ব্রাজ়িলের ফুটবলারকে ‘পবিত্র জল’ খাইয়ে কব্জা করে আর্জেন্টিনা! ১৫ বছর পর সামনে আসে সত্য, বিতর্কে ‘ঘি ঢালেন’ মারাদোনা
বর্তমান সময়ে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে বিভিন্ন দেশকে সমর্থনের প্রবণতা রয়েছে। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে ফুটবল বিশ্বকাপ শুনলে বেশির ভাগ মানুষের মনে দু’টি দলের নামই ভেসে উঠত। ব্রাজ়িল এবং আর্জেন্টিনা।
১১ জুন থেকে শুরু হয়েছে ফুটবলের বৃহৎ উৎসব ফিফা আয়োজিত ফুটবল বিশ্বকাপ। বিশ্বের নানা প্রান্তের ফুটবলপ্রেমীরা প্রহর গোনেন এই প্রতিযোগিতার। চার বছর অন্তর আয়োজিত হয় ফুটবলের বিশ্বকাপ। অংশ নেয় বিভিন্ন দেশ।
চলতি বছর প্রথম বার ৪৮টি দেশকে নিয়ে প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে ফিফা। ফুটবল বিশ্বকাপ খেলা হবে তিনটি দেশে। বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক আমেরিকা, কানাডা এবং মেক্সিকো। তিনটি দেশে আলাদা আলাদা উদ্বোধনী অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা করেছে ফিফা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়েছে মেক্সিকোর অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে। প্রথম ম্যাচে ম্যাক্সিকোর বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকাকে খেলতে দেখা গিয়েছে।
২০২৬-এর ফুটবল বিশ্বকাপে বেশির ভাগেরই নজর রয়েছে মেসি এবং রোনাল্ডোর উপর। উভয়েরই হয়তো এটা শেষ বিশ্বকাপ। মেসিপ্রেমীরা চান দ্বিতীয় বারের জন্য তাঁদের ‘আইডল’ বিশ্বকাপ তুলুক। অন্য দিকে রোনাল্ডোপ্রেমীরা তাঁদের প্রভুর হাতে বিশ্বকাপ দেখে ‘গোট’ বিতর্কে নিজেদের জমি শক্ত করতে চান।
ফুটবল বিশ্বকাপে রোনাল্ডো-মেসি বিতর্ক নতুন কিছু নয়। ফুটবল বিশেষজ্ঞদের নজরও থাকে এই দুই তারকার কে কেমন খেলছেন সেটির উপর। কিন্তু ফুটবল বিশ্বকাপ ঘিরে রয়েছে আরও নানা বিতর্ক। সেগুলির মধ্যে একটি অতি প্রাচীন তর্কাতর্কির বিষয় হল ফুটবলের দুনিয়ায় আর্জেন্টিনা বেশি ভাল, না ব্রাজ়িল।
বর্তমান সময়ে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে বিভিন্ন দেশকে সমর্থনের প্রবণতা রয়েছে। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে ফুটবল বিশ্বকাপ শুনলে বেশির ভাগ মানুষের মনে দু’টি দলের নামই ভেসে উঠত। ব্রাজ়িল এবং আর্জেন্টিনা।
আরও পড়ুন:
ব্রা়জ়িল এবং আর্জেন্টিনার মধ্যে কোনও রাজনৈতিক গোলযোগ যেমন নেই, নেই কোনও অন্য ঝামেলা। দক্ষিণ আমেরিকার এই দুই দেশের মধ্যে সংঘাতের পুরোটাই ফুটবলকেন্দ্রিক। খেলার ময়দানেই চলে এদের যোগ্যতা প্রমাণের লড়াই। সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্প্যানিশ ভাষায় ‘ক্লাসিকো সুদামেরিকানো’ নামে পরিচিত। দুই দলের অনুসারীরাও তাই নিজেদের একে অপরের শত্রু মনে করে বসেন।
চলতি ফুটবলের ঝড় মনে করিয়ে দেয় ফুটবল বিশ্বকাপের এক অন্যতম বিস্ফোরক বিতর্ককে। ফিরে যেতে হয় ১৯৯০ সালে ইটালিতে হওয়া বিশ্বকাপে, যা ‘ইটালিয়া৯০’ নামে খ্যাত।
ইটালির তুরিনের স্টেডিও ডেল্লে আল্পি স্টেডিয়ামে চলছিল রাউন্ড ১৬-এর নক আউট ম্যাচ। আর্জেন্টিনা বনাম ব্রাজ়িল। যে দল জিতবে, সে বিশ্বকাপ জেতার দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে। যে হারবে, তাকে ফিরে যেতে হবে বাড়ি। উত্তেজনা চরমে। চলছিল হাড্ডাহাড্ডি লড়াই।
ব্রাজ়িল সেই সময় দুর্দান্ত ফর্মে। অন্য দিকে আর্জেন্টিনার ফর্ম তুলনামূলক নড়বড়ে। সেই খেলায় শুরু থেকেই আধিপত্য স্থাপন করেছিল ব্রাজ়িল। দেখে মনে হচ্ছিল জিত তাদেরই হবে। এমন সময় আর্জেন্টিনার এক খেলোয়াড় গুরুতর চোট পান। সেই দেশের চিকিৎসাদল ছুটে আসে মাঠে। সঙ্গে করে ফুটবলারদের জন্য জলের বোতলও আনা হয়।
আরও পড়ুন:
মাঠের কোণে থাকা চিকিৎসাদলের কাছে ছুটে যান তৃষ্ণার্ত ফুটবলারেরা। যে দলে ছিলেন ব্রাজিলের তারকা ফুটবলার ব্রাঙ্কো। তাঁর উপর ব্রাজিলের জাতীয় দলের তৎকালীন কোচ সেবাস্তিয়াও লাজ়ারোনির পূর্ণ আস্থা ছিল।
ব্রাঙ্কোর পিপাসা পেয়েছিল। তাই তিনি জলের খোঁজেই মাঠের কোনায় গিয়েছিলেন। সেই সময় তাঁর হাতে জলের বোতল তুলে দেন আর্জেন্টিনার তৎকালীন ফিজ়িয়োথেরাপিস্ট মিগুয়েল দি লরেঞ্জ। তার পরই খেলা ঘুরে যায়।
সেই জল পান করার কিছু ক্ষণ পর থেকে ব্রাঙ্কো ক্লান্তি অনুভব করতে থাকেন। সেই কারণে আর্জিন্টিনার তারকা ফুটবলার দিয়েগো মারাদোনাকে তিনি ঠিক ভাবে মার্ক করতে পারছিলেন না। ফলে যা হওয়ার তাই-ই হয়। গোল করে আর্জেন্টিনা। মারাদোনার পাসে জালে বল ঢোকাতে সক্ষম হন ক্লদিও কানিগিয়া। সেই একটি গোলই আর্জেন্টিনাকে কোয়ার্টার ফাইনালে নিয়ে যায়। বিদায় নেয় ব্রাজ়িল। সেই বছর আর্জেন্টিনা ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছেছিল। কিন্তু জার্মানির কাছে হেরে যায়।
কিছু দিন পর ব্রাঙ্কো মুখ খোলেন। তিনি অভিযোগ তোলেন যে তাঁর জলে কোনও মাদকদ্রব্য মেশানো হয়েছিল। সেই কারণে জল খাওয়ার পর থেকে তিনি আর সে ভাবে খেলতে পারছিলেন না। কিন্তু আর্জেন্টিনার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এবং তৎকালীন কোচ কার্লোস বিলার্দোর কেউই তাঁর সেই অভিযোগ স্বীকার করেননি। উল্টে তা হেসে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু দীর্ঘ ১৫ বছর পর সত্যিটা সামনে আসে। ২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার এক সাক্ষাৎকারভিত্তিক অনুষ্ঠানে সেই ঘটনা নিয়ে মুখ খোলেন মারাদোনা। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিলার্দোও। মারাদোনা জানান তিনি নিজে ব্রাঙ্কোকে তাঁদের থেকে জল খাওয়ার আবেদন জানান। সেই সময় তাঁকে ‘পবিত্র জল’ খাওয়ানো হয়, যার পর ব্রাঙ্কো ঠিকমতো খেলতে পারছিলেন না। কারণ সেই জলে কিছু একটা মেশানো হয়েছিল। সেটি কী ছিল তা যদিও প্রকাশ্যে জানাননি মারাদোনা।
সেই সাক্ষাৎকারে বিলার্দোকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি কিছুই বলেননি। উল্টে মুখ চেপে বসে থাকেন। তাঁর মুখের ভাব দেখে মনে হচ্ছিল তিনি এ বিষয়ে অনেক কিছুই জানেন কিন্তু মুখ খুলতে নারাজ। সাংবাদিক বিলার্দোকে জিজ্ঞেস করেন যে জলে কিছু মেশানোর বুদ্ধিটা কার মাথায় এসেছিল? সে বিষয়ে বিলার্দো শুধু বলেন, “আমি জানি না। আমি বলছি না যে এমন কিছু ঘটেনি।”
বিলার্দোর এই দুই বাক্যের উত্তরই পুরনো ঘটনাকে জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ছিল। ফুটবল বিশ্বে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন প্রবীণ ফুটবলারেরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেন। সেবাস্তিও লোজ়ারনি এই ঘটনাকে ‘নোংরা খেলা’ বলেন। কার্লোস আলবার্তো ঘটনাটি ঘিরে তদন্তের দাবি জানান। তাঁর মতে বিলার্দো-সহ আর্জেন্টিনার সেই ফিজ়িয়োথেরাপিস্টকে শাস্তি দিয়ে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করা উচিত।
এর পর কেটে গিয়েছে বহু দিন। বিশ্ব আবারও মেতে উঠেছে ফুটবলের বিশ্বকাপ নিয়ে। কিন্তু সেই ঘটনার কোনও তদন্ত আজও হয়নি। বিচার পায়নি ব্রাজ়িলের জাতীয় দল এবং ব্রাঙ্কো। ফিফা থেকেও এই ঘটনার বিষয়ে কোনও মন্তব্য করা হয়নি।