E-Paper

একই বটগাছের অজস্র ঝুরি! জোর টক্কর

শিয়রে বিধানসভা ভোট। কী পরিস্থিতি জেলায় জেলায়? খোঁজ নিল আনন্দবাজার।

দেবাঞ্জনা ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৪২
প্রচারেও সমানে সমানে টক্কর। কাঁথিতে।

প্রচারেও সমানে সমানে টক্কর। কাঁথিতে। — নিজস্ব চিত্র।

খেজুরির তেমাথার মোড়ে বট-অশ্বত্থের জড়াজড়ি। পেল্লায় গাছের পাশেই হরিমঞ্চ। অষ্টপ্রহরেরপ্রসাদ বিলিতে গোটা এলাকা যেন ভেঙে পড়েছে! মা-বোনেদের উচ্ছ্বাসই বেশি।

‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ পান? জয়া বেরা, শ্যামলী সামন্ত, কমলা দাসেরা বললেন, ‘‘পাই তো। সেখান থেকে হরিমঞ্চে প্রণামীও দিচ্ছি।’’জমায়েতে হাজির খেজুরির বিজেপি প্রার্থী সুব্রত পাইক। ঘুরে গিয়েছেন সাংসদ সৌমেন্দু অধিকারীও। বিজেপির পঞ্চায়েত সমিতির কর্মাধ্যক্ষ পবিত্র দাস আগে সিপিএম করতেন। এখন কপালে তিলক, গলায় গেরুয়া উত্তরীয়। পদ্মেরভোট-মাস্টার পবিত্রের হাসি, ‘‘ভিড় দেখেছেন! খেজুরি এ বারও আমাদের।’’ কিন্তু অধিকাংশই তো তৃণমূল সরকারের নানা প্রকল্পের উপভোক্তা? পবিত্রের দাবি, ‘‘টাকার থেকে ধর্ম অনেক বড়।’’ তবে তৃণমূল সরকারের ভাতা যেবিজেপির মাথাব্যথা, তার প্রমাণ গেরুয়া দেওয়ালে আঁকা অন্নপূর্ণার ভাঁড়। পদ্ম-প্রার্থীরাও মহিলাদের শোনাচ্ছেন, ‘‘আমরা ক্ষমতায় এলে অন্নপূর্ণা ভান্ডারে মাসে তিন হাজার টাকা দেব।’’

হেঁড়িয়ায় চায়ের দোকান মনোরঞ্জন ও পূর্ণিমা পাত্রের। ওই দম্পতি বললেন, ‘‘অনেকচেষ্টাতেও বার্ধক্য ভাতা পাইনি। ছেলেটা ইঞ্জিন দেওয়া রিকশা চালায়। ভাতা পেলে সুরাহা হত।’’ পেশায় রাজমিস্ত্রি, কণ্ঠিবাড়ির শেখ বাদশাশাজাহানের গলাতেও উষ্মা, ‘‘বাড়িটুকুও পাইনি।’’ শীপুরের বৃদ্ধা শিবানী মান্নার অনুযোগ, ‘‘বয়স হয়েছে বলে লক্ষ্মীর ভান্ডার দিচ্ছে না। বার্ধক্য ভাতাও পাই না। জ্বালা হয়েছে।’’ ফুলচাষি, পানচাষি থেকে মৎস্যজীবীরাও সরকারি নানা প্রকল্পের বঞ্চনায় ক্ষুব্ধ।

সব অভাব-অভিযোগ জড়ো করে ফের ভোটে পূর্ব মেদিনীপুর। জেলায় দেড় লক্ষের বেশিনাম ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনে (এসআইআর) বাদ পড়লেও, ভোটের অঙ্কে কোনও বিধানসভাতেই বড় ছাপফেলছে না। ধর্মের ভাগাভাগির কথা বিজেপি নেতারাও সে ভাবে বলছেন না। উল্টে, রাজ্যের বিরোধী দলনেতা, বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীও বুকে টানছেন ফেজ টুপিকে। আর দুই ফুলের প্রার্থীরা মন্দিরে হত্যে দিচ্ছেন। তবে বেশির ভাগ গ্রামেঢোকার মুখে পতপতিয়ে উড়ছে দুই ফুলের পতাকা। বাঁশের উচ্চতা সমানে সমানে।

এগরার চায়ের দোকানদার গোকুল জানা বলছেন, ‘‘মোদী যতই সভা করুন, দিদিই জিতবেন।’’ এখানে অধিকারী বাড়ির ছেলে দিব্যেন্দুহারবে বলছেন? গোকুল নিশ্চিত, ‘‘হেলায় জিতবেন না।’’ এক বৃদ্ধের ক্ষোভ, ‘‘সব চাষজমি ভেড়ি হয়ে যাচ্ছে। না দেখে ধর্ম-ধর্ম করে চেঁচাচ্ছে।’’ ভগবানপুরে বিজেপি ছেড়ে আসা তৃণমূল প্রার্থী মানব পড়ুয়ার মোটরবাইক মিছিলের সামনেআবার মহিলাদের প্রশ্ন, ‘‘ছেলেমেয়েদের কাজ কোথায়?’’ দিঘার হোটেলের কর্মী চন্দন বারুই শোনাচ্ছেন, ‘‘উচ্চশিক্ষিতেরাও বসে আছেন। যুবসাথী নিচ্ছে মানেই ভোট দেবেন, এমন নয়।’’

শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির বলি হয়েছেন অনেকে। শিল্প-বন্দর শহর হলদিয়ায় নতুন বিনিয়োগ প্রায় আসেনি। তাজপুরে নতুনবন্দরও অধরা। হলদিয়ার বিজেপি প্রার্থী প্রদীপ বিজলি এক সময়ে লক্ষ্মণ শেঠের গাড়িচালক ছিলেন, এখন মজদুর সঙ্ঘের রাজ্য নেতা। জিতে পরিস্থিতি পাল্টাবেন বলছেন। লাগোয়া মহিষাদলের পদ্ম-প্রার্থীব্যবসায়ী সুভাষ পাঁজার মুখেও কর্মস‌ংস্থানের আশ্বাস। সে আশ্বাসেই ২০২১-এ পদ্ম প্রতীকে হলদিয়ায় জিতেছিলেন তাপসী মণ্ডল। এ বার তিনিই তৃণমূল প্রার্থী। তাঁকে নিয়ে ক্ষোভের অন্ত নেই। হলদিয়ায় লড়াই কঠিন, মানছেন তৃণমূলের জেলা সভাপতি সুজিতকুমার রায়ও।

চাপের উল্টো পিঠও আছে। পদ্মের বিদায়ী বিধায়ক হয়েও নিশ্চিন্ত নন ভগবানপুরের প্রার্থীশান্তনু প্রামাণিক ও ময়নার অশোক দিন্দা। শান্তনুকে খেজুরি থেকে ঠাঁইনাড়া হয়ে আসতে হয়েছে। অশোকের প্রতিপক্ষ মানব পড়ুয়া আবার বিজেপি ছেড়ে সদ্যতৃণমূলে এসেছেন। লোকে বলে, মানবের প্রতি শুভেন্দুর অসূয়া নেই। পটাশপুর ছেড়ে চণ্ডীপুরে আসা তৃণমূলের উত্তম বারিক যদিও নিশ্চিন্ত। কারণ, জেলা সভাধিপতি উত্তমের বিরুদ্ধে বিজেপির প্রার্থী চিকিৎসক পীযূষকান্তি দাস। লোকে বলছে, চণ্ডীপুরে ‘বোঝাপড়া’ হয়েছে দুই ফুলের। শুভেন্দুর জেলায় রাজনীতির অঙ্ক দস্তুর মতো কঠিন।

২০২১-এ জেলায় তৃণমূলের পক্ষে ফল ছিল ৯-৭। ২০২৪-এ দু’টি লোকসভাতেই পদ্ম ফোটে ও ১৬টির মধ্যে ১৫টি বিধানসভাতেই ‘লিড’ পায় বিজেপি। দুই শিবিরের নেতারাই মানছেন, একটি-দু’টিআসনে ফুল বদল হতে পারে। তবে হরেদরে হিসাব পাল্টাবে না। কিন্তু কেউই নিশ্চিত নন, কোন কেন্দ্রে ‘ব্রুটাস’ কে? নন্দকুমারের বিদায়ী তৃণমূল বিধায়ক সুকুমার দে থেকে তমলুকের নতুন প্রার্থী রাজপরিবারের উত্তরসূরি দীপেন্দ্রনারায়ণ রায়— কেউই তাই স্বস্তিতে নেই।চার বারের বিধায়ক, প্রাক্তন মন্ত্রী অখিল গিরিও জয়ের ব্যবধান বলতে পারছেন না। বরং তাঁর ছেলে কাঁথির পুরপ্রধান তৃণমূলের সুপ্রকাশ গিরি বলছেন, ‘‘আমাদের অনেক প্রার্থীই ‘দাদার অনুগামী’।’’ ময়নার চন্দন মণ্ডলও বিজেপি ছেড়েই তৃণমূলের টিকিট পেয়েছেন। খেজুরির তৃণমূল প্রার্থী রবীনচন্দ্র মণ্ডলওশুভেন্দুর হাত ধরে ছাত্র রাজনীতিতে এসেছিলেন। এখনও তৃণমূল কর্মীরা ‘দাদার’ বিরুদ্ধে মুখ খুললে প্রকাশ্যেই থামিয়ে দেন রবীন। বলেন, ‘‘এত উত্তেজিত হবেন না।’’ শাসকের অঙ্ক আরও জটিল করছেন টিকিট না পাওয়া জেলার দুই প্রাক্তন মন্ত্রী— সৌমেন মহাপাত্র ও বিপ্লব রায়চৌধুরী। মমতা-অভিষেকের সভায় থাকলেও তাঁরা প্রচারে নেই। সৌমেন বলছেন, ‘‘২-৪ চার শতাংশ ভোট এ দিক-ও দিক হতেই পারে।’’

এই কাটাকাটির খেলাতেই দুই ফুল তাকিয়ে বাম-আইএসএফের দিকে। পাঁশকুড়া পশ্চিমে সিপিএমের জেলা সম্পাদক নিরঞ্জন সিহি প্রার্থী হয়েও শেষ মুহূর্তে সরতে বাধ্যহয়েছেন নওসাদ সিদ্দিকীর প্রার্থীর জন্য। তবে বাম কর্মীরা যৌথ প্রচারে থাকছেন কই! ফলে, বিজেপি হিসাব কষছে, তৃণমূলের সংখ্যালঘু ভোট আইএসএফ কাটবে আর বাম ভোট রামে যাবে। বিপরীতে তৃণমূলের আশা, বামেরা ভোট ফেরাবে, দুর্বল হবে রাম। যদিও পাঁশকুড়া পূর্বের সিপিএম প্রার্থী শেখ ইব্রাহিম আলিরপ্রচারে হাতে গোনা ব্যানার। আর খেজুরির প্রার্থী হিমাংশু দাস একা গাড়িতে ঘুরছেন।

‘‘বামেদের যে ভোট আমরা পেয়েছি, তা কমবে না’’— বিশ্বাস রামনগরের বিজেপি প্রার্থী, শিক্ষক চন্দ্রশেখর মণ্ডলের। তাঁর দাবি, ‘‘তৃণমূলের লোকেরাও আমাদের জেতাবেন।’’ কেন? কাঁথি-জেলা বিজেপির নেতা পবিত্র প্রধানের ব্যাখ্যা, ‘‘এই জেলায় একটাই বটগাছ থেকে সব ঝুরি নেমেছে। কে, কার সঙ্গে পাক খেয়ে আছে, টেরও পাবেন না।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Purba Midnapore West Bengal Politics

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy