রাসবিহারীর আকাশে প্যাঁচ লেগেছে জোর

গত ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে রাসবিহারী বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপির থেকে তৃণমূল মাত্র দেড় হাজার ভোটে এগিয়ে। আর দু’বছরের মাথায়, এ বার ভোটার তালিকার সংশোধনের যোগ-বিয়োগে এখানে ভোটার কমেছে প্রায় ৪৪ হাজার।

রবিশঙ্কর দত্ত

শেষ আপডেট: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:১৬

—প্রতীকী চিত্র।

কেটে যাওয়া ভোটেই কি কাটা পড়বে রাসবিহারীর ঘুড়ি? লেক মার্কেটের গায়ে চায়ের দোকানে ভাসতে থাকা এই রূপক কিন্তু এ বার উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না! ভোটের খেলায় এ বার ‘থার্ড আম্পায়ার’ হিসেবে আবির্ভূত ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) ভূমিকায় আলাদা করে রাখা যাচ্ছে না তৃণমূল কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি দক্ষিণ কলকাতাকে। তার অন্যতম রাসবিহারী কেন্দ্রেও একই অবস্থা। রাজনৈতিক কর্মীরা তো বটেই, এই হিসাব কষে ফেলছেন সাধারণ মানুষও।

আসলে এসআইআর-এর ফলে বাদ ভোটার আর শেষ নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের ব্যবধানের তুলনা করে কেন্দ্রওয়াড়ি ফল অনুমান এ বারের ভোটের নতুন উপকরণ। তা নিয়েই কাপের পরে কাপ উড়ে যাচ্ছে খাস কলকাতার এই কেন্দ্রে। এই অঙ্কের হিসাবে শাসক তৃণমূলের ব্যথা থাকারই কথা এখানে। গত ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে রাসবিহারী বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপির থেকে তৃণমূল মাত্র দেড় হাজার ভোটে এগিয়ে। আর দু’বছরের মাথায়, এ বার ভোটার তালিকার সংশোধনের যোগ-বিয়োগে এখানে ভোটার কমেছে প্রায় ৪৪ হাজার। এমনকি, ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের হিসাব ধরলেও কমে যাওয়া ভোটারের সংখ্যা তৃণমূলের জয়ের ব্যবধানের প্রায় দ্বিগুণ! ওই নির্বাচনে তৃণমূল কম-বেশি ২১ হাজার ভোটে হারিয়েছিল বিজেপিকে।

এই হিসাব মাথায় রাখলে তৃণমূলের বিদায়ী বিধায়ক তথা এ বারের প্রার্থী দেবাশিস কুমারের চিন্তিত হওয়ার কারণ আছে। দেবাশিসের এক সতীর্থের কথায়, “আমরা দেখেছি, নির্দিষ্ট পরিকল্পনা করেই নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তাতে চাপ একটু বেড়েছে। তবে ব্যবধান কমলেও আসন নিয়ে সমস্যা হবে না।”

গত দু’-তিন মাসে এই হিসাব বাহ্যিক ভাবে যে ধারণা তৈরি করছে, তাতে এ বারের ভোটে গোটা রাজ্যের মতো এখানকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির উৎসাহিত হওয়ারই কথা। সেই উৎসাহকে কাজে লাগাতেই এখানে ওজনদার স্বপন দাশগুপ্তকে প্রার্থী করেছে তারা। এ রাজ্যে ভোটের রাজনীতিতে নতুন না হলেও রাসবিহারী কেন্দ্রের উচ্চ ও মধ্যবিত্ত বাঙালির মন ছুঁতে প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিককে আনা হয়েছে। পরপর দু’টি লোকসভা ও শেষ বিধানসভা ভোটে প্রাপ্ত ভোটের নিরিখে এবং এসআইআর-পরবর্তী পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পরিচ্ছন্ন এই বাঙালি মুখে বাজি ধরছে বিজেপি। বনেদি, বিনয়ী উপস্থিতিতে তাকে কাজে লাগাতে চাইছেন স্বপনও।

এই ‘সম্ভাবনা’র ফল পেতে ঢেলে দিচ্ছে দিল্লিও। বিজেপির নেতা-মন্ত্রীরা উড়ে আসছেন তাঁর প্রচারে। রাসবিহারীর উন্নয়নের একটি আলাদা পরিকল্পনা করেছেন বিজেপি প্রার্থীও। কালীঘাট মন্দিরকে ঘিরে ‘মাস্টারপ্ল্যান’ বা যোধপুর পার্ক অঞ্চলের কফি-আড্ডা সংস্কৃতি বা রবীন্দ্র সরোবরের পরিবেশ উন্নয়নের কথাও বলছেন আলাদা করে।

এই কেন্দ্রে কংগ্রেসের তরুণ প্রজন্মের পরিচিত মুখ আশুতোষ চট্টোপাধ্যায় এবং সিপিএম তথা বামফ্রন্টের সমর্থনে প্রার্থী হয়েছেন সিপিআই (এম-এল) লিবারেশনের অধ্যাপক মানস ঘোষ। তবে মেরুকৃত এই লড়াইয়ে প্রচার বা প্রভাবের মাপকাঠিতে তাঁরা দু’জনে খানিকটা পিছিয়ে রয়েছেন। অন্তত এ বারের লড়াইয়েও জয়-পরাজয়ের জন্য স্থানীয় মানুষ প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দলের নামই করছেন।

তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি রাসবিহারীতে এ বার বিজেপির ‘হাওয়া’ গায়ে লাগছে। তবে শুধু ওই অঙ্কেই এখানকার ফল বলা যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থাকছে। লোকসভার ভোটের ফল বিজেপির সম্ভাবনাকে ‘বিশ্বাসযোগ্য’ করলেও বিধানসভার ভোট যে অনেকটাই আলাদা, তা-ও বলছে সেই অঙ্কই। রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের চওড়া রাস্তা ছেড়ে ভিতরে ঢুকলে বিধানসভা ভোটের অন্য অঙ্কও কষতে হবে।

কলকাতা পুরসভা যে ৯টি ওয়ার্ড নিয়ে এই কেন্দ্র, তার প্রতিটি এখন তৃণমূলের দখলে। তৃণমূল প্রার্থী দেবাশিসও এই কেন্দ্র থেকেই নির্বাচিত পুর-প্রতিনিধি। দৈনন্দিন প্রয়োজনের জল, আলোর মতো পুর-পরিষেবার বেশ কিছু প্রয়োজন মিটিয়েই একটি অংশকে ধরে রেখেছে তৃণমূল, তাতে রাসবিহারীর একাংশ খুশি। এখানেও তৃণমূলের শক্তি জোগায় রাজ্য সরকারের ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ বা ‘কন্যাশ্রী’ বা জনতার স্বস্তিমূলক প্রকল্পগুলি। মধ্য ও নিম্নবিত্ত রাসবিহারীর সিংহভাগে তৃণমূল আর এখানকার দীর্ঘদিনের পুর-প্রতিনিধি ও জনপ্রিয় পুজোর কর্তা দেবাশিসের গতি কার্যত আগের মতোই।

এই সূত্রেই বুথে বুথে তৃণমূলের সংগঠনও বেশ জোরদার। আবার এই শক্তিই এখানে তৃণমূলের ‘বোঝা’। পুর-পরিষেবার মতোই বেপরোয়া প্রোমোটার-রাজ আর সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যও এখন মানুষের নিত্যসঙ্গী। তার সঙ্গে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের যোগও মানুষের মুখেমুখে। এবং স্বাভাবিক ভাবেই বিজেপি-সহ তিন বিরোধীর সেই প্রচারের সঙ্গে যোগ হয়েছে দেবাশিসের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্ত। জমি সংক্রান্ত ওই তদন্তের দুই মুখ আছে। বিরোধীরা যেমন তাকে অস্ত্র করছে, আবার তৃণমূল তাকে ঢাল করছে বিজেপির ষড়যন্ত্র বলে।

ফলে, এসআইআর ছাড়াও এ বার এই রকম অনেক যোগ-বিয়োগই করতে হবে রাসবিহারীর ভোটে। তাতে ভো-কাট্টা কে হবেন, বলা কঠিন!

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Rash Behari CPIML TMC BJP

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy