টানা তিন বছর কোমায়, বহু চেষ্টার পরেও চোখ মেললেন না রাজকুমারী বজ্রকিটিয়াভা! রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকার যাবে কার হাতে?
তাইল্যান্ডের রাজা মহা ভাজিরালংকর্ণের জ্যেষ্ঠ কন্যা বজ্রকিতিয়াভা। রাজকুমারী হওয়ার পাশাপাশি আইনজীবী, কূটনীতিক এবং রাজপরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নির্ণায়কদের মধ্যে একজন ছিলেন তিনি। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে কুকুরদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে কোমায় চলে যান রাজকুমারী।
কাজ করল না কোনও সোনার কাঠি। ঘুম ভাঙল না রাজকুমারীর। প্রয়াত হলেন তাইল্যান্ডের রাজকুমারী বজ্রকিতিয়াভা। টানা তিন বছরের বেশি কোমায় থাকার পর এ বার চিরঘুমের দেশে পা়ড়ি দিলেন রাজকুমারী। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৪৭ বছর। তাইল্যান্ডে ‘রাজকুমারী ভা’ নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন এই রাজকন্যা।
২০২২ সালের ডিসেম্বরে কুকুরদের হাঁটানোর সময় আচমকা অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা জানান, তিনি কোমায় চলে গিয়েছেন। তার পর থেকে হাসপাতালেই রাখা হয়েছিল তাঁকে। তবে তাঁর অসুস্থতার পর থেকে আর এ বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।
তাইল্যান্ডের রাজা মহা ভাজিরালংকর্ণের জ্যেষ্ঠ কন্যা বজ্রকিতিয়াভা। রাজকুমারী হওয়ার পাশাপাশি আইনজীবী, কূটনীতিক এবং রাজপরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নির্ণায়কদের মধ্যে একজন ছিলেন। তাই রাজপরিবারের উত্তরাধিকারী হিসাবে বজ্রকিতিয়াভার সিংহাসনে বসার দাবি সর্বাগ্রে ছিল। তাঁর মৃত্যু তাই রাজার উত্তরাধিকারের বিষয়টি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৭২ বছর বয়সি তাইল্যান্ডের রাজা মহা বাজিরালংকর্ণই বর্তমানে বিশ্বের ‘সবচেয়ে ধনী’ রাজা। ৭২ বছর বয়সি তাইল্যান্ডের রাজা মহা বাজিরালংকর্ণ। জন্ম ১৯৫২ সালের ২৮ জুলাই। বাবা রাজা ভূমিবল আদুলিয়াদেজের মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেন তিনি। ১৯৭৭ সালে বাজিরালংকর্ণ বিয়ে করেন তাঁর আত্মীয়া সোওয়ামসায়ালি কিতিয়াকারাকে। সে বছরেই জন্ম হয় তাঁদের একমাত্র মেয়ে বজ্রকিতিয়াভার। সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী হিসাবে রাজকুমারী বজ্রকিতিয়াভার নাম উঠে এসেছিল স্বাভাবিক ভাবেই।
রাজকুমারীর পুরো নাম বজ্রকিতিয়াভা নরেন্দির দেব্যাবতী। তাইল্যান্ডের আইন অনুযায়ী মহিলা উত্তরাধিকারীদের সিংহাসনে বসার অধিকার নেই। তবে রাজকুমারী কোমায় যাওয়ার আগে জল্পনা শুরু হয়েছিল, তাইল্যান্ডের রাজপরিবারের সেই নিয়মে বদল আসতে পারে। সিংহাসনে বসতে পারেন বজ্রকিতিয়াভা। সেই সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেল তাই রাজপরিবারে।
আরও পড়ুন:
১৯৭৮ সালের ৭ ডিসেম্বর ব্যাঙ্ককে জন্ম বজ্রকিতিয়াভার। রাজকুমারীর পড়াশোনা ইংল্যান্ডের নামকরা হিথফিল্ড স্কুল থেকে। পরে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দু’টি স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের আগে আইন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে ডিগ্রি লাভ করেছিলেন তাই রাজকুমারী।
দেশে ‘আইনজীবী রাজকুমারী’ হিসাবেই পরিচিত ছিলেন বজ্রকিতিয়াভা। প্রথাগত রাজকীয় দায়িত্বের বাইরেও আইন নিয়ে নিজস্ব কর্মজীবনও গড়ে তুলেছিলেন তিনি। তাইল্যান্ডের অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের দায়িত্বভার নিয়েছিলেন। অন্য দিকে, অস্ট্রিয়ায় তাইল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন বেশ কিছু দিন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
২০২২ সালের ডিসেম্বরে উত্তর-পূর্ব থাইল্যান্ডের নাখন রাচাসিমা প্রদেশে কুকুরদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন রাজকুমারীর। সেই থেকেই শুরু। স্বাস্থ্যসঙ্কট কাটিয়ে উঠতে পারেননি তিনি। পরবর্তী কালে রাজপ্রাসাদ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, তিনি হৃদ্রোগজনিত গুরুতর অসুস্থতায় ভুগছিলেন। ফলে জ্ঞান হারান।
প্রাথমিক ভাবে প্রাণ বেঁচে গেলেও, তার অবস্থা সঙ্কটজনকই রয়ে যায়। কোমা থেকে বেঁচে ওঠার কোনও লক্ষণই দেখা যায়নি বজ্রকিতিয়াভার দেহে। পুরোপুরি জ্ঞান ফিরে পাননি তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে পেটের সংক্রমণ, হৃদ্যন্ত্রের অনিয়মিত স্পন্দন এবং রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা-সহ বিভিন্ন জটিলতার কারণে তাঁর স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটেছিল বলে রাজপরিবার সূত্রে খবর।
আরও পড়ুন:
রাজপরিবার ঘোষণা করেছে যে, রাজকুমারীর মরদেহ ব্যাঙ্ককের গ্র্যান্ড প্যালেসে শায়িত থাকবে। সর্বোচ্চ রাজকীয় মর্যাদায় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। তাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল তাঁকে ‘তাইল্যান্ডের গর্ব’ হিসাবে বর্ণনা করেছেন। ন্যায়বিচার, সমতা ও জনসেবার প্রতি রাজকুমারীর আজীবন অঙ্গীকারের প্রশংসা করেছেন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও।
তাইল্যান্ডের রাজা বাজিরালংকর্ণের সন্তানদের মধ্যে রাজকুমারীই ছিলেন তাঁর অত্যন্ত কাছের। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার এক বছর আগে বজ্রকিতিয়াভাকে তাঁর বাবার দেহরক্ষী বাহিনীতে একটি উচ্চ পদে নিযুক্ত করা হয়েছিল।
৭৩ বছর বয়সি রাজার চারটি বিয়ে থেকে সাত সন্তান রয়েছে। যদিও তিনি তাঁর মনোনীত উত্তরাধিকারীর নাম ঘোষণা করেননি, তবে উত্তরাধিকারের নিয়ম অনুযায়ী পুরুষরাই এগিয়ে থাকেন।
আত্মীয়া সোওয়ামসায়ালিকে বিয়ে করার পর সত্তরের দশকের মাঝামাঝি তৎকালীন যুবরাজ বাজিরালংকর্ণ লিভ ইন শুরু করেন অভিনেত্রী যুবধিদা পলপ্রাসার্থের সঙ্গে। দীর্ঘ দিন স্বামী বাজিরালংকর্ণকে ডিভোর্স দেননি স্ত্রী কিতিয়াকারা। তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয় ১৯৯৩ সালে। যুবধিদা ও রাজার চার ছেলে এবং এক মেয়ে। ১৯৯৪ সালে যুবধিদা পলপ্রাসার্থকে বিয়ে করেন বাজিরালংকর্ণ।
বিয়ের দু’বছর পরে সন্তানদের নিয়ে যুবধিদা নিজের নতুন ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের জেরে পালিয়ে যান আমেরিকায়। পরে বাজিরালংকর্ণ তাঁর কন্যাকে তাইল্যান্ডে ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলেন। কিন্তু চার ছেলে থেকে যান তাঁদের মায়ের সঙ্গেই। এই চার ছেলের মধ্যেই রাজার দ্বিতীয় পুত্র হলেন ভাচারাসর্ন।
২০০১ সালে তৃতীয় বিয়ে করেন বাজিরালংকর্ণ। এ বার তাঁর স্ত্রী শ্রীরশ্মি সুওয়াদি ছিলেন সাধারণ তাই নাগরিক। বিয়ের চার বছর পর তিনি এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। তাঁর নাম দীপাঙ্কর্ন রাসমজোতি। কিন্তু রাজপুত্র দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত। রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসাবে তাঁকে মনোনীত করা সম্ভব নয় বাজিরালংকর্ণের।
২০১৯-এ রাজ্যাভিষেকের তিন দিন আগে চতুর্থ বিয়ে করেন বাজিরালংকর্ণ। সবাইকে চমকে দিয়ে তিনি পাণিগ্রহণ করেন ব্যক্তিগত রক্ষীদলের উপপ্রধান সুথিদাকে। সুথিদার এখনও পর্যন্ত কোনও সন্তান নেই। সিংহাসনের প্রধান দাবিদার বজ্রকিতিয়াভাও প্রয়াত। যদি শেষ পর্যন্ত যুবরাজ দীপাঙ্কর্ন রাজ্যভার সামলানোর অনুপযুক্ত বলে প্রমাণিত হন, তবে ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ার সম্ভাবনা রয়েছে ভাচারাসর্নের বলে দাবি অনেকেরই।
তাই রাজপরিবার সম্পর্কে কী বলা যাবে আর কী যাবে না, তা সে দেশের কঠোর নিয়মকানুনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত। রাজপরিবারকে ‘রাজদ্রোহ আইন’ দিয়ে সমালোচনার হাত থেকে সুরক্ষা দেওয়া হয়। রাজপরিবারের সম্পর্কে বা তার বিরুদ্ধে কোনও কথা বা বিবৃতির দেওয়ার জন্য নাগরিকদের ১৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে তাইল্যান্ডে।