লিখনের ঐতিহ্য অনেকটাই ফিকে। বরং আজ শহরের মুখ ঢেকেছে বড় বড় ফ্লেক্স, ব্যানার, ঝকঝকে হোর্ডিংয়ে।

শহরের বহু পুরনো এলাকায় এখনও হাতে লেখা স্লোগান, রাজনৈতিক বা সামাজিক বার্তা চোখে পড়ে বটে, তবে তা যেন অনেকটাই অতীতের স্মৃতিচিহ্ন। ক্রমশ তারা ঢেকে যাচ্ছে হোর্ডিং, ব্যানারের অন্তরালে। ফলে শহরের দেওয়াল ধীরে ধীরে হারাচ্ছে তার নিজস্ব ভাষা ও পরিচয়। দেওয়াল চিত্রকর রমেন পাল বলছিলেন, ‘‘পঞ্চায়েত ভোটে দেওয়াল লিখনের বরাত বেশি পাওয়া গেলেও লোকসভা ও বিধানসভা ভোটে এখন আর অতটাও চাপ থাকে না। দেওয়াল লিখনের চল যে একদম কমে গিয়েছে, তা নয়। তবে কিছু পরিবর্তন অবশ্যই এসেছে। আগে ১০০ শতাংশ কাজ থাকলে এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭০ শতাংশে।” তাঁর কথায় স্পষ্ট, এই পরিবর্তন জীবিকার ক্ষেত্রেও বড় প্রভাব ফেলছে। ভোট এলেই যে সব শিল্পী দেওয়াল লিখনের অপেক্ষা করে থাকতেন, তাঁদের অনেককেই এখন বিকল্প আয়ের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে।

অন্য দিকে, গ্রাফিক্স ডিজ়াইনার শুভ্রদীপ মুখোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, ভোটের মরসুমে কম সময়ে বিপুল সংখ্যায় ব্যানার বা ফ্লেক্সের চাহিদা রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলির। সময়ের অভাবে অনেক সময়ে তিনি সব কাজ হাতে নিতেও পারছেন না। তাঁর মতে, দেওয়াল লিখনের চল থাকলেও এখন ব্যানার তৈরির চাহিদা এবং চাপ অনেকটাই বেশি।

শুধু শিল্পীরাই নন, এই পরিবর্তন নজর এড়ায়নি সাধারণ মানুষেরও। বরাহনগর বিধানসভা কেন্দ্রের বাসিন্দা উজান শ্রাবণ যেমন বলছেন, ‘‘রাস্তায় বেরোলেই এখন চার দিকে শুধু ব্যানার আর ব্যানার। আগে দেওয়াল লিখন রাজনীতির একটি অংশ ছিল। কিন্তু এখন ব্যানারের চাপে সেই ঐতিহ্য মলিন। তা ছাড়া, ঝড়বৃষ্টিতে ব্যানার ছিঁড়ে রাস্তায় পড়ে থাকলে চলাচলেও অসুবিধা হয়।” জগদ্দলের এক বাসিন্দা আবার বলছেন, “দেওয়াল লিখন সুন্দর হলেও অনেক সময়ে তা বাড়ির নতুন রং নষ্ট করে দেয়। তখন আবার রং করতে খরচ করতে হয়। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে এ নিয়ে খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছে। তার বদলে ব্যানার লাগালে নির্বাচনের পরে সেগুলি খুলে নিলেই হল!” অর্থাৎ, দেওয়াল লিখন কখনও কখনও ব্যক্তিগত সম্পত্তির ক্ষতির কারণও হয়ে দাঁড়ায়।

সোনারপুর উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের বাসিন্দা দিয়াসা পাল বলেন, “দৃশ্যদূষণ মারাত্মক হারে বেড়েছে। দেওয়াল লিখন বিষয়টি ভাল— অনেক কার্টুন দেখা যায়। তার বদলে চার দিক যদি ব্যানারেই ঢেকে যায়, তা হলে তাতে শহরেরই ক্ষতি। আগে তো দেওয়াল লিখনে ছড়া বা ছন্দের ব্যবহার করা হত, এখন আর তেমন চোখেই পড়ে না।” আবার ব্যারাকপুরের এক বাসিন্দার অভিজ্ঞতা, দেওয়ালে কোন রাজনৈতিক দলের প্রচার লেখা হবে, তা নিয়ে অনেক সময়ে বাড়ির সামনেই বিবাদে জড়ান বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকেরা। তার বদলে পাশাপাশি ব্যানার লাগানো হলে তাতে অশান্তির পরিমাণ কমে।

তা হলে ঠিক কোন কারণে রাজনৈতিক দলগুলিও বর্তমানে দেওয়াল লিখনের বদলে ব্যানার-ফ্লেক্সের দিকে ঝুঁকছে? সিপিএমের রাজ্য কমিটির সদস্য সৃজন ভট্টাচার্য বলেন, “মানুষের কাছে আরও দ্রুত পৌঁছতে এখন ব্যানার বা ডিজিটাল প্রচারের পথে এগোতে হচ্ছে। দেওয়াল লিখন করা সময়সাপেক্ষ, খরচও আছে। তাই বিকল্প পথ নিতে হচ্ছে। তবে সাবেক দেওয়াল লিখন ছাড়া আজও নির্বাচন কল্পনা করা যায় না।” তৃণমূলের মুখপাত্র সুদীপ রাহা আবার বললেন, “বাংলায় এখনও যে ভাবে দেওয়াল লিখন হয়, তা দেশের অন্যান্য রাজ্যে দেখা যায় না। সুস্থ বার্তা দেওয়ার এই প্রক্রিয়া আমরা ধরে রেখেছি। তবে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রচারের ধরনে কিছু পরিবর্তন আসবেই। তা বলে পুরনো ঐতিহ্যকে পুরোপুরি বাদও দেওয়া যায় না।” বিজেপির উত্তর কলকাতা জেলা সভাপতি তমোঘ্ন ঘোষের মতে, ‘‘অনেক বাড়ি বা আবাসনে নতুন রং হলে সেখানে দেওয়াল লিখন করতে তাঁরা অনুমতি দেন না। তা ছাড়া, সমাজমাধ্যমে প্রচার আজ প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। সুতরাং দেওয়াল লিখন একেবারেই হচ্ছে না, তা নয়। তবে ব্যানার, পোস্টার বা ডিজিটাল প্রচারের প্রভাব তুলনায় অনেকটাই বেশি।’’

তবে পরিবেশ ও শহরের নান্দনিকতার দিকটিও রয়েছে। পরিবেশের কথা মাথায় রেখে ব্যানার-পোস্টারের ব্যবহার কমানোর পক্ষেই বলছেন পরিবেশবিদ স্বাতী নন্দী চক্রবর্তী। তাঁর কথায়, “ভোটের পরে ব্যানার-পোস্টার অনেক সময়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়। তাতে কার্বন ডাইঅক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড বাতাসে মিশে পরিবেশ দূষণ ঘটায়। মাটিতে মিশলে ভূগর্ভস্থ জলের উপরেও তার প্রভাব পড়তে পারে। সে দিক থেকে দেওয়াল লিখন বা ডিজিটাল প্রচার তুলনামূলক ভাবে পরিবেশবান্ধব।”

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

wall writing Political Campaign

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy