বিরিয়ানিপুরে চটকল-তরজা, জখম এক ভীষ্ম

বিজেপির সৌজন‍্যে এই ভোটে বাড়ি বাড়ি প্রচারের একটা বিচিত্র বাংলা শুনছি! গৃহসম্পর্ক। নববর্ষে মাছ হাতে ধুতি-পাঞ্জাবি চাপিয়ে হেঁটে গৃহসম্পর্ক করার পরে বিরিয়ানি ও বিজেপির সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন করলেও চটছেন প্রার্থী কৌস্তভ বাগচী।

ঋজু বসু

শেষ আপডেট: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৪০

— প্রতীকী চিত্র।

ধর্ম যার যার, বিরিয়ানি সবার! দেশ জুড়ে আমিষ-নিরামিষ রাজনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে ব‍্যারাকপুর স্টেশনের কাছে এলে। লোকে হাসে, ব‍্যারাকপুরে এখন চায়ের থেকে বেশি বিরিয়ানির দোকান। বিরিয়ানি নিয়ে বাঙালির ভাবাবেগ সমঝে চলতে হচ্ছে রাজনীতির ময়দানেও।

বিজেপির সৌজন‍্যে এই ভোটে বাড়ি বাড়ি প্রচারের একটা বিচিত্র বাংলা শুনছি! গৃহসম্পর্ক। নববর্ষে মাছ হাতে ধুতি-পাঞ্জাবি চাপিয়ে হেঁটে গৃহসম্পর্ক করার পরে বিরিয়ানি ও বিজেপির সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন করলেও চটছেন প্রার্থী কৌস্তভ বাগচী। “এ সব আপনাদের কাগুজে প্রচার! আমি কি খাই না বিরিয়ানি? গরমেও খাচ্ছি!”

বাঙালি প্রধান ব‍্যারাকপুর ও পাঁচমিশেলি ভাষা, ধর্মের মিলনক্ষেত্র টিটাগড় মিলিয়ে ব‍্যারাকপুর বিধানসভা এলাকায় বাঙালি জনসংখ্যার পাল্লা একটু বেশি। টিটাগড়ে তৃণমূলের রাজ চক্রবর্তী, সিপিএমের কলেজ শিক্ষক প্রার্থী সুমনবন্দ্যোপাধ্যায়কেও ঝাঁঝিয়ে হিন্দিতে বক্তৃতা দিতে হচ্ছে। তবু কংগ্রেস-ত‍্যাগী আইনজীবী কৌস্তভ হিন্দির সঙ্গে বাঙালিত্বের অগ্নিপরীক্ষায় শামিল। ব‍্যারাকপুরের তিন নম্বর ওয়ার্ডে ওই গৃহসম্পর্ক করার ফাঁকে হঠাৎ খেয়াল হয়েছে, প্রচারপত্রের গোটা সেট, যুবসমাজ ও মহিলাদের থোক টাকার অফার-সমৃদ্ধ যুবশক্তি, মাতৃশক্তির ফর্মের ফাঁকে হিন্দিতে লেখা ‘সঙ্কল্পপত্র’গুলো ঢুকে পড়েছে। কৌস্তভ অগ্নিশর্মা! “কে এটা করল শুনি! বিরাট ক্ষতি। কিছু ভুলের ক্ষমা হয় না!”

সুবক্তা রাজের সাংগঠনিক শক্তিতেও, কৌস্তভের চটককে হারানো মুশকিল। যেখানে যাচ্ছেন, ছায়াসঙ্গী ভিডিয়োগ্রাহক। ৩ নম্বর ওয়ার্ডে ঝোপজঙ্গল ধরা একটি ছোট পার্ক দেখেই তৎপর। দাঁড়া তো, একটা প্রতিবেদন করে ফেলি! তৃণমূল পুর প্রশাসনের অবহেলা নিয়ে জ্বালাময়ী ভিডিয়ো মুহূর্তে তৈরি। প্রচারে ক্রিকেট, গিটার বাজিয়ে গান নানা উত্তেজক ‘কনটেন্ট’ মজুত।

চিত্রপরিচালক রাজ হাসছেন, “মোদীজির আদর্শ প্রার্থী! ক‍্যামেরা নিয়ে গঙ্গায় যা নামেননি!” একদা কলকারখানার শিল্পাঞ্চল ব‍্যারাকপুরের ‘বিরিয়ানিপুর’ হওয়ার পর্বান্তর নিয়েও রাজ বনাম কৌস্তভ তরজা অটুট। টিটাগড়ে মাঠকলের সভায় রাজ সরব (হিন্দিতে), ‘‘ভোট এলেই বিজেপি ইচ্ছে করে চটকলগুলো বন্ধ করায়, যাতে তৃণমূলেরবদনাম হয়। আমি মালিকদের সঙ্গে কথা চালাচ্ছি। ভোটের আগে বকেয়া মিটিয়ে কারখানা না খুললে আমার সঙ্গে জীবনভর দুশমনি থাকবে।” কৌস্তভেরও অভিযোগ, “কারখানার মজুরেরা সব বিজেপির ভোটার। তৃণমূলই ইচ্ছে করেকারখানা বন্ধ করিয়ে ওদের মুশকিলে ফেলছে।” তাঁর অভিযোগ, টিটাগড় পেপার মিলের জমি পর্যন্ত শাসকদল কোন নির্মাতাকে বেচেছে।

অনেকে বলেন, ২০২১ সালে তৃণমূলের টলিউডি প্রার্থীদের মধ্যে সব থেকে কঠিন আসনে রাজকেই লড়তে পাঠান দিদি। ২০১৯ সালেবিজেপির অর্জুন সিংহের জয়ী লোকসভা আসনে পিছিয়ে থাকা ব‍্যারাকপুর বিধানসভা পুনরুদ্ধারই শুধু নয়, পাঁচ বছরে টিটাগড়ে অর্জুনের খাসতালুকেও চোখে চোখ রেখে রাজ লড়ছেন।

টিটাগড়ে তৃণমূলের ছত্রচ্ছায়ায় দুষ্কৃতী-সংস্রব নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। রাজ তাতে নিরুত্তাপ! তাঁর সোজা ব‍্যাটে জবাব, “ক্রিমিনালকে সংশোধনের সুযোগ দিতে পুর ভোটের টিকিট দিয়েছি। এলাকায় অপরাধ কমে ছিটেফোঁটা। সক্কলে সমাজসেবা করছে।” রাজের দাবি, টিটাগড়ে গত লোকসভা ভোটেও পার্থ ভৌমিক অর্জুন সিংহের থেকে পিছিয়ে থাকলেও এ বার লিড আসছে! মাঠকলে তেজস্বী যাদবের সভায় টিটাগড়ের পুরপ্রধান কমলেশ সিংহ এবং রাজ মিলে অর্জুন-অনুগামীদের ভোটের দিন শান্ত থাকার হুঁশিয়ারিও দিচ্ছেন! প্রবল হাততালির মধ‍্যে রাজের ‘মধুর’ হুমকি, “ভোটের দিন বাড়াবাড়ি করলে কিন্তু ৪ মে-র পরে ভালবাসা একটু বেশি হবে। ধরে ধরে গলায় মালা পরাব।”

এই তরজায় ইংরেজির কলেজ শিক্ষক, সিপিএমের সুমন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মার্জিত স্বর খানিক চাপা পড়ছে। ‘সেভ ডেমোক্রেসি মঞ্চের’ গণ আন্দোলন কর্মী, স্থানীয় বাসিন্দা সুমন অটোয় করে পাড়ায় ঘুরছেন। ব‍্যারাকপুরের নিকাশি, স্টেশনের ভাঙাওভারব্রিজ, হাসপাতালের খামতি নানা দিক নিয়ে সরব। পুরনো কংগ্রেসকর্মী, প্রার্থী শম্ভু দাসের দাবি, “আমিও লড়াইয়ে আছি!”

তৃণমূলের মূল শক্তি ব‍্যারাকপুর পুর এলাকায় ঘুরলে কিন্তু হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ছবিটাও স্পষ্ট হয়। ব‍্যারাকপুরের পুরপ্রধান উত্তম দাসের দাবি, ব‍্যবধান বাড়বে। তবেমমতাকে সরানোর শপথ নিয়ে মুণ্ডিতকেশ কৌস্তভের মাথায় মাসিমা, দিদিমারাও হাত বুলিয়ে আদর দিচ্ছেন। প্রতিষ্ঠান-বিরোধী হাওয়ার বিপ্রতীপে বিজেপির ‘অনৈতিক এসআইআর’, ‘ধর্ম নিয়ে রাজনীতি’কে দুরমুশের চেষ্টা রাজও মরিয়াভাবে চালাচ্ছেন। বোঝাচ্ছেন, “যেখানেই থাকি, এই কেন্দ্র সর্বদা হৃদয়ে আমার।”

ভোটযুদ্ধের এই কুশীলবদের মধ‍্যে এক পিতামহ ভীষ্মের ছায়াও প্রবল। বয়স কত হল, জানতে চাইলে প্রাক্তন সাংসদ তড়িত তোপদার বলেন, “বেশি নয়…৮৬! ” সব প্রার্থীই তাঁর পরিচিত, আশীর্বাদ প্রত‍্যাশী। তবে তড়িত সিপিএম প্রার্থীকে নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে বলেন, “ভীষ্মের কাছে সবাই এলেও তিনি নিজের অবস্থানে অটল ছিলেন। আমিও তাই! তবে এত মিথ‍্যা প্রতিশ্রুতির সঙ্গে যুদ্ধটা আসলে অসম।”

ব‍্যারাকপুরে রাজ না কৌস্তভ, কার বিরিয়ানি কেমন পাকবে, চর্চা চলছে! দেশের রাজনীতির শরশয্যা কাঁটায় ক্ষতবিক্ষত এক ভীষ্ম যুদ্ধের আগেই জখম।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal Politics Barrackpore

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy