এসআইআর প্রক্রিয়া যখন মধ্যগগনে, তখন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে সওয়াল করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই প্রক্রিয়া যখন প্রায় সায়াহ্নে, তখন কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে চিঠি লিখল তৃণমূল। সেই চিঠিতে একাধিক বিষয় উল্লেখ করেছে শাসকদল। তার মধ্যে অন্যতম, তাদের ১১ জন প্রার্থীকে ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় রেখে দেওয়ার বিষয়ে দ্রুত হস্তক্ষেপের আর্জি।
কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে ইমেলে পাঠানো তিন পাতার চিঠিটি লিখেছেন রাজ্যের মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। চিঠির সঙ্গে ১১টি কেন্দ্রের কোথায় কাকে প্রার্থী করা হয়েছে, তাঁদের এপিক নম্বর-সহ পৃথক একটি তালিকাও যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। সেই তালিকায় রয়েছে উত্তর দিনাজপুরের গোয়ালপোখর, মালদহের মোথাবাড়ি, মুর্শিদাবাদের সমশেরগঞ্জ, লালগোলা, নওদা, কলকাতার শ্যামপুকুর, হুগলির চণ্ডীতলা, উত্তরপাড়া, উত্তর ২৪ পরগনার দেগঙ্গা এবং বীরভূমের হাসন। এর মধ্যে রয়েছেন এক মন্ত্রীও। তিনি শশী পাঁজা। শ্যামপুকুরে তৃণমূলের প্রার্থী হিসাবে এ বারও লড়ছেন শশী।
এর মধ্যে ছ’টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ প্রথম দফায় এবং বাকি পাঁচটি কেন্দ্রে দ্বিতীয় দফায়। প্রথম দফার ভোটের জন্য মনোনয়ন পেশের শেষ দিন ৬ এপ্রিল। দ্বিতীয় দফার ভোটের জন্য মনোনয়ন জমা দেওয়া যাবে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত। যে হেতু সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতিই ‘বিবেচনাধীন’ তালিকা নিষ্পত্তির কাজের তত্ত্বাবধান করছেন, তাই তাঁকেই চিঠিটি লিখেছে তৃণমূল।
শাসকদলের তরফে আরও কয়েকটি আর্জি জানানো হয়েছে হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে। প্রথমত, বিবেচনাধীন তালিকার কত নিষ্পত্তি হচ্ছে, তার দৈনিক তালিকা প্রকাশ করা হোক। এ ব্যাপারে কমিশনকে নির্দেশ দিন প্রধান বিচারপতি। দ্বিতীয়ত, যাঁদের নাম বাদ পড়ছে, কেন তাঁদের নাম বাদ পড়ল, তা জানাক নির্বাচন কমিশন। তৃতীয়ত, যাঁদের নাম বাদ পড়ছে, তাঁদের আবেদন করার প্রক্রিয়া সহজ করা হোক। যাতে ‘ইসিআইএনইটি’ পোর্টালে আবেদন করা যায়, তার সংস্থান করা হোক। বাদ-পড়াদের আবেদন জানানোর প্রক্রিয়ায় বিএলএ-দের যুক্ত করার আর্জিও রয়েছে তৃণমূলের চিঠিতে।
এসআইআর প্রক্রিয়ার গোড়া থেকেই দলের বিএলএ-দের নজরদারির মধ্যে রেখেছিল তৃণমূল। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দফায় দফায় বৈঠক করেছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। শুনানি প্রক্রিয়া চলার শুরুতে কমিশন রাজনৈতিক দলগুলির বিএলএ-দের যুক্ত থাকার অনুমতি দেয়নি। পরে তৃণমূলের মামলাতেই বিএলএ-দের যুক্ত করার নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। এ বার ‘বিবেচনাধীন’ তালিকা থেকে যাঁদের নাম ‘বাদের’ তালিকায় যাবে, তাঁদের আবেদন জানানোর প্রক্রিয়াতেও বিএলএ-দের যুক্ত থাকার অনুমতি দেওয়ার আর্জি জানাল তৃণমূল।
আরও পড়ুন:
শাসকদলের কাছে এখন অন্যতম শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ১১ জন প্রার্থীর নাম ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় থেকে যাওয়া এবং শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তা নিষ্পত্তি না-হওয়া। কারণ, প্রচার শুরু হয়ে গিয়েছে। মনোনয়নের জন্য আইনি নানা প্রক্রিয়া রয়েছে। ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় প্রার্থীদের নাম থাকার বিষয়টির নিষ্পত্তি না-হওয়ায় সেগুলিও থমকে রয়েছে। ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় সব মিলিয়ে নাম রয়েছে ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫ জনের। গত ২৩ মার্চ কমিশন প্রথম দফার তালিকা প্রকাশ করে। কিন্তু তাতে তারা জানায়নি কত জনের নাম বাদ গেল আর কত জনের রইল। আনুষ্ঠানিক ভাবে না জানালেও কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছিল, ২৩ মার্চ পর্যন্ত ৩২ লক্ষ ‘বিবেচনাধীন’ নামের নিষ্পত্তি হয়েছে। কিন্তু তালিকা প্রকাশ কত সংখ্যার ভিত্তিতে, ৩২ লক্ষ না ২৭ লক্ষ, তা নিয়ে শাসকদলের অন্দরে ধন্দ রয়েছে।
২৩ মার্চ সেই তালিকা প্রকাশ হয়েছিল প্রায় মধ্যরাতে। পরের দিন উত্তরবঙ্গ রওনা হওয়ার আগে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘‘কেন মাঝরাতে তালিকা প্রকাশ করা হল? কী এত লুকোনোর আছে? মেঘের আড়াল থেকে খেলছেন কেন? সামনে আসুন!’’ ঘটনাচক্রে, মমতা ওই মন্তব্য করার ঠিক পরের দিনই হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে চিঠিটি লিখেছে তৃণমূল।