E-Paper

দুয়ারে প্রার্থী, কিন্তু জল মাপছে নোয়াপাড়া

আড়াই দশক আগে নোয়াপাড়া এক বার স্পর্শকাতর হয়েছিল। ১ এপ্রিল সকালে ইছাপুর স্টোর বাজারে গুলি করে খুন করা হয়েছিল যুব তৃণমূল নেতা বিকাশ বসুকে। ১৯৭৭ সাল থেকে টানা সিপিএমের দখলে থাকা এই কেন্দ্র ২০০১ সালে বামেদের ভরা জোয়ারে আচমকা ভাটার টান এনেছিল বিকাশ-হত্যায়।

বিতান ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৫৪

— প্রতীকী চিত্র।

ভোট এসেছে দুয়ারে, কিন্তু চার প্রার্থীর নাম ঘোষণার পর থেকেই ভোটারেরা কার্যত দর্শকের ভূমিকায়। প্রার্থীরা এলে হাসছেন, কথা বলছেন। কিন্তু পাড়ার ঠেক, নদীর ধারের সান্ধ্য আড্ডায় চায়ের কাপে তুফান তুলে ভোট-চর্চার চেনা ছবিটা এ বার নেই। কেন্দ্র, নোয়াপাড়া বিধানসভা। ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলে এই নির্বাচনে একটিমাত্র কেন্দ্র, যেখানে এ বার ভোটারেরা জল মাপছেন। আর তা প্রতিনিয়ত অনুভব করছেন চার প্রার্থী। প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহেই সুর মিলেছে চার জনের। বলছেন, ‘‘এই কেন্দ্রটি এ বার স্পর্শকাতর।’’

আড়াই দশক আগে নোয়াপাড়া এক বার স্পর্শকাতর হয়েছিল। ১ এপ্রিল সকালে ইছাপুর স্টোর বাজারে গুলি করে খুন করা হয়েছিল যুব তৃণমূল নেতা বিকাশ বসুকে। ১৯৭৭ সাল থেকে টানা সিপিএমের দখলে থাকা এই কেন্দ্র ২০০১ সালে বামেদের ভরা জোয়ারে আচমকা ভাটার টান এনেছিল বিকাশ-হত্যায়। অভিযোগের তির ছিল ব্যারাকপুরের আর এক দাপুটে তৃণমূল নেতা, প্রাক্তন সাংসদ তথা এ বার সেই নোয়াপাড়ারই বিজেপি প্রার্থী অর্জুন সিংহের দিকে। বিকাশ-হত্যায় অর্জুনের নাম লোকমুখে ছড়ালেও মামলার নিষ্পত্তি আজও হয়নি। তৃণমূলের টিকিটে ২০০১ সালে অর্জুন ভাটপাড়ায় বিধায়ক হয়েছেন আর বিকাশের স্ত্রী মঞ্জু বসু নোয়াপাড়ায়।

রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে মাঝে পালাবদল হলেও তৃণমূল প্রতি বারই বিকাশ-হত্যাকে ‘স্পর্শকাতর’ বিষয় করে নির্বাচনে নোয়াপাড়া কেন্দ্রে ভোট চেয়েছে। এ বার টিকিট বিলির ঠিক আগেই ধর্মতলার ধর্নামঞ্চে দলনেত্রীর কাছে গিয়ে মঞ্জু ‘অপমানিত’ হয়েছেন বলে অভিযোগ। তার পরেই রাজনৈতিক সন্ন্যাসের কথা জানিয়েছেন।

আড়াই দশকে নোয়াপাড়ার বহু প্রবীণ তৃণমূল নেতাই বিধায়ক পদপ্রার্থী হতে চেয়েছেন বার বার। এ বার মঞ্জু থাকছেন না বুঝে অনেকে চেষ্টা করলেও টিকিট পেয়েছেন তৃণমূল ছাত্র পরিষদের রাজ্য সভাপতি তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্য। সংবাদ ও সমাজমাধ্যমে পরিচিত মুখ হলেও নোয়াপাড়ার রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে কখনও ছিলেন না বলে দলেই তাঁকে ‘অপছন্দ’ অনেকের। ফলে, কিছুটা দায়সারা ভূমিকায় ভোট বাজারে অনেকে। কর্মীরা চাইছেন তরুণ নেতাকে। শিউলি, গারুলিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় এখনও পৌঁছতেই পারেননি তৃণমূল প্রার্থী। বহু জায়গায় লিফলেট বিলি হয়নি। প্রচারের দিন ঠিক করেও তা ভেস্তে গিয়েছে স্থানীয় নেতাদের সমন্বয়ের অভাবে। তৃণাঙ্কুরের কথায়, ‘‘যেখানে সভা, রোড-শোয়ের ব্যবস্থা করছেন স্থানীয় নেতারা, সেখানে যাচ্ছি। এলাকাবাসী চাইছেন অনুভব করছি। কর্মীদের উচ্ছ্বাস দেখছি। আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছতে হবে আমাদের।’’

গঙ্গার ধারে উত্তর ব্যারাকপুর, গারুলিয়া পুরসভা, ব্যারাকপুর ক্যান্টনমেন্টের কিছুটা অংশ আর মোহনপুর, শিউলি— এই দুই পঞ্চায়েত নিয়ে নোয়াপাড়া বিধানসভা কেন্দ্র। এই নোয়াপাড়ারই বিজেপি প্রার্থী অর্জুন সিংহ। বিকাশ বসুকে হত্যার কাঁটা তাঁকে কতটা অস্বস্তিতে ফেলেছে? গোটা বিধানসভা এলাকা ইতিমধ্যেই চষে ফেলেছেন। শাসক ও বিরোধী, সব ক’টি দলেরই ‘তৃণমূল’ স্তরের নেতাদের চেনেন। অর্জুনের দাবি, ‘‘ভোট এলে বিকাশ বসুর খুনের কথা তুলে ধরা হয়। আমাকে খুনি সাব্যস্ত করা হয়। অথচ যাঁরা খুন করিয়েছেন, তাঁদের এক জন মারা গিয়েছেন। অন্য জন এখনও তৃণমূল করেন। নির্বাচন মিটলে ওঁকেও ভুলে যাবে এই দল। এর অন্যতম উদাহরণ, মঞ্জুদিকে টিকিট না দেওয়া। নোয়াপাড়ার মানুষ কাজের মানুষকেই কাছে চাইবেন।’’

কংগ্রেসের প্রার্থী অশোক ভট্টাচার্য (রাজা) আর সিপিএমের গার্গী চট্টোপাধ্যায়, দু’জনেই নোয়াপাড়ার বাসিন্দা ও দীর্ঘদিন ধরে চটকলের শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের হাতিয়ার ‘বহিরাগত’ তত্ত্ব। দু’জনেরই বক্তব্য, তৃণমূল ও বিজেপি প্রার্থীরা স্বনামধন্য। তবে তাঁরা বহিরাগত। প্রচারেও বাইরে থেকে লোক আনতে হচ্ছে তাঁদের।

ছাত্র রাজনীতি থেকে শ্রমিক সংগঠন সামলে আসা পোড়খাওয়া রাজনীতিক অশোকের কথায়, ‘‘শুভেন্দু রায়, মধুসূদন ঘোষের মতো কাজের কংগ্রেসি নেতাদের দেখেছেন নোয়াপাড়াবাসী। এশিয়ার প্রথম যান্ত্রিক ইট কারখানা ছিল এখানেই। বহু কারখানা বন্ধ হয়েছে বাম ও তৃণমূল আমলে। মানুষ নিশ্চয়ই যথাযথ পদক্ষেপ করবেন ভোটবাক্সে।’’

জয় অনিশ্চিত, তা মানেন গার্গীও। সিপিএমের গড় বলে পরিচিত ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলে গার্গীও ছাত্র সংগঠন থেকে ট্রেড ইউনিয়নের লড়াকু নেত্রী। এর আগেও একাধিক বার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন গার্গী। হার না মানা চরিত্রের বাম নেত্রীর দাবি, ‘‘নোয়াপাড়ায় তৃণমূল ও বিজেপির প্রার্থী নির্বাচনের কারণে ভোটের হাওয়া ঘুরবেই। জিততে পারি বা না পারি, সেই হাওয়ায় সিপিএম ‘ফ্যাক্টর’ হবে, এটা নিশ্চিত।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Noapara West Bengal Politics West Bengal government

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy