E-Paper

‘যারা শাস্তি দিতে পারে না, তারা মুখ লুকোক’

ভোটের বোড়ে? নাকি কয়েকটি সংখ্যা শুধু? রাজ্যে কেমন আছেন মেয়েরা?

সোমা মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১২ মার্চ ২০২৬ ০৭:০৬

—প্রতীকী চিত্র।

“ঝলসানো মুখ। কোঁচকানো হাত। আর অসম্ভব রাগ। এর বাইরে এখন আর আমার কোনও গল্প নেই। দেখা করতে চেয়ে কী লাভ?”

মোবাইলে উপচে পড়েছিল বিরক্তি আর অবিশ্বাস। আর সেটাই আরও বেশি করে তাগিদ তৈরি করেছিল সামনাসামনি পৌঁছনোর।

দক্ষিণ ২৪ পরগনার বহড়ুর বড় রাস্তা থেকে বেশ খানিকটা দূরে, ঝোপঝাড়, বাঁশবন, ডোবা পেরিয়ে যে এক চিলতে ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, সেটা রেহানার (নাম পরিবর্তিত) দাদার বাড়ি। ছোট ছেলেকে নিয়ে সেখানেই থাকেন। ছোট ছেলের বয়স ১০। বড় ছেলে ১৪। আগে লোকের বাড়ি কাজ করে পেট চলত। এখন দাদাদের আশ্রয়ে দু’মুঠো জোটে। দুই ছেলেরই লেখাপড়া বন্ধ। বড় ছেলেকে মেটিয়াবুরুজে কারখানায় কাজে ঢুকিয়েছেন। ছোট ছেলে বাড়ি থেকে বেরোয়ই না। মায়ের মুখের দিকে তাকাতেও আতঙ্ক হয় তার।

অ্যাসিডের ক্ষতে কুঁচকে যাওয়া মুখ। একটা চোখে দৃষ্টি নেই। হাত-পায়ে জোর নেই। কাজ করার ক্ষমতা নেই। ২০২৫-এর মে মাসের এক সন্ধ্যা জীবনটাই বদলে দিয়েছে ৩৫ বছর বয়সি রেহানার। দু’টো বোতল থেকে বার চারেক তাঁর হাত, মুখ, পিঠ লক্ষ্য করে অ্যাসিড ছোড়া হয়। সম্পূর্ণ হয়নি চিকিৎসা। যথাযথ যোগাযোগের অভাবে সরকারি হাসপাতালে ঠিক সময়ে অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করতে পারেননি। এই মুহূর্তে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সহায়তায় বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের পর্ব চলছে। অ্যাসিড হামলার ক্ষতিপূরণ ১০ মাস পরে পৌঁছেছে তাঁর কাছে। তবে তাতে জীবনের ক’টা বছরের অন্ন সংস্থান হবে, জানেন না।

অ্যাসিড হামলার ক্ষতিপূরণ বাবদ মোটা অঙ্কের অর্থ ঘটনার পরই, বড় জোর ১৫ দিনের মধ্যে দেওয়ার কথা। বাকি টাকা পরবর্তী স্তরে যত দ্রুত সম্ভব দেওয়াই নিয়ম। আঘাতের পরিমাণ, অক্ষমতা, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার বিচারে এই ক্ষতিপূরণের অঙ্ক বাড়ে। পুলিশের মাধ্যমে আবেদন করে স্টেট লিগ্যাল সার্ভিস অথরিটি বা জেলা লিগ্যাল সার্ভিস অথরিটির কাছ থেকে এই ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা। পাওয়ার কথা নিখরচায় আইনি সহায়তাও। অভিযোগ, বহু ক্ষেত্রেই পুলিশ সহায়তা তো করেই না, উল্টে আপস করার জন্য চাপ দেয়। রেহানা যেমন জানিয়েছেন, অপরাধী থাকে তাঁর বাড়ি থেকে মিনিট পাঁচেকের দূরত্বে লস্কর পাড়ায়। সে ঘুরে বেড়াচ্ছে বহাল তবিয়তে। এমনকি তাঁকে ফোন করে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য হুমকিও দিচ্ছে।

বিবাহবিচ্ছিন্না, দুই সন্তানের মা রেহানাকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ওই ব্যক্তি। এ-ও জানিয়েছিল, তার পরিবার এই সম্পর্ক মানবে না। তাই রেহানা যদি কয়েক লক্ষ টাকা ধার করতে পারেন, সেই টাকায় শুরু হতে পারে নতুন সংসার। স্বনির্ভর গোষ্ঠী থেকে ঋণ নিয়েছিলেন রেহানা। ঋণ নিয়েছিলেন বোন, প্রতিবেশীদের কাছ থেকে। টাকা তুলে দিয়েছিলেন লোকটির হাতে। কিন্তু সেই টাকা আত্মসাৎ করে অন্য জায়গায় বিয়ে করে সে। আর সেই টাকা ফেরত চাওয়া থেকেই গোলমালের শুরু।

রেহানা জানিয়েছেন, গত বছর মে মাসের এক সন্ধ্যায় ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। বাড়ির পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল লোকটি। রেহানা ফের টাকার কথা বলায়, হাতের বোতল থেকে অ্যাসিড ছুড়ে দিয়ে সে বলে, ‘এই নে তোর টাকা।’ রেহানা বলেন, ‘‘ওর দু’টো হাতে বোতল ছিল। বার চারেক আমাকে লক্ষ্য করে অ্যাসিড ছুড়েছিল। প্রথম বার নাক আর চোখে এমন ভাবে ঢুকে যায় যে কয়েক সেকেন্ড চেঁচাতেও পারিনি। দ্বিতীয় বার আমার পিঠ আর কানে ছোড়ে। তখন আমিচিৎকার করে উঠলে আশপাশের লোকেরা ছুটে আসে।’’

সে দিন যাঁরা রেহানাকে রাস্তা থেকে তুলে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন, সেই প্রতিবেশীরাও নিয়মিত দেখেন অপরাধী ঘুরে বেড়াচ্ছে। হুমকি দিচ্ছে। “ভোটের আগে নেতারা কত প্রচার করেন, কিন্তু এই মেয়েদের জন্য সুবিচারের কথা কখনও কারও মুখে শোনা গিয়েছে?”— প্রশ্ন প্রতিবেশী বৃদ্ধের।

২০২৩ সালের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর তথ্য, দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অ্যাসিড হামলার ঘটনা পশ্চিমবঙ্গে। ২০২৩ সালে দেশে ২০৭টি অ্যাসিড হামলার ঘটনা ঘটে। তার মধ্যে ৫৭টি এ রাজ্যে।

নিয়ম অনুযায়ী লাইসেন্স ছাড়া কোনও দোকানে অ্যাসিড বিক্রি হওয়ার কথা নয়। আর লাইসেন্স থাকলেও কাকে, কতটা বিক্রি করা হচ্ছে, তার যাবতীয় তথ্য পুলিশের কাছে থাকার কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, কার্যত অ্যাসিড বিক্রির কোনও তথ্য পুলিশের কাছে থাকে না। তাই শৌচাগার পরিষ্কারের অ্যাসিডই শুধু নয়, সোনা গলানোর অ্যাসিডও অবাধে ঘুরছে অনেকের হাতে।

নিজে অ্যাসিড হামলার শিকার এবং বর্তমানে অ্যাসিড আক্রান্তদের নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মী মনীষা পৈলান বলেন, “অন্য অনেক রাজ্য এ ক্ষেত্রে এগিয়ে গিয়েছে। হিমাচল প্রদেশে এক জন সারভাইভার ৩৮ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। পঞ্জাবে পেনশনের ব্যবস্থা আছে। দিল্লিতে চাকরির বিষয়টাও বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়।” মূল প্রতিবন্ধকতা কোথায়? “আইনি লড়াই। অপরাধীর শাস্তি না হওয়া। পুলিশের সহযোগিতা না পাওয়া। অ্যাসিড আক্রমণ সম্পর্কে রাজ্যের কোনও ব্যবস্থা না থাকা। ক্ষতিপূরণ না পাওয়া। অ্যাসিড আক্রান্তকে মূল স্রোতে ফেরাতে কাজের ব্যবস্থা না করা। তবে আইনি লড়াইটাই আসল। আমার লড়াই ১১ বছর ধরে চলছে। কিন্তু অপরাধী এখনও আমার চোখের সামনে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দোষীর শাস্তি হলে অ্যাসিড আক্রান্তের জীবন অনেকটা সহনীয় হতে পারে।”

যাদবপুর থানা এলাকার বিদ্যাসাগরের বাসিন্দা দেবশ্রীর (নাম পরিবর্তিত) অ্যাসিড হামলায় অভিযুক্ত তাঁর স্বামী ও স্বামীর বন্ধু। মোবাইলে গোপনে মেয়েদের ছবি তুলে ব্ল্যাকমেল করায় বাধা দিয়েছিলেন তিনি। তাই তাঁকে লক্ষ্য করে অ্যাসিড ছোড়া হয়। গত বছর মার্চের ঘটনা। অভিযুক্তেরা জামিনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মামলা তুলে না নিলে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। মোটা টাকার প্রলোভনও আসছে। দেবশ্রী বললেন, “এর শেষ দেখে ছাড়ব। অপরাধীরা শাস্তি না পাওয়া পর্যন্ত লড়াই বন্ধ হবে না।” তাঁর একটি হাত অকেজো। কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। এই ঘটনার পরে চাকরিও গিয়েছে। সদ্য ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। তাতে ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্ক যায়নি।

সংগঠনগত ভাবে এই দুই তরুণীর বিচার আদায়ের লড়াইয়ে পাশে রয়েছেন মনীষা। তাঁর মতো এই দুই তরুণীও দৃপ্ত তাঁদের সিদ্ধান্তে। ক্ষতচিহ্ন আড়াল করতে মুখ ঢাকেন না তাঁরা। মনীষা বলেছেন, “আমি কখনও মুখ ঢাকার কথা ভাবিইনি। আমার শরীরের ওই ক্ষতচিহ্নই আমার প্রতিবাদ।” একই কথা বলেছেন রেহানা, দেবশ্রীরাও। রেহানার কথায়, “মুখ লুকোনোর মতো কোনও কাজ তো আমি করিনি। যে এই কাজ করেছে, সে মুখ লুকিয়ে থাকবে। মুখ লুকোনোর কথা তাদের, যারা ওই অপরাধীর শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারেনি।” আর দেবশ্রী বলেছেন, “এই ক্ষত প্রতি মুহূর্তে সকলকে মনে করাবে, আমার সঙ্গে কী কী অন্যায় হয়েছে। এই ক্ষত মনে করাবে, আমি এখনও সুবিচার পাইনি।”

প্রশাসনের কানে কি এই কথা পৌঁছবে? এসআইআরের নামে মেয়েদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে বার বার অভিযোগ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্যের অ্যাসিড আক্রান্ত মহিলাদের প্রশ্ন, তাঁদের অধিকারের কথা কেন সরকারের মনে পড়ে না? কেন অপরাধীরা নির্ভয়ে ঘুরে বেড়ায়?

(চলবে)

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Women Harassment Acid Attack

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy