তারকাতন্ত্র না শঠ চাণক‍্য-নীতি, ভোট ময়দানে কে হাসবে শেষ হাসি

তিনি সোহম চক্রবর্তী, আবার টালিগঞ্জের বিট্টুও। ইন্ডাস্ট্রিতে দেব বা জিৎ না হলেও, সোহমেরও সুপার-ডুপার হিট কিছু আছে। কিন্তু ‘বোঝে না সে বোঝে না’-র নুর, ‘প্রেম আমার’-এর রবি বা সত‍্যজিৎ রায়ের ‘শাখা প্রশাখা’র শিশু চরিত্রটি নয়!

ঋজু বসু

শেষ আপডেট: ২০ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৪৮
করিমপুরে ভোটের প্রচারে তৃণমূল প্রার্থী সোহম চট্টোপাধ্যায়।

করিমপুরে ভোটের প্রচারে তৃণমূল প্রার্থী সোহম চট্টোপাধ্যায়। — নিজস্ব চিত্র।

নিছক তারকা নন। সব অবস্থায় যখন যেমন, নেত্রীর দরকারে পাশে আছেন তিনি। বরাবরই। আবার টালিগঞ্জের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির নায়ক হয়েও, প্রায় চার দশক আগের এক কচি গলার শিশুকে সঙ্গে নিয়ে চলছেন।

তিনি সোহম চক্রবর্তী, আবার টালিগঞ্জের বিট্টুও। ইন্ডাস্ট্রিতে দেব বা জিৎ না হলেও, সোহমেরও সুপার-ডুপার হিট কিছু আছে। কিন্তু ‘বোঝে না সে বোঝে না’-র নুর, ‘প্রেম আমার’-এর রবি বা সত‍্যজিৎ রায়ের ‘শাখা প্রশাখা’র শিশু চরিত্রটি নয়! দিদির সৈনিক হলেও ভোটপ্রার্থীর পরিচয়পত্র সোহমের অঞ্জন জেঠু (চৌধুরী) লিখে দিয়েছেন। ‘ছোট বৌ’-এর বিখ‍্যাত দৃশ‍্যে সোহমের ‘চেটে চেটে খাব’ ডায়ালগ গ্রামবাংলার কেন্দ্রে মুখে মুখে ঘুরছে।

নদিয়ার মুর্শিদাবাদ ঘেঁষা করিমপুর কেন্দ্রে শিকারপুর পঞ্চায়েতের কেচুয়াডাঙা গ্রামের ঘোষপাড়ায় এসেও সেই দাপট স্পষ্ট। বিজেপি প্রার্থী সমরেন্দ্রনাথ ঘোষের বাড়ি। বিকেলের চায়ের সঙ্গে টায়ের প্লেট এগিয়ে প্রার্থী চোখ টেপেন, “হরলিক্স বিস্কুট, নেবেন তো”?

স্বাধীনতার প্রায় ৮০ বছর বাদেও রেলরাস্তাহীন করিমপুর, কৃষ্ণনগর থেকে মাত্র ৮০ কিলোমিটার দূরেও সরু রাস্তায় বাসে সাড়ে তিনঘণ্টা দূরের দুয়োরানি কেন্দ্রে ফিল্মি তারকা নেমে এসেছেন। ভোটযুদ্ধের স্থানীয় ছেঁচকি-ঘণ্টয় তাঁরউপস্থিতিই ফোড়নের ঝাঁঝ আনছে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক, প্রতিস্পর্ধী সমরেন্দ্রকে তাই বলতে হচ্ছে, ‘‘আমিও আমাদের মা সিদ্ধেশ্বরী নাট‍্য সংস্থায় অ‍্যামেচার যাত্রা চালিয়ে যাচ্ছি। এখন হিরো না-করলেও সৎ শিক্ষক, একটু বড়দা গোছের পার্ট করি। জননী আজও জ্বলছে-রযুধিষ্ঠির, নট্ট কোম্পানির দেবী সুলতানা-র ধূর্জটিমঙ্গল, ভৈরব গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি পয়সা-র শুভঙ্কর। এটাও গ্রামীণ সংস্কৃতি বাঁচানোর যুদ্ধ।’’

সোহম অবশ‍্য ভোটের সঙ্গে অভিনয় জীবন মেলাতে চান না। নেত্রীর নির্দেশে এককথায়গত তিনটি বিধানসভা ভোটে তিন জেলায় নোঙর করেছেন। বাঁকুড়ায় কয়েকশো ভোটে হারের পরে পূর্ব মেদিনীপুরের চণ্ডীপুরে আরামে জিতেও স্থানীয় নেতৃত্বের চাপে ফের ঠাঁইনাড়া। এ বার নদিয়ার নতুন কেন্দ্রে এসেও হাসিমুখে বলছেন, ‘‘আমি তো দিদির সঙ্গে সেই বামআমল থেকে আছি! দিদির একার লড়াইটা বরাবর টানত! এ বার টিকিট না পেলেও দিদির উপরে ভরসা চিড় খেত না!” সেই প্রাক্-সোহম মাস্টার বিট্টুর যুগে সুভাষজেঠুর(সুভাষ চক্রবর্তী) অঢেল ভালবাসাও সোহম পেয়েছেন। এখনও রমলাজেঠির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার কথা বলেন। কিন্তু সোহমের দাবি, “সুভাষজেঠুকে শ্রদ্ধা করলেও সিপিএম দলটাকে ভাল লাগেনি। ভবিষ্যতেও তৃণমূল ছাড়া অন‍্য দলে ঝোঁকার প্রশ্ন নেই।”

‘দল যা বলবে, করব’ ভাবমূর্তি সোহমের ইউএসপি হিসেবে মেলে ধরার উল্টো পিঠেও দলবদলু প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে ফারাকটা স্পষ্ট। বিজেপির সমরেন্দ্রনাথঘোষই পরিবর্তনের বছরে করিমপুর থেকে জয়ী সিপিএম বিধায়ক। ২০১৬-য় ফের সিপিএম, ২০২১-এ বিজেপির টিকিটে দাঁড়িয়ে হেরেছেন।এ বারের সিপিএম প্রার্থী (তিনিও স্কুলের প্রধান শিক্ষক) প্রভাস মজুমদার বলছেন, “এটা দুঃখের, একদা বামপন্থী হয়েও সমরেন্দ্র হিন্দু এলাকা আর মুসলিম এলাকায় দু’রকম কথা বলে ভোট চাইছেন!” মুর্শিদাবাদলোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত করিমপুরে এক বছর আগে পাশের জেলার পিতা-পুত্র হরগোবিন্দ-চন্দন দাসের ঘটনার ছাপও রয়েছে। তা কাজে লাগিয়ে বিভাজন-তাস এ ভোটের একটি প্রধান অস্ত্র। সমর ঘোষ আকর্ণহাসছেন, “হিন্দু এলাকায় বলছি তো হিন্দু-হিন্দু ভাই ভাই, এ ছাড়া আর উপায় নাই’, মুসলিম এলাকায় গেলেই আবার ‘একই বৃন্তে দু’টি কুসুম’ করতে হচ্ছে। এটা দ্বিচারিতা নয়। চাণক‍্য নীতি।”

তৃণমূলকেও বাংলার সম্প্রীতির ঐতিহ্য অটুট রাখার কথা বার বার বলে এসআইআর-এ বাদ পড়া ভোটারের ক্ষতে মলম দিতে হচ্ছে। ৩০ শতাংশের বেশি সংখ‍্যালঘু ভোটারের কেন্দ্রে বিভাজন বা মেরুকরণ একটা ফ‍্যাক্টর বুঝে সোহম বলছেন, “গোটা এলাকা এক বার কভার করে অবশ‍্যই হিন্দু প্রধান করিমপুর ১ ব্লকের কয়েকটি অংশে বাড়তি জোর দেব।” সোহমের পথে কাঁটা একটি নয়। গত বারের জয়ী বিধায়ক বিমলেন্দু সিংহরায় টিকিট না-পাওয়ায় দলে অস্বস্তি। সোহম পূর্ববর্তী বিধায়কের কাছে আত্মসমর্পণ করে তাঁকে প্রচারে নিয়ে যাচ্ছেন। কংগ্রেস প্রার্থী পূজা রায়চৌধুরীও মহিলা কংগ্রেসের ন‍্যাশনাল কো-অর্ডিনেটর টিমের সদস‍্য, ‘ভারত জোড়ো’ যাত্রায় রাহুল গান্ধীর কোর টিমের এক জন। গান্ধী পরিবার-যোগ ছাড়াও বিবাহসূত্রে নিজেকে চাকদহের কন‍্যা বলে মেলে ধরছেন পূজা। তিনিও অঘটন ঘটানোর দাবিতে সরব।

কংগ্রেসের হাত চিহ্ন একটা ‘ছোঁয়াচে রোগ’ বলে মেনে নেন স্থানীয় তৃণমূল নেতারাও। তাঁরা বামের ভোট বামে থাকার আশায় বুক বাঁধছেন। সংখ্যালঘু ভোটে ভাগ বসাতে হুমায়ুন কবীরের জনতা উন্নয়ন পার্টিও প্রার্থী দিয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী হোগলবেড়িয়া অঞ্চল শুধু বিজেপির দখলে। বিধানসভা এলাকার ১৪টি পঞ্চায়েতের বাকি ১৩টিই তৃণমূলের। লোকসভা, বিধানসভা সব ভোটে এগিয়েও চাপা ভয় বহাল তৃণমূল শিবিরে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সভা করে নানা আশ্বাস দিয়েছেন। বেহাল স্বাস্থ্য, রাস্তা, পরিবহণ, চাষের পেঁয়াজ-রসুন সংরক্ষণ থেকে স্থানীয় দুর্নীতির অভিযোগে ভোটারদের একাংশ তবু বেসুরে বাজছেন।

তারকা নিয়ে ভোটে লড়ার সুবিধার মতো তাঁর বহিরাগত তকমা মোছাও বড় মাথাব‍্যথা। মমতারতারকা-প্রার্থী মরিয়া ঠিকই। তবে, সবটাই ‘চেটে চেটে খাওয়ার’ মতো সহজপাচ্য হবে কিনা, দলের অন্দরেই সেই সংশয় রয়েছে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Soham Chakrabarty TMC Karimpur

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy