৮৪০ কোটি থেকে পাঁচ বছরে বেড়ে ১৪০০ কোটি! দেশের ধনীতম মুখ্যমন্ত্রী পেল দক্ষিণের রাজ্য, দ্বিতীয়, তৃতীয় কারা?
গত কয়েক বছরে কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রীর সম্পদের বৃদ্ধি বিশেষ ভাবে নজর কেড়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনী হলফনামায় শিবকুমার ও তাঁর পরিবারের মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ৮৪০.০৮ কোটি টাকা। মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে সেই অঙ্ক বেড়ে ১,৪১৩.৭৮ কোটিতে পৌঁছেছে, যা প্রায় ৫৮ শতাংশ বৃদ্ধি।
একসময় ছিলেন দেশের সবচেয়ে ধনী বিধায়ক এবং উপমুখ্যমন্ত্রী। এ বার তিনিই হলেন দেশের ধনীতম মুখ্যমন্ত্রী। গত ৩ জুন কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়ে নতুন ইনিংস শুরু করলেন কংগ্রেসের নবনির্বাচিত পরিষদীয় দলনেতা ডি শিবকুমার। শপথগ্রহণের পর তিনিই হয়ে উঠেছেন দেশের সবচেয়ে বিত্তশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তথা মুখ্যমন্ত্রী।
২০২৩ সালে কর্নাটকে বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের জয়ের পর থেকেই মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সি নিয়ে টানাপড়েনের সৃষ্টি হয়। সে সময় কংগ্রেস নেতৃত্ব মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে বর্ষীয়ান নেতা সিদ্দারামাইয়াকে বেছে নেন। শিবকুমারকে উপমুখ্যমন্ত্রী করা হয়। ঠিক হয় আড়াই বছর পর মুখ্যমন্ত্রী পদে বদল করা হবে, শিবকুমারকে কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী করবেন কংগ্রেস নেতৃত্ব।
কিন্তু আড়াই বছর পর কুর্সির হাতবদলের ইঙ্গিত না মেলায় ফাটল চওড়া হচ্ছিল কংগ্রেসের অন্দরে। শিবকুমার-ঘনিষ্ঠ বিধায়কেরা বার বার দলের অভ্যন্তরে উপমুখ্যমন্ত্রী শিবকুমারকে মুখ্যমন্ত্রী করার দাবি তোলেন। এই নিয়ে দফায় দফায় বৈঠকে বসেন হাইকমান্ড ও রাজ্য নেতৃত্ব। বহু আলাপ-আলোচনার পর জুনের গোড়ায় প্রবীণ নেতা সিদ্দারামাইয়াকে সরিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর পদে অভিষিক্ত হন শিবকুমার।
নির্বাচনী হলফনামা অনুসারে গোটা দেশের মধ্যে দক্ষিণের রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের সম্পত্তি সবচেয়ে বেশি। ১,৪০০ কোটি টাকারও বেশি সম্পদের মালিক শিবকুমার। তাঁর এই বিপুল সম্পত্তি দেশের অন্য সব মুখ্যমন্ত্রীকে ছাপিয়ে গিয়েছে।
২০২৩ সালে নির্বাচনে প্রদত্ত হলফনামা অনুসারে, শিবকুমারের মোট পারিবারিক সম্পত্তির মূল্য ছিল প্রায় ১,৪১৩.৭৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৭৩.৪২ কোটি টাকা ছিল অস্থাবর সম্পত্তি এবং ১,১৪০.৩৬ কোটি টাকা ছিল স্থাবর সম্পত্তি।
আরও পড়ুন:
শিবকুমারের সম্পদের বড় অংশই এসেছে স্থাবর সম্পত্তি থেকে। উল্লেখযোগ্য ভাবে, স্থাবর সম্পত্তির সিংহভাগ, ৯৭২.৬৫ কোটি টাকার সম্পত্তি শিবকুমারের নামেই নথিভুক্ত। তাঁর সম্পদের মূল ভিত্তি জমি, বাড়ি, বাণিজ্যিক সম্পত্তি এবং অন্যান্য রিয়্যাল এস্টেট সম্পদ।
গত কয়েক বছরে তাঁর সম্পদের বৃদ্ধি বিশেষ ভাবে নজর কেড়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনী হলফনামায় শিবকুমার ও তাঁর পরিবারের মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ৮৪০.০৮ কোটি টাকা। মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে সেই অঙ্ক বেড়ে ১,৪১৩.৭৮ কোটিতে পৌঁছেছে, যা প্রায় ৫৮ শতাংশ বৃদ্ধি। এই বৃদ্ধির বড় কারণ জমি ও রিয়্যাল এস্টেট সম্পদের মূল্যবৃদ্ধি।
শিবকুমারের সম্পত্তির মধ্যে কৃষিজমিও রয়েছে। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে বেঙ্গালুরুর দক্ষিণ ও কনকপুরা অঞ্চলে তাঁর ৭১ একরের বেশি কৃষিজমি ও অন্যান্য জমি রয়েছে। বেঙ্গালুরুর দ্রুত নগরায়ন, নতুন সড়ক ও পরিকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে এই অঞ্চলের জমির মূল্য চড়চড় করে বেড়েছে। ফলে লাফ দিয়ে শিবকুমারের সম্পত্তির পরিমাণও বেড়েছে।
শুধু জমি-বাড়ি নয়, কনকপুরার বিধায়কের নির্বাচনী হলফনামায় তাঁর যানবাহনের তালিকাও প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে টয়োটা কোয়ালিস গাড়ি ছাড়াও রোলেক্স ও হাবলোর মতো নামী ব্র্যান্ডের বিলাসবহুল ঘড়ি এবং সোনা ও রুপোর মতো ধাতুতে তাঁর উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:
শিবকুমারের বাড়িতে নানা অলঙ্কারের সম্ভারও চোখে পড়ার মতো। ২ কেজি ১৮৪ গ্রাম সোনা, সাড়ে ১২ কেজি রুপো, ৩২৪ গ্রাম হিরে রয়েছে তাঁর সংগ্রহে। এ ছাড়াও তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও সোনা, রুপো, হিরের অলঙ্কার রয়েছে।
হলফনামা অনুযায়ী, তাঁর ব্যক্তিগত অস্থাবর সম্পত্তির মূল্য ছিল ২৫১.৬৯ কোটি টাকা। এর একটি অংশ হিন্দু অবিভক্ত পরিবারের সম্পদ হিসাবেও দেখানো হয়েছে।
তবে সম্পদের পাশাপাশি শিবকুমারের ঘাড়ে বেশ মোটা ঋণের বোঝাও রয়েছে। নির্বাচনী হলফনামায় প্রায় ২৬৩ কোটি টাকার দায় বা ঋণের কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল। ফলে মোট সম্পদের অঙ্ক বিশাল হলেও এর থেকে একটি অংশ ঋণ শোধ করতে হয় কর্নাটকের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীকে।
রাজনৈতিক জীবনে শিবকুমার কর্নাটকের অন্যতম প্রভাবশালী কংগ্রেস নেতা হিসাবে পরিচিত। তিনি দীর্ঘ দিন ধরে কনকপুরা কেন্দ্রের বিধায়ক এবং রাজ্যের মন্ত্রী ও উপমুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব কংগ্রেসের কর্নাটক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
কর্নাটকে ভোক্কালিগা সম্প্রদায়ের সদস্য শিবকুমার। তাঁর পুরো নাম ডোড্ডালাহাল্লি কেম্পেগৌড়া শিবকুমার। অতীতে কর্নাটকে কংগ্রেস সরকারের আমলে মন্ত্রীও হয়েছিলেন তিনি। সিদ্দারামাইয়া এবং এইচডি কুমারস্বামী সরকারের আমলে মন্ত্রী ছিলেন শিবকুমার।
২০২৩ সালে বিরাট ব্যবধানে জিতে কর্নাটকের কুর্সি দখল করেছে কংগ্রেস। কনকপুরা কেন্দ্র থেকে নিজেও জয়ের হাসি হেসেছেন শিবকুমার। বেঙ্গালুরুর কাছে কনকপুরায় জন্ম শিবকুমারের। ওই কেন্দ্র থেকেই নির্বাচনে লড়ে জয়ী হয়েছেন কংগ্রেসের এই নেতা। ১৯৮৯ সাল থেকে টানা বিধানসভায় জিতে আসছেন তিনি।
তিনি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে ধনী মুখ্যমন্ত্রীর খেতাব ধরে রেখেছিলেন দক্ষিণেরই আর এক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। তিনি অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এন চন্দ্রবাবু নাইডু। এখন তিনি দ্বিতীয় স্থানে। ৯৩১ কোটি টাকার সম্পত্তি রয়েছে তেলুগু দেশম পার্টির সদস্য চন্দ্রবাবুর নামে। তাঁর সম্পত্তির একটি বিশাল অংশ হেরিটেজ ফুডস লিমিটেডের মতো শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত পারিবারিক ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
তৃতীয় স্থানে রয়েছেন, তামিলভূমের সদ্যবিজেতা মুখ্যমন্ত্রী দক্ষিণী চলচ্চিত্র তারকা থলপতি বিজয়। সাম্প্রতিক নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ৬২৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাঙ্কে ১০০ কোটি টাকার বেশি স্থায়ী আমানত এবং সেভিংস অ্যাকাউন্টে ২১৩ কোটি টাকা রয়েছে। পাশাপাশি শেয়ারবাজারেও বিনিয়োগ আছে তমিজহাগা ভেত্রি কাজগাম বা টিভিকে দলের প্রতিষ্ঠাতা বিজয়ের।