প্রাক্তন প্রেমিকের দেশ দেবে ৬৬৭ কোটি টাকা! ফিফা বিশ্বকাপের মুখে কর মামলায় চরম স্বস্তিতে ‘ওয়াকা ওয়াকা’ শাকিরা
স্পেনের সরকারি আইনজীবীর তরফে দাবি করা হয়েছে যে, বার্সেলোনার ফুটবলার জেরার্ড পিকের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানোর পর ২০১১ সালে স্পেনে বসবাস শুরু করেন শাকিরা। ২০১১ সালে নির্দিষ্ট সময়ের বেশি স্পেনে অবস্থান করেও তার বিশ্বব্যাপী আয়ের কর ফাঁকি দিয়েছেন শাকিরা। গায়িকাকে মোটা অঙ্কের জরিমানা এবং বকেয়া কর পরিশোধ করতে বাধ্য করা হয়েছিল।
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে অবসান। সম্প্রতি বিপুল পরিমাণ অর্থ ফেরত পেলেন ‘পপ সম্রাজ্ঞী’ শাকিরা। স্পেনের কর বিভাগের সঙ্গে দীর্ঘ দিন ধরে চলা কর সংক্রান্ত মামলা টানাপড়েনে জয় হল ‘ওয়াকা ওয়াকা’খ্যাত কলম্বিয়ান গায়িকার। এক চূড়ান্ত রায়ে শাকিরাকে কর ফাঁকির সব অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়েছে স্পেনের ন্যাশনাল হাইকোর্ট।
স্পেনের কর কর্তৃপক্ষের আরোপ করা ৬.৪ কোটি ডলার বা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৬৬৭ কোটি টাকা জরিমানা অবৈধ ঘোষণা করেছে স্প্যানিশ আদালত। স্পেনে এর আগে কর সংক্রান্ত মামলায় কোনও বিদেশি নাগরিক বা তারকার সঙ্গে করবিভাগের এত বড় অঙ্কের অর্থের মামলা এবং তাতে সরকারের এমন নজিরবিহীন পরাজয় এর আগে দেখা যায়নি। এই রায়ের ফলে জরিমানা এবং সুদ-সহ বিপুল পরিমাণ টাকা ফেরত পেতে চলেছেন তারকা গাইয়ে।
এই আইনি লড়াইয়ের সূত্রপাত হয়েছিল এক দশকেরও বেশি সময় আগে, ২০১১ সালে। পপ তারকা শাকিরা তখন স্প্যানিশ ফুটবল তারকা জেরার্ড পিকের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান এবং বার্সেলোনায় বসবাস শুরু করেন। ঠিক তখনই বিপাকে পড়েন এই পপ তারকা। স্পেনে কর ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সঙ্গীতশিল্পীর বিরুদ্ধে।
স্পেনের নিজস্ব কর আইন অনুযায়ী, কোনও বিদেশি নাগরিক যদি কোনও ক্যালেন্ডার বছরে ১৮৩ দিন বা তার বেশি সময় স্পেনের ভূখণ্ডে বসবাস করেন, তবে তাকে স্পেনের ‘আবাসিক করদাতা’ হিসাবে গণ্য করা হবে। সেই নিয়মে তাঁকে কেবল স্পেন থেকে আয় নয়, বরং বিশ্ব জুড়ে তিনি যে মোট উপার্জন করেন তার ওপর স্পেন সরকারকে কর দিতে হয়।
মামলায় স্পেনের সরকারি আইনজীবীর তরফে দাবি করা হয়েছে যে, বার্সেলোনার ফুটবলার জেরার্ড পিকের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানোর পর ২০১১ সালে স্পেনে বসবাস শুরু করেন শাকিরা। ২০১২ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে স্পেনের সাধারণ নাগরিক ছিলেন শাকিরা।
আরও পড়ুন:
২০১০ বিশ্বকাপের সময় দেখা হয় পিকে এবং শাকিরার। সেই সময় থেকেই তাঁদের প্রেম পর্ব শুরু হয়। তাঁদের দুই সন্তানও রয়েছে। তবে বিয়ে করেননি তাঁরা। পপ তারকা শাকিরার সঙ্গে পিকের ১১ বছরের সম্পর্ক। সেই সম্পর্কে ছেদ পড়ে ২০২২ সালে।
২০১২ সালের মে মাসে বার্সেলোনায় বাড়ি কিনেছিলেন গায়িকা। শাকিরার তরফে দাবি করা হয়েছে, ২০১৫ সাল পর্যন্ত বাহামসের করদাতাদের তালিকায় ছিল তাঁর নাম। স্পেনের কর কর্মকর্তাদের দাবি ছিল, শাকিরা ২০১১ সালে স্পেশ্যাল ট্যাক্স রেসিডেন্সির শর্ত ভঙ্গ করেছেন।
স্পেন সরকারের দাবি ছিল ২০১১ সালে নির্দিষ্ট সময়ের বেশি স্পেনে অবস্থান করেও তাঁর বিশ্বব্যাপী আয়ের কর ফাঁকি দিয়েছেন শাকিরা। এই দাবির ওপর ভিত্তি করেই গায়িকাকে মোটা অঙ্কের জরিমানা এবং বকেয়া কর পরিশোধ করতে বাধ্য করা হয়েছিল।
শাকিরার আইনজীবীদের দাবি ছিল ২০১১ সালে শাকিরা তাঁর বিশ্বভ্রমণ বা ‘দ্য সান কামস আউট ওয়ার্ল্ড ট্যুর’-এ ব্যস্ত ছিলেন। সেই বছরের বেশির ভাগ সময় স্পেনের বাইরে কাটিয়েছেন তিনি। কর আইনের নিয়ম অনুযায়ী ১৮৩ দিন তিনি স্পেনে কাটাননি বলে আদালতে জানান শাকিরা।
আরও পড়ুন:
দীর্ঘ তদন্ত ও তথ্যপ্রমাণ যাচাই করে স্পেনের ন্যাশনাল হাই কোর্ট এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, শাকিরা ২০১১ সালে স্পেনে ১৬৩ দিন অবস্থান করেছিলেন। যে হেতু আইনগত ভাবে করদাতা হওয়ার ন্যূনতম সীমা ১৮৩ দিন, তাই শাকিরা কোনও ভাবেই সে বছর স্পেনে আবাসিক করদাতা হিসাবে চিহ্নিত হবেন না।
আদালত পরিষ্কার জানিয়ে দেয়, স্পেনের কর বিভাগ শাকিরার ভ্রমণের দিনগুলো গণনায় মস্ত বড় ভুল করেছিল এবং জোর করে তাঁর কাছ থেকে কর আদায় করা হয়েছিল, যা সম্পূর্ণ বেআইনি বলে উল্লেখ করেছে আদালত।
আদালত শুধু মূল করের টাকাই ফেরত দিতে বলেনি, বরং এত বছর ধরে সেই অর্থ আটকে রাখার কারণে তার ওপর চড়া হারে সুদও যোগ করতে বলেছে। ফলে স্পেন সরকারকে এখন রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ শাকিরাকে ফেরত দিতে হবে।
‘হিপস ডোন্ট লাই’ এবং ‘হোয়ার এভার, হোয়েন এভার’-এর মতো হিট গানের গায়িকা শাকিরার বিরুদ্ধে কর সংক্রান্ত একাধিক মামলা রয়েছে স্পেনে। এর আগে ২০১২-২০১৪ সালের একটি পৃথক কর ফাঁকির মামলা নিষ্পত্তির জন্য স্প্যানিশ প্রসিকিউটরদের সঙ্গে তিনি একটি চুক্তি করেছিলেন বলে জানা গিয়েছে।
চুক্তিতে রাজি হলেও শাকিরা তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করলেও, ৭৫ লক্ষ ইউরো (৬৫ লক্ষ পাউন্ড) জরিমানা প্রদান করেন। দোষী প্রমাণিত হলে স্পেনের সরকারি কর সংস্থা তাকে আট বছরের কারাদণ্ড এবং ২ কোটি ৩৮ লক্ষ ইউরো (২ কোটি ৮ লক্ষ পাউন্ড) জরিমানা করতে চেয়েছিলেন।
সেই সময় শাকিরা জানিয়েছিলেন, তিনি সন্তানদের স্বার্থের কথা মাথায় রেখে মামলাটির নিষ্পত্তি করেছেন। ২০২৪ সালেও স্পেনের একটি আদালত প্রমাণের অভাবে তার ২০১৮ সালের কর পরিশোধ সংক্রান্ত মামলা খারিজ করে দেয় বলে বিবিসি সূত্রে খবর।
রায়ের পর শাকিরা তাঁর আইনজীবীদের মাধ্যমে এবং সমাজমাধ্যমে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি লিখেছেন, ‘‘সব সময় আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলাম এবং আমার সমস্ত কর সততার সঙ্গে পরিশোধ করেছি। স্পেনের কর বিভাগ আমার বিরুদ্ধে যে অন্যায্য ও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছিল, এই রায়ের মাধ্যমে তার অবসান হল। এটি কেবল আমার অর্থের জয় নয়, এটি আমার সততা এবং সম্মানের জয়।’’
এই রায়কে স্পেনের অর্থ মন্ত্রণালয় এবং দেশটির কর ব্যবস্থার জন্য একটি বড় ধরনের ধাক্কা ও আন্তর্জাতিক লজ্জা হিসাবে দেখছেন বিশেষজ্ঞেরা। স্পেনের কর বিভাগ বিগত কয়েক বছরে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো, লিওনেল মেসি এবং নেইমারের মতো বিশ্বখ্যাত ফুটবলারদের বিরুদ্ধেও কর ফাঁকির মামলা করে বিপুল অর্থ আদায় করেছিল। তবে শাকিরার ক্ষেত্রে তাদের এই আগ্রাসী নীতিটি আদালত বানচাল করে দিয়েছে বলে মনে করছেন বহু আইন বিশেষজ্ঞই।