শিশুটির জীবন বাঁচাতে প্রয়োজন ছিল ন’কোটি টাকা। রাজারহাটের বাসিন্দা শিশুটির বাবা, মাছ ব্যবসায়ী সুবিনয় মণ্ডলের পক্ষে ওই বিপুল টাকা জোগাড় করা সম্ভব ছিল না। অগত্যা, ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে মেয়ের চিকিৎসার টাকা তুলতে সচেষ্ট হন মণ্ডল দম্পতি। দেড় বছর ধরে টানা আইসিইউ-তে ছিল সেই শিশু। ওষুধ পেতে টাকার অপেক্ষায় থাকা, স্পাইনাল মাস্কুলার অ্যাট্রফি (এসএমএ) টাইপ ওয়ানে আক্রান্ত বছর দুয়েকের সেই আদৃতি দিন কয়েক আগে ঘুমের দেশে চলে গিয়েছে। সন্তানের চোখ দুটো বাঁচিয়ে রাখতে কর্নিয়া দানের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সুবিনয় ও সীমা মণ্ডল। সীমার আক্ষেপ, দেড় বছর ধরে অপেক্ষা করেও টাকা ওঠেনি।
প্রশ্ন উঠছে, কেন রাজনৈতিক দলগুলির ইস্তাহারে বিরল রোগ ঠাঁই পায় না? তাঁরা মুষ্টিমেয় বলেই কি এই অবহেলা?
সরকারের দাবি, বিরল রোগের বিপুল খরচের জোগান দেওয়া তাদের তরফে সম্ভব নয়। ওই রোগে আক্রান্তদের অভিভাবকের প্রশ্ন, বছরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা দুর্গাপুজোর অনুদান হিসেবে ক্লাবগুলিকে যখন দেওয়া হয়, তখন ভাঁড়ার শূন্য কিনা, তা কি ভাবে সরকার? রাজ্যের ৪৫ হাজার ক্লাবকে গত দুর্গাপুজোয় ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছিল।
অথচ, বিরল রোগীদের জন্য সরকারি প্রচেষ্টা বলতে, ন্যাশনাল পলিসি ফর রেয়ার ডিজ়িজ়ে কেন্দ্রীয় বাজেট থেকে বরাদ্দ টাকা। এক জন রোগী জীবিত অবস্থায় সেই অনুদান সর্বাধিক ৫০ লক্ষ টাকা পেতে পারেন। তবে ওই রোগগুলির ক্ষেত্রে কিছু কেন্দ্রীয় নির্দেশিকা মেনে অনুদান দেওয়া হয়। নির্দেশিকা ছাড়াও রোগের মাত্রা, রোগীর বয়স এবং সম্ভাবনা দেখে ওষুধের টাকা রোগীকে বরাদ্দ করা হয়। ফলে, সব নথিভুক্ত রোগী টাকা পান না। পাশাপাশি রয়েছে রাজ্য সরকারি কর্মীদের সন্তানের ক্ষেত্রে পাওয়া হেলথ স্কিমের টাকা।
দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার উৎকর্ষ কেন্দ্র (সেন্টার অব এক্সেলেন্স) এসএসকেএমের নোডাল অফিসার, চিকিৎসক সুচন্দ্রা মুখোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, কেন্দ্রীয় সরকারের ক্রাউড ফান্ডিংয়ের একটি পোর্টাল আছে, যেখানে নাম নথিভুক্ত হওয়া বিরল রোগীদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য থাকে। ইচ্ছুক ব্যক্তি বা সংস্থা সেই পোর্টালে গিয়ে নির্দিষ্ট রোগীর জন্য টাকা দিতে পারেন। এ ছাড়া, ‘কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটিজ়’ (সিএসআর) তহবিল থেকে এই ধরনের রোগের খাতে টাকা যাতে আসে, সেই চেষ্টা শুরু করছে কেন্দ্র। এত দিন বিরল রোগের খাতে সিএসআর তহবিল থেকে টাকা আসত না। এ সবের বাইরে ক্রাউড ফান্ডিং ছাড়া বিপুল অর্থ সংগ্রহের উপায় নেই।
অভিভাবকদের দাবি, এই সব সরকারি ব্যবস্থা প্রয়োগে বহু জটিলতা আছে। ফলে বহু রোগীর কাছেই সেই সব সুবিধা পৌঁছয় না। ক্ষোভ-বিক্ষোভও রয়েছে বিস্তর। শাসকদলের ভোটের ইস্তাহারেও কেন নেই এই প্রসঙ্গ? রাজ্যের স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে প্রচারের ফাঁকে এই প্রশ্ন শুনে কার্যত বিরক্ত হলেন। তাঁর মন্তব্য, ‘‘ইস্তাহার যা হওয়ার বেরিয়েই গিয়েছে। মন্তব্য করার প্রয়োজন মনে করছি না।’’
বামফ্রন্টের তরফে ফুয়াদ হালিমের যুক্তি, ‘‘বামফ্রন্ট প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলির পরিকাঠামো উন্নত করা নিয়ে বরাবর বলে থাকে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলি শক্তিশালী করলেই সাধারণ রোগীরা চিকিৎসা পাবেন। তখনই তাঁদের থেকে বিরল রোগীকে আলাদা করে আরও উন্নত পরিকাঠামো যুক্ত স্তরে পাঠানো সম্ভব। বামফ্রন্টের ইস্তাহারে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিকাঠামো বৃদ্ধির যে কথা রয়েছে, সেটাই বিরল রোগের পক্ষে সওয়াল।’’
বিরল রোগ এমপিএস টু-তে আক্রান্ত আরিয়ান চৌধুরীর মা দেবযানী চৌধুরী বিষয়টি নিয়ে হতাশ। তিনি বলেন, ‘‘চিকিৎসা ক্ষেত্রে অগ্রগতি হচ্ছে অবশ্যই। তাই বিরল রোগ চিহ্নিত হচ্ছে। কিন্তু ওই রোগীদের অনেকেই চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে অবহেলার স্বীকার হচ্ছেন। ব্যক্তিগত অনেক সংগ্রামের ফলে এখন আমাদের ছেলে ওষুধ পাচ্ছে। সেই রকম মানসিকতা বা পরিস্থিতি বহু পরিবারের নেই। বিদেশে তো বিরল রোগীদের জন্য সরকারের ভাবনা-চিন্তা বহু দূর এগিয়েছে।’’
কিয়োর এসএমএ ফাউন্ডেশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা মৌমিতা ঘোষ বলেন, ‘‘এসএমএ-র মতো রোগে দ্রুত চিকিৎসা পেলে জীবন বাঁচে। রোগীর অক্ষমতা প্রতিরোধ হতে পারে। কেরলের মতো ‘স্টেট ফান্ড মডেল’ অনুসরণ করে পশ্চিমবঙ্গে দ্রুত চিকিৎসা, নবজাতকদের স্ক্রিনিং ও জেনেটিক টেস্টিং চালু করা জরুরি। শুধু জাতীয় নীতি নয়, এখন সময় বিরল রোগের নীতিকে রাজ্যভিত্তিক অগ্রাধিকার দেওয়া। ইস্তাহারে বিরল রোগের উল্লেখ জরুরি ছিল।’’
ডুসেন মাস্কুলার ডিস্ট্রফিতে আক্রান্ত প্রজ্জ্বল তালুকদারের বাবা পিনাকী তালুকদার বিষয়টি নিয়ে হতাশ। তাঁর মন্তব্য, ‘‘এই রোগীদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রপাতি বা সাপোর্ট সিস্টেমের খরচ বাড়ে। এর ওষুধ জিনের কিছু সংখ্যক মিউটেশনের জন্য প্রযোজ্য। আমার ছেলে সেই মিউটেশনের মধ্যে পড়ছে না। ফলে, ওষুধ পায় না। বাইপ্যাপ ও হার্টের দামি ওষুধের পাশাপাশি অন্য বিষয়গুলি মিলিয়ে সাড়ে আঠারো বছরের ছেলের জন্য মাসে ১৫-১৬ হাজার টাকা খরচ হয়। সে সব পাওয়া যায় না। অনুদানের রাজনীতিতে দলগুলির ইস্তাহারে এই রোগীদের উল্লেখ না থাকায় আমরাএই টুকু বুঝতে পারছি, আমাদের সন্তানের জন্য আগামী দিনগুলি কত কঠিন হতে পারে।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)