উন্নয়ন-কথায় জোর তৃণমূলের, বিজেপির বাজি পরিষেবা, হিন্দুত্ব

কলকাতা পুরসভার ১১৫ থেকে ১১৭, ১২০ থেকে ১২৪ এবং ১৪২ থেকে ১৪৪ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত বেহালা পূর্ব কেন্দ্র। এখানে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী, পেশায় আইনজীবী শুভাশীষ চক্রবর্তী প্রচারে জোর দিচ্ছেন কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের তুলনা এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নয়নমূলক কাজের উপরে।

অর্ঘ্য বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:২০

— প্রতীকী চিত্র।

নদীর গতিপথ এক সময়ে ভিন্ন ছিল। জনশ্রুতি, বেহুলার ভেলা এই অঞ্চলেই কোথাও থেমেছিল— সেখান থেকেই জায়গার পরিচিতি, ‘বেহুলার ঘাট’ নামের উৎপত্তি। অন্য মতে, দক্ষিণেশ্বর থেকে ‘বহুলা’ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল কালীক্ষেত্র; বহুলা দেবী চণ্ডীর আর এক রূপ। সেই সূত্রেই ‘বেহালা’ নামের নেপথ্যে হয় ‘বেহুলার ঘাট’, নয় ‘বহুলা’ বা দেবী চণ্ডীর ছায়া।

ভোট-মরসুমে সেই বেহালারই পূর্ব বিধানসভা কেন্দ্রে চণ্ডীতলার একটি গ্রিল কারখানার কর্মী গণেশ ঘোষ বললেন, “অনেক ছোট ছোট কারখানা ছিল। বেশির ভাগই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তবে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’, ‘যুবসাথী’— এ সব প্রকল্পে কিছু সুবিধা হয়েছে।”

কলকাতা পুরসভার ১১৫ থেকে ১১৭, ১২০ থেকে ১২৪ এবং ১৪২ থেকে ১৪৪ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত বেহালা পূর্ব কেন্দ্র। এখানে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী, পেশায় আইনজীবী শুভাশীষ চক্রবর্তী প্রচারে জোর দিচ্ছেন কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের তুলনা এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নয়নমূলক কাজের উপরে। বিজেপি প্রার্থী, ব্যবসায়ী শংকর শিকদার পুর পরিষেবা ও ‘সিন্ডিকেট রাজ’-এর অভিযোগ তুলছেন; পাশাপাশি, হিন্দুত্বের সুরও জোরদার করছেন। সিপিএম প্রার্থী, ‘গরিবের ডাক্তার’ নামে পরিচিত নিলয় মজুমদার তুলে ধরছেন স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও রাস্তাঘাটের দুরবস্থার প্রশ্ন। কংগ্রেস প্রার্থী, আইনজীবী অভিজিৎ রাহাও প্রচারে সক্রিয়।

এই কেন্দ্রে মধ্যবিত্ত, বস্তিবাসী ও মতুয়া সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। বিজেপির হিসাবে, মতুয়া ভোটার প্রায় ৩০ হাজার। গত দেড় দশকে এখানে গড়ে উঠেছে বহু ঝাঁ-চকচকে আবাসন ও বহুতল; বেড়েছে হিন্দিভাষী ভোটারের সংখ্যাও। নির্মাণ ব্যবসার ‘শ্রীবৃদ্ধি’র সঙ্গে সঙ্গে তৃণমূলের ওয়ার্ড-স্তরের কিছু নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এলাকা দখল, ‘টিকিট-প্রত্যাশী’ এক পুরপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে পরিবারতন্ত্রের অভিযোগ তুলছেন বিরোধীরা। কয়েক বছর আগে এলাকায় গুলি চলার ঘটনাও স্মরণ করানো হচ্ছে। হার্ড মেটাল মোড় থেকে কুমার গার্ডেন— নানা এলাকার নামেই অতীতের শিল্পাঞ্চলের স্মৃতি রয়ে গিয়েছে। অনেকের দাবি, চণ্ডীতলা ও সোদপুরের বিভিন্ন জায়গায় কারখানা উঠে গিয়ে এখন ফ্ল্যাট হয়েছে। যদিও হার্ড মেটাল মোড়ের চা-বিক্রেতা গণেশ চক্রবর্তীর দাবি, “সিপিএম আমলেই বেশির ভাগ কারখানা বন্ধ হয়েছে।”

মুখ্যমন্ত্রীর দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক সহচর শুভাশীষ চক্রবর্তীর বক্তব্য, “নির্মাণ-ব্যবসা নিয়ম মেনে, মানুষের অসুবিধা না করে হলে আপত্তি নেই। কিন্তু সিন্ডিকেটের নামে দৌরাত্ম্য হলে কখনও বরদাস্ত করব না।” এলাকায় তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক সংযোগের কথা তুলে ধরে তিনি সিপিএম আমলের ‘সন্ত্রাস মোকাবিলা’ ও মানুষের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের প্রসঙ্গও টানছেন। মতুয়া মহাসম্মেলন থেকে সৎসঙ্গ— সর্বত্রই তাঁর উপস্থিতি। তাঁর বক্তব্য, “কোনও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি না। শুধু বলছি, মানুষ বিপদে পড়লে পাশে থাকি, থাকব।”

তৃণমূলের প্রচারের মূল ভরসা রাজ্যের উন্নয়ন। শুভাশীষের দাবি, “কেন্দ্রে স্বৈরাচারী, অগণতান্ত্রিক, বিভাজনকারী সরকার রয়েছে, যারা বছরে দু’কোটি চাকরি বা কালো টাকা ফেরত এনে প্রত্যেকের অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা পূরণ করেনি। অন্য দিকে, এখানে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নানা পরিষেবা দিতে ৯৪টি প্রকল্প চালু হয়েছে— জাত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে।” পাশাপাশি, রাজ্যসভার সাংসদ থাকাকালীন নিজের উদ্যোগে রাজ্য জুড়ে ২৪ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকার উন্নয়নমূলক কাজের কথাও তুলে ধরছেন তিনি।

শুভাশীষের জনসভার পাশ দিয়ে বাজারে যাওয়া এক মহিলার বক্তব্য, “বেহালা মোটের উপর ঠিকই আছে। রাস্তাঘাট, জল জমার সমস্যা অনেকটাই মিটেছে। আইন-শৃঙ্খলাও ভাল।” তবে ১৪৩ নম্বর ওয়ার্ডের এক তরুণীর অভিযোগ, “লক্ষ্মীর ভান্ডারে আবেদন করেছি, এখনও পাইনি। কর্মসংস্থানের হালও ফেরাতে হবে।” বিদায়ী বিধায়ককে এলাকায় ‘দেখা না-পাওয়ার’ অভিযোগও শোনা যাচ্ছে। রত্না চট্টোপাধ্যায়কে এ বার পাশের বেহালা পশ্চিম কেন্দ্রে প্রার্থী করেছে তৃণমূল।

অন্য দিকে, আরএসএস-ঘনিষ্ঠ বিজেপি প্রার্থী শংকর শিকদারের দাবি, ‘‘১১টি ওয়ার্ডের যেখানেই যাচ্ছি, মানুষ পুর পরিষেবা নিয়ে ক্ষুব্ধ। তৃণমূলের পুরপ্রতিনিধিরা সিন্ডিকেট ও তোলাবাজিতে ব্যস্ত। শখেরবাজার-সহ নানা জায়গায় পুকুর বুজিয়ে নির্মাণ-সিন্ডিকেট চলছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলি বেহাল। বেহালা পশ্চিমের বিদ্যাসাগর হাসপাতালই এলাকার একমাত্র বড় সরকারি হাসপাতাল— সেখানে গেলে মৃত্যু অনিবার্য!” এই কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী পরিবর্তন করেছে। এই প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য, “আগের প্রার্থী আধ্যাত্মিক জগতের মানুষ।” বিজেপির প্রচারে ‘বেহালায় হিন্দুত্বের বিপদ’ স্লোগানও উঠে আসছে। ১২৪, ১৪৩ ও ১৪৪ নম্বর ওয়ার্ডের মতুয়া পরিবারগুলির মধ্যেও জোর প্রচার চালাচ্ছে তারা।

ভোট-অঙ্কও রয়েছে আলোচনায়। এসআইআর পর্বের আগে বেহালা পূর্বে মোট ভোটার ছিলেন ৩১১৬৮৫ জন। নাম বাদ ও সংযুক্তির পরে মনোনয়নের শেষ দিন পর্যন্ত সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫৯৭৫২। অর্থাৎ, ভোটার কমেছে ৫১৯৩৩ জন। ২০১১ সাল থেকে প্রায় সব নির্বাচনেই তৃণমূল এখানে প্রায় ৪৫ শতাংশ ভোট ধরে রেখেছে। গত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি পেয়েছিল ৩৩ শতাংশ এবং ২০১৯ লোকসভায় ৩৮ শতাংশ ভোট। সিপিএমের ভোট শতাংশ ২০১৯ ও ২০২৪ লোকসভা এবং ২০২১ বিধানসভায় ১৩ থেকে ১৬ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করেছে।

বেহালায় ‘পুরনো ভোট’ ঘরে ফিরবে বলে আশাবাদী সিপিএম প্রার্থী নিলয়। সিপিএম প্রচার-ভাষ্যে ‘চোর, দাঙ্গাবাজমুক্ত বেহালা গড়ার ডাক’ দিয়েছে। আবার এরই মধ্যে প্রার্থী মহিলা ভোটারদের কাছে গিয়ে বলছেন, “আমরা জিতলেও লক্ষ্মীর ভান্ডার, যুবসাথী সবই থাকবে। সঙ্গে, প্রতিটি পাড়ায় বিনামূল্যের স্বাস্থ্যকেন্দ্র করব।” সিপিএমের এ বার দৃশ্যত বাড়তি পাওনা, ‘কর্মী-উদ্দীপনা’। যার প্রকাশ দেখা গিয়েছে বেহালার দুই কেন্দ্রকে নিয়ে বেহালা চৌরাস্তা থেকে ঠাকুরপুকুর পর্যন্ত ‘মহামিছিল’-এও।

বিরোধী ও নাগরিকদের একাংশ বার বার প্রশ্ন তুলছেন মতিলাল গুপ্ত রোডের সংস্কার-কাজ শেষ কবে হবে, তা নিয়ে। যদিও টোটোচালক চঞ্চল ঘোষের বক্তব্য, “রাস্তা সম্প্রসারণ হচ্ছে। একটু দুর্ভোগ সইতে হবে।”

সয়ে নেওয়া আর না-নেওয়ার টানাপড়েন নিয়েই ডায়মন্ড হারবার রোডের পূর্ব প্রান্তের এই কেন্দ্রের ভোটারেরা ভোটের দিকে এগোচ্ছেন। কথিত আছে, এই পথ দিয়েই একদা কোম্পানি বাহাদুরের সেনারা ডায়মন্ড হারবার দুর্গে যেতেন। এখন দেখার, এই পথে কোন প্রার্থী পৌঁছন পশ্চিমবঙ্গে গণতন্ত্রের এক দুর্গ, বিধানসভায়!

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal Politics West Bengal government Behala Purba TMC BJP

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy