স্থানীয় নেতার শেষকৃত্যে গুলি, হিংসা! বন্ধ ইন্টারনেট, ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে ফুঁসছে মানুষ, জ্বলছে পাক অধিকৃত কাশ্মীর
পাক অধিকৃত কাশ্মীরে চলছে তীব্র জনরোষ এবং অশান্তি। যদিও এই অঞ্চলে বিক্ষোভ নতুন নয়, তবে বর্তমানে যে হিংসা ছড়িয়ে পড়েছে তা থেকে আশঙ্কা করা হচ্ছে যে পরিস্থিতি আরও হিংসাত্মক রূপ নিতে পারে।
জ্বলছে পাক অধিকৃত কাশ্মীর (পিওকে)। পূর্ববর্তী আলোচনায় দেওয়া মূল প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতার অভিযোগে পাক সরকারের দিকে তোপ দেগে বন্ধ এবং বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দিয়েছে স্থানীয় যৌথ আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি)। তার মধ্যেই এক স্থানীয় নেতার শেষকৃত্যে পুলিশের গুলি চালানোর পর নতুন করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পিওকে-তে।
পাক অধিকৃত কাশ্মীরে চলছে তীব্র জনরোষ এবং অশান্তি। যদিও এই অঞ্চলে বিক্ষোভ নতুন নয়, তবে বর্তমানে যে হিংসা ছড়িয়ে পড়েছে তা থেকে আশঙ্কা করা হচ্ছে যে পরিস্থিতি আরও হিংসাত্মক রূপ নিতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে পাক অধিকৃত কাশ্মীরে বিক্ষোভ চালাচ্ছে জেএএসি। সরকারকে তাদের দাবি মেনে নিতে ক্রমাগত চাপ দিয়ে যাচ্ছে সংগঠনটি। সম্প্রতি জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টির অভিযোগে জেএএসি-কে নিষিদ্ধ করেছিল পাক সরকার। এর পরে একাধিক বিক্ষোভ কর্মসূচির আয়োজন করা হয় সংগঠনটির তরফে, যার মধ্যে অন্যতম গত মঙ্গলবারের একটি বিক্ষোভ মিছিল। আগামী সপ্তাহেও একটি বিক্ষোভ মিছিলের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
সংগঠনটির প্রধান দাবিগুলির মধ্যে রয়েছে, পাক অধিকৃত কাশ্মীরের বিধানসভায় সংরক্ষিত ১২টি আসন বাতিল করা। সংগঠনটির মতে, এই আসনগুলির কারণে বহিরাগতেরা পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের রাজনীতিকে প্রভাবিত করে এবং পাকিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি এই অঞ্চলের সরকার নিয়ন্ত্রণে সফল হয়। এ ছাড়াও, সংগঠনটি সুলভ বিদ্যুৎ, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবার দাবি জানাচ্ছে, যা ওই অঞ্চলে দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা সমস্যা।
পাকিস্তান সরকার জেএএসি-কে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও নৈরাজ্য ছড়ানোর অভিযোগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় এনেছে। তবে, জেএএসি তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলি প্রত্যাখ্যান করেছে।
আরও পড়ুন:
সংগঠনটি জানিয়েছে, তারা কোনও দেশ, অন্য কোনও সংগঠন বা ব্যক্তির বিরোধিতা করে না। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত করে গুরুতর অবিচার করা হয়েছে বলেও দাবি তাদের। আন্দোলনকারীরা এ-ও দাবি করেছেন, গত চার দিনে ধারাবাহিক অভিযানে প্রায় ৩৫০ জন বাসিন্দাকে আটক করা হয়েছে পাক সরকারের নির্দেশে।
নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে জেএএসি নেতার হত্যাকাণ্ড-সহ পূর্ববর্তী হিংসার ঘটনা, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ, সংগঠনটির ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং বিদ্যুৎ ঘাটতি, মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব, সম্পদ শোষণ এবং রাজনৈতিক প্রান্তিকীকরণের মতো বিভিন্ন বিষয়ের প্রতিবাদে মঙ্গলবারের বিক্ষোভের ডাক দেয় জেএএসি। জনগণকে সংগঠিত ভাবে এতে অংশগ্রহণের আহ্বানও জানানো হয়।
এর মধ্যেই রবিবার গভীর রাতে রাওয়ালকোটে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত এক নেতার শেষকৃত্য চলাকালীন পাক সেনাবাহিনী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হলে হিংসা ছড়িয়ে পড়ে।
জেএএসি নেতারা দাবি করেছেন, শুক্রবার পাকিস্তান রেঞ্জার্সের হাতে নিহত বিক্ষোভকারী শাহজ়ইব হাবিবের শেষকৃত্যের নামাজের জন্য রাওয়ালকোটের সামরিক হাসপাতালের বাইরে জড়ো হওয়া শোকাহত ও বিক্ষোভকারীদের ওপর নিরাপত্তা কর্মীরা নির্মম ভাবে গুলি চালিয়েছে।
আরও পড়ুন:
ওই সমাবেশে জেএএসি-র নেতা এবং সমর্থকেরা উপস্থিত ছিলেন, যাঁদের অনেকেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছিলেন এবং ওই অঞ্চলে সাম্প্রতিক সরকারি কর্মকাণ্ডের জন্য জবাব চাইছিলেন। অভিযোগ, সেই সময়ই বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়।
শেষকৃত্যে অংশগ্রহণকারীদের উপর পুলিশ এবং সেনা গুলি চালানোর পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। জেএএসির অভিযোগ, সরকারের এই সাম্প্রতিক দমন-পীড়নে অন্তত ২৭ জন নিহত হয়েছেন। যদিও ইসলামাবাদের তরফে মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে প্রথমে কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি।
পরে সোমবার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে (পিওকে) পুলিশ এবং একটি নিষিদ্ধ প্রতিবাদী গোষ্ঠী জেএএসি সদস্যদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত সাত জন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন। রাওয়ালকোটের কমিশনার সর্দার ওয়াহিদ জানিয়েছেন, এই হিংসার ঘটনায় তিন জন সাধারণ নাগরিক এবং চার জন পুলিশকর্মী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৪০ জন।
সংঘর্ষটি জেএএসি-র পরিকল্পিত বিক্ষোভের এক দিন আগে ঘটেছে। পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট পরিষেবা স্থগিত করা হয়েছে। পিওকে-র রাজধানী এবং বৃহত্তম শহর মুজফ্ফারাবাদে মোতায়েন করা হয়েছে পাকিস্তান পুলিশ এবং পাকিস্তান রেঞ্জার্সের অতিরিক্ত দল।
মুজফ্ফারাবাদে পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তপ্ত। শহরে বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে এবং সম্ভাব্য লকডাউনের আশঙ্কায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে দোকানে ভিড় জমিয়েছেন সাধারণ মানুষ। আন্তর্জাতিক ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ সংস্থা নেটব্লকস জানিয়েছে, পিওকে-তে ইন্টারনেট পরিষেবা ব্যাপক ভাবে ব্যাহত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাক অধিকৃত কাশ্মীরে সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলার অবনতি স্থানীয় প্রশাসন এবং পুলিশ ব্যবস্থার গুরুতর ব্যর্থতার প্রতিফলন। সূত্রগুলি বলছে, পাকিস্তান বর্তমানে একাধিক ফ্রন্টে গুরুতর নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী বেশ কয়েক বছর ধরে তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি), বালোচ বিদ্রোহী এবং আফগান তালিবানের হুমকির মোকাবিলা করে আসছে। তার মধ্যেই পিওকে-তেও সরকার-বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছে।
পাক অধিকৃত কাশ্মীরে বিক্ষোভের প্রভাব পড়েছে অন্য দেশেও। ইসলামাবাদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস পিওকে-তে থাকা নাগরিকদের বিক্ষোভের আগে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ৫ জুন থেকে ২০ জুন পর্যন্ত ওই অঞ্চলে ভ্রমণের বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছেন।
এর আগে ৩০ জনের বেশি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্যও ব্রিটেনের বিদেশমন্ত্রী ইভেট কুপারকে চিঠি লিখে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, গ্রেফতার এবং ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
লেবার পার্টির সাংসদ ইমরান হুসেনের নেতৃত্বে লেখা ৬ জুনের ওই চিঠিতে ব্রিটিশ সরকারকে পরিস্থিতি নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে এবং পরিস্থিতির আরও অবনতি রোধে কূটনৈতিক ভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। আইনপ্রণেতাদের মতে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বেশ কয়েক জন ব্রিটিশ-কাশ্মীরি তাঁদের কাছে এসে জানিয়েছেন যে তাঁরা ওই অঞ্চলে থাকা আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না।