এসআইআর, পরিষেবা ও ভাবমূর্তির অঙ্কে ভোট

এসআইআর-পর্বের আগে বালিগঞ্জে ভোটার ছিলেন ২ লক্ষ ৫৫ হাজার ১৯০ জন। এসআইআর-এ নাম বাদ এবং নাম সংযুক্তির পরে মনোনয়নের শেষ দিন পর্যন্ত মোট ভোটার হয়েছে ১ লক্ষ ৮৮ হাজার ৮৩৯। অর্থাৎ কমেছে, ৬৬ হাজার ৩৫১ জন।

অর্ঘ্য বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৬:৪৮

—প্রতীকী চিত্র।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘আমাদের ছেলেবেলায় গোটা দক্ষিণ কলকাতারই ডাক নাম ছিল বালিগঞ্জ।... বালিগঞ্জ শুনলেই মনে হত যেন উদ্যানময়, অতিপরিচ্ছন্ন এক সুদৃশ্য এলাকা...।’ সময় বদলেছে। কলকাতা পুরসভার ৬০, ৬১, ৬৪, ৬৫, ৬৮, ৬৯, ৮৫ ওয়ার্ড নিয়ে তৈরি বালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের একাংশে রয়েছে সাজানো বহুতল, আবার অদূরেই আছে কাঁকুলিয়া, বেনিয়াপুকুর, পেয়ারাবাগান-সহ নানা জায়গার বিস্তীর্ণ বস্তি এলাকা। এ বারের ভোটে বালিগঞ্জে মূলত তিনটি বিষয় কাজ করছে বলে মনে করছেন অনেকেই— এসআইআর-পর্বের অভিঘাত, নাগরিক পরিষেবা ‘না-পাওয়া’ এবং অতীতে থাকা বিধায়কের ভাবমূর্তি।

এসআইআর-পর্বের আগে বালিগঞ্জে ভোটার ছিলেন ২ লক্ষ ৫৫ হাজার ১৯০ জন। এসআইআর-এ নাম বাদ এবং নাম সংযুক্তির পরে মনোনয়নের শেষ দিন পর্যন্ত মোট ভোটার হয়েছে ১ লক্ষ ৮৮ হাজার ৮৩৯। অর্থাৎ কমেছে, ৬৬ হাজার ৩৫১ জন। ধর্মীয় জনবিন্যাসের নিরিখে, বালিগঞ্জে প্রায় ৬৪% সংখ্যালঘু মানুষ। এই পরিসরে দাঁড়িয়ে আইনের ছাত্রী, নতুন ভোটার ইয়াশফিন নাবিহা বলছেন, “এসআইআর-এ এত মানুষের নাম বাদ গিয়েছে। আবার, দুর্নীতিও প্রবল। কর্মসংস্থান, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ। চার দিকে হিন্দু-মুসলমানের রাজনীতি। কিন্তু বিকল্প কোথায়?”

এসআইআর-এর হিসাব মাথায় রাখছেন ১৯৯১ থেকে বিভিন্ন জায়গায় বিধানসভা ও উপনির্বাচনে ৯ বার জেতা, এ বারে বালিগঞ্জে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ও। প্রচারের মাঝেই তাই বলছেন, “নির্বাচন কমিশন একটি দলের হয়ে পক্ষপাতিত্ব করেছে। এত মানুষের ভোটাধিকার চলে গিয়েছে। মানুষ হেনস্থার জবাব দেবেন।” বক্সিংয়ের পাশাপাশি পর্বতারোহণেও দড় শোভনদেব। ছয়ের দশকে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন খোদ তেনজিং নোরগের কাছে। নির্বাচনী রাজনীতির ‘বেস ক্যাম্প’ বারুইপুর, রাসবিহারী, ভবানীপুর, খড়দহে সফল ভাবে পৌঁছে গিয়ে এ বার তিনি বালিগঞ্জে। বার বার কেন্দ্র বদল নিয়ে অশীতিপর শোভনদেবের বক্তব্য, “দলের নির্দেশ সবাইকে মানতে হবে।”

শোভনদেবের ঘরে বইপত্রের মধ্যে উঁকি দেয় লিয়ো টলস্টয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ থেকে শ্রীপান্থের ‘কলকাতা’।— এই কলকাতারই অন্যতম প্রাণকেন্দ্র বালিগঞ্জে রাজনৈতিক শিবিরের একাংশের মত, গত উপনির্বাচনে বামেদের এখানে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসার অন্যতম নেপথ্য কারণ, বিজেপি থেকে তৃণমূলে আসা বাবুল সুপ্রিয়কে (বিদায়ী বিধায়ক) নিয়ে সংখ্যালঘু জনতার একাংশের ‘অসন্তোষ’। বিদায়ী বিধায়ককে এলাকায় সেই ভাবে পাওয়াও যায়নি বলে অভিযোগ অনেকের। তবে ‘ভিন্ন সুর’কে আমল না-দিয়ে নিজের ‘স্বচ্ছ ভাবমূর্তি’কেই যেন বাজি ধরছেন শোভনদেব। বলছেন, “মানুষ আমার অতীত ও বর্তমান দেখেই ভোট দেবেন।মানুষ আমাকে ভালবাসেন। জনতা বলছেন, ‘সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের পরে আমরা এক জন ভাল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে বালিগঞ্জে পাচ্ছি’। এখানে কোনও প্রতিপক্ষ নেই।” ছাত্রাবস্থায় শোভনদেব তাঁর প্রিয় কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যকে নিয়ে লিখেছিলেন, ‘তোমার লেখায় বিদ্রোহী মনে/ বন্ধ কপাটে করাঘাত হানে।’

সুকান্তের রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম উত্তরাধিকারী যাঁরা, তাঁদের এক জন সিপিএমের প্রার্থী, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এডুকেশন বিষয়ের গবেষক আফরীন বেগম (শিল্পী)। পাম অ্যাভিনিউয়ে, সুকান্তের ভ্রাতুষ্পুত্র প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বাড়ি থেকে ব্রাইট স্ট্রিটে গৃহ-সংযোগ, ফার্ন রোডে চায়ের আড্ডা, ঘুঘুডাঙা বাজারে ঢুঁ থেকে কড়েয়া আবাসনের সামনে অটো-প্রচার— বেকবাগানের আফরীন ঘুরছেন। বলছেন, “এসআইআর-এ বেছে বেছে মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী লোক দেখানো ধর্না দিয়েছিলেন। ওয়াকফ নিয়েও ওঁর দ্বিচারিতা সামনে এসেছে। এই দুইয়ের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই। গণতন্ত্রটাই যেন বিচারাধীন।” সিপিএম স্লোগান তুলেছে, ‘জনতার দরবারে, আফরীন ঘরে ঘরে’। ঘর, অর্থাৎ বালিগঞ্জের ‘সমস্যা’ আফরীনের প্রচারের বড় বিষয়। ওয়ার্ড-ভিত্তিক না-পাওয়া এবং প্রতিশ্রুতির লিখিত ইস্তাহার দিচ্ছে সিপিএম। পরিবেশ ও প্রবীণদের জন্য বিশেষ দল তৈরি, নিকাশি ও বস্তি এলাকায় পানীয় জল সংক্রান্ত নানা সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে তারা। কিন্তু বালিগঞ্জের মতো জায়গায় তৃণমূলের অত্যন্ত মজবুত সংগঠনের মধ্যে ভোটের দিন পুরো বিষয়টা কতটা ‘নিয়ন্ত্রণে’ রাখতে পারবে সিপিএম, তা নিয়ে সংশয়ে ভোটারদের অনেকেই।

পেশায় দর্জি, ১০ ফুট বাই ১০ ফুটের ঘরে থাকা এক জনের কথাতেও এল ঘরের সমস্যা। বললেন, “জল থেকে শৌচাগার— বেঁচে থাকার জন্যই রোজ লড়তে হয়।” কিন্তু পাশ থেকে এক মহিলা অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে জানালেন, ‘বেঁচে থাকতে’ ‘লক্ষ্মীর ভান্ডারে’র টাকা খুবই কাজে আসে। তবে মধ্যবিত্ত পরিবারের তনুশ্রী ভট্টাচার্য বলছেন, “জল জমা-সহ বিভিন্ন নাগরিক সমস্যা প্রবল। বিভাজনের রাজনীতিও সমর্থনযোগ্য নয়।” এমন আবহে, আফরীনের অন্যতম প্রিয় বই, শঙ্খ ঘোষের একটি বক্তৃতা, ‘অন্ধের স্পর্শের মতো’র শেষ বক্তব্যটি মনে পড়তে পারে: ‘...সব সময়েই খুঁজে যেতে হয় শব্দের সেই অভ্যন্তরীণ স্পর্শ।’

শব্দ অর্থাৎ ভাষ্যের নির্মাণে বিজেপি নাগরিক পরিষেবার খোলনলচে বদলে দেওয়া, মহিলাদের জন্য মাসে তিন হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতির কথা এখানে যেন বেশি করে বলছে। এলাকার ধর্মীয় জনবিন্যাসের কারণেই কি? বিজেপি প্রার্থী, বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বৈদিক ও পরবর্তী বৈদিক যুগে নারীর অবস্থা নিয়ে গবেষণা করা শতরূপা অবশ্য বলছেন, “আমি গর্বিত হিন্দু। হিন্দুত্ব শেখায়, ‘সবার সঙ্গে সবার বিকাশ।’ বালিগঞ্জের মানুষ যদি খোঁজ নেন জানতে পারবেন, পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে মুসলিমরা রুটি-রুজি, নাগরিক জীবনের প্রশ্নে কতটা বেশি ভাল আছেন।” বস্তির অলিগলি থেকে ধোবিঘাট, বহুতল আবাসনে পৌঁছে যাওয়া শতরূপার সংযোজন, “এলাকায় জল জমে থাকে দু’দিন ধরে। বস্তিগুলিতে পানীয় জল, শৌচাগারের বিপুল সমস্যা। আমাদের লক্ষ্য নগর-পুনরুজ্জীবন।” ১৯৮৬ থেকে বিজেপির সদস্য, বনেদি ব্যবসায়ী বাড়ির মেয়ে শতরূপা ২০১১-তেও এখানে লড়েছিলেন। এ বার ‘অন্য রকম লড়াই’ হবে বলে আশাবাদী তিনি। ২৯১টি বুথে এজেন্টও থাকবে বলে বিজেপি সূত্রে জানা যাচ্ছে। এসআইআর-প্রশ্নে শতরূপার বক্তব্য, “যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে, তাঁরা মৃত বা স্থানান্তরিত ভোটার। বালিগঞ্জের মুসলিমরা এখানকারই। তাঁরা পাকিস্তান বা বাংলাদেশের নন। তৃণমূলের চিন্তা, ছাপ্পা দেওয়া যাবে না।” শতরূপার প্রিয় বই ‘মহাভারত’, সময়ে সময়ে যার অর্থ বদলায়তাঁর কাছে।

নির্বাচনী ‘অর্থ’ বদলের আশায় কংগ্রেস প্রার্থী রোহন মিত্রও। বালিগঞ্জে সোমেন মিত্রের ছেলে— এই পরিচয় অন্তত পুরনো কংগ্রেসি পরিবারগুলির কাছে রোহনকে ‘আলাদা’ মাত্রা দিচ্ছে। তবে দৃশ্যত কংগ্রেসের সংগঠনের হাল নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বালিগঞ্জে প্রার্থী বদল চেয়ে প্রদেশ দফতর বিধান ভবনে বিক্ষোভ হয়েছিল। তবে তাতে আমল না-দিয়ে ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী রোহন বলছেন, “তৃণমূলের বিদায়ী বিধায়ককে এখানে দেখা যায়নি। রাস্তা, জল, নিকাশি, সব কিছুই বেহাল। আর এসআইআর নিয়ে মানুষ জানেনই না ট্রাইবুনালটাহচ্ছে কোথায়!”

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Ballygunge SIR

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy