রাস্তা ও আলোকে যদি উন্নয়নের মাপকাঠি ধরা হয়, তা হলে ক্যানিংয়ে উন্নয়ন প্রতিটি বাড়ির দাওয়া পর্যন্ত পৌঁছেছে। এর কিছুটা অবশ্যই পরীক্ষার আগে শেষ মুহূর্তের পড়াশোনার মতো। তবে পৌঁছেছে তো! মসৃণতার দিক থেকেও এই রাস্তা কলকাতাকে পাঁচ গোল দেবে। আবার দেওয়ালে দেওয়ালে জোড়া ফুল ছাড়া কিছু চোখে পড়ে না। তবু শাসকের বাড়তি উচাটন কেন?
এক দশক আগে পর্যন্ত ক্যানিং পূর্ব এবং আব্দুর রেজ্জাক মোল্লা সমার্থক ছিল। আর এখন শওকাত মোল্লা। তাঁকে পাশের হারা কেন্দ্র ভাঙড়ে প্রার্থী করেছে তৃণমূল। সঙ্গে ‘পুরস্কার’ হিসেবে জুটেছে অনুগামী বাহারুল ইসলামকে পার করানোর দায়। দলের কেউ কেউ বলছেন, শওকাতের সংগঠনের সাহায্যে প্রতিবেশী দুই কেন্দ্র ‘প্যাকেজ’ হিসেবে একসঙ্গে তোলার কৌশল নিয়েছে দল। কিন্তু জনপ্রিয় মত, শওকাতের ‘অওকাত’ দেখতে চাইছেন নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ক্যানিংয়ে শওকাত টিকিট না পাওয়ায় প্রথমে কর্মীরাই চমকে গিয়েছিলেন। ক্ষোভ ছড়িয়েছিল। বিধায়ক নিজেই তাঁদের বুঝিয়ে নিরস্ত করেন যে, সেখানকার মানুষ দু’জন প্রতিনিধি পাবেন। ব্যানার কিংবা সভামঞ্চের ছবিতেও তারই প্রতিফলন। শওকাতই শিরোনাম, বাহারুল ফুটনোট। মমতা যেমন ২৯৪টি আসনেই প্রার্থী, শওকাত তেমন দু’টিতে। পার্থক্যও আছে। মুখ্যমন্ত্রী বাকিদের জিতিয়ে নিজে হেরে গেলেও উপ-নির্বাচনে জিতে আসার সুযোগ ছিল। শওকাতের ক্ষেত্রে তেমন অঘটন হলে মুশকিল। উচাটনের এটা একটা কারণ। শওকাত তাই বাড়ি লাগোয়া দফতরে রোজ সকাল ৮টা থেকে হাজির। সেখানে ক্যানিং পূর্বের কৌশল নির্ধারণের বৈঠকে নির্দেশ দিচ্ছেন, ‘‘বুথ সভাপতি এবং পঞ্চায়েত মেম্বাররা উপরের ঘরে যাও। অন্য কেউ গেলে কিন্তু গোটাটাই ভেস্তে যাবে।’’ ভাঙড় পরের গন্তব্য।
বিধায়ক একের পর এক বলে যাচ্ছিলেন ক্যানিং-মৌখালি সেতু, পাম্পিং স্টেশন, ইংরেজি মাধ্যম মডেল মাদ্রাসা, তিনটি কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালিত বিদ্যালয়, জীবনতলা স্টেডিয়াম তৈরির কথা। আগের লোকসভা হোক কিংবা বিধানসভা— নির্বাচনের ফল দেখলে এই কেন্দ্র নিয়ে উদ্বেগ থাকার কথা নয়। কিন্তু চিন্তার কারণ একাধিক। একটা দিক বোঝা যাবে ক্যানিংয়ের এসডিও দফতরের চৌহদ্দি, সামনের রাস্তা এবং বাইরের বড় রাস্তায় চোখ রাখলে। থিকথিক করছে এসআইআর ট্রাইবুনালে আবেদন জমা দেওয়ার ভিড়। কাঠফাটা রোদে পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে এসে গন্তব্যের ৫০০ মিটার দূরে মুখ থুবড়ে পড়লেন ৬০ বছরের প্রবীণা আমিনা বিবি। লোকজন তোলার পরে বললেন, ‘‘মাথা ঘুরে গিয়েছিল বাবা। সেই এসআইআরের শুরু থেকে দৌড়ঝাঁপ চলছে।’’ লাইনে দাঁড়ানো আব্বাসউদ্দিন শেখ এবং আতিকুর মোল্লা জানাচ্ছেন, তাঁরা নিজেরা তো বটেই, বাড়ির আরও সদস্যদের নামও বাদ পড়েছে। প্রত্যেকেই লাইনে। ক্যানিং পূর্ব এবং ক্যানিং পশ্চিম থেকে ১১ হাজার করে নাম শুধু অ্যাজুডিকেশনেই বাদ গিয়েছে। সব মিলিয়ে সংখ্যাটা বিপুল। এঁদের ক্ষোভ হয়তো এ বারের ভোটে কাজে আসবে না। তবে ‘কী কারণে’ বাদ, তা বোঝানোর চেষ্টা চলছে বৈধ ভোটারদের। ক্যানিং পূর্বের বাহারুল এবং পশ্চিমের তৃণমূল প্রার্থী পরেশরাম দাস অবশ্য বলছেন, ‘‘এসআইআরে বিরোধীদের লাভহবে না।’’
লাভের কথা বিরোধীরাও মুখে বলছেন না। কিন্তু লাভের আশা হাওয়ায় ভাসছে। মুখে তাঁরা তুলে ধরছেন ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে মনোনয়ন ও ভোট দিতে না পারা এবং অশান্তিকে। শওকাতের প্রধান প্রতিপক্ষ আইএসএফের আরাবুল ইসলাম। দলীয় নেতৃত্ব বলছেন, ‘‘তৃণমূলের এখানকার সংগঠন আরাবুলের চেনা।’’ আরাবুলের অভিযোগ, ‘‘নির্বাচন কমিশন যা-ই বলুক না কেন, এখানে পুলিশ তৃণমূলের চামচাগিরি করছে। তবে লাভ হবে না।’’ এলাকায় কান পাতলেও শোনা যাচ্ছে, ছুপা আইএসএফ বাড়ছে। এমনিতে ধান চাষ, মাছ ধরা ছাড়া পেশা বিশেষ কিছু নেই। ভরসা সরকারি অনুদান আর নিখরচার রেশন। তাকেই কাজে লাগাতে চেয়ে জেন জ়ি-এর নেতা সেজেছেন তরুণ বিজেপি প্রার্থী অসীম সাঁপুই। তাঁর কথায়, ‘‘ধর্ম কেউ দেখছে না। মানুষ কাজ চায়।’’ যদিও ভোটের হার বাড়ানো ছাড়া বিশেষ ভূমিকা এখানে তাঁর দলের নেই।
ট্রেনে করে ক্যানিং স্টেশনে পৌঁছে গেলে যে শহরতলিতে পা পড়বে, তা আসলে পশ্চিম বিধানসভার অংশ। রাস্তা, প্রকাণ্ড বাস টার্মিনাস, সুইমিং পুল— অনেক কিছুই হয়েছে। যদিও পুরোটাই পঞ্চায়েত। অনেক জায়গা দেখলে মনে হবে, অনুন্নয়নের মাঝে উন্নয়ন ফুঁড়ে ফুঁড়ে উঠেছে বুঝি। বাজারের আবর্জনা নিয়মিত পরিষ্কার না হওয়ায় বিভীষিকার রূপ, সংস্কারহীন খাল রয়েছে মাঝেমধ্যে। বিধায়ক তথা তৃণমূল প্রার্থী বলছেন, ‘‘জিতে এসে ক্যানিংকে পুরসভা বানাব। আর গ্রামে সব বাড়িতে কলের জল পৌঁছবে। কাজ হয়েছে পুরসভার থেকে বেশি।’’ বিজেপি প্রার্থী প্রশান্ত বায়েন বলছেন, ‘‘দীর্ঘদিন ধরেই সরকার আর বিধায়ক তৃণমূলের। তা হলে পুরসভা হয়নি কেন? পুরসভা তো আমরাএসে করব।’’
মগরাহাট পশ্চিমে দীর্ঘদিনের বিধায়ক তথা মন্ত্রী গিয়াসউদ্দিন মোল্লার বদলে তৃণমূল এ বার প্রার্থী করেছে তরুণ শামিম আহমেদকে। তিনি অভিষেকের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। ভোট বাজারের আলোচনা, প্রার্থী বদল আসলে তৃণমূলে প্রজন্ম বদলেরই প্রতিফলন। সেচ, বিদ্যালয় ভবনের অবস্থা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা-সহ অভিযোগ এখানে কম নেই। কিন্তু ভোটদাতাদের প্রশ্ন, বিজেপি প্রার্থী গৌরসুন্দর ঘোষের তা নিয়ে যথেষ্ট প্রচার কোথায়? প্রার্থীর নিজের অবশ্য দাবি, সব জায়গায় এখনও পৌঁছনো না গেলেও প্রচার চলছে। এখানে উস্তিতে নাইনান খালের উপরে লালপোল সেতু ‘বিখ্যাত’। এই খ্যাতি গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে তার দুর্দশার জন্য। উস্তির মানুষ বলছেন, দু’দিকের ৫০-৬০ হাজার মানুষ এর জন্য ভুক্তভোগী। বহু বার খবর হয়েছে, কিন্তু কাজ হয়নি। শামিম জানেন, এই সমস্ত সমস্যা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। কিন্তু জবাব তাঁকেই দিতে হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, ‘‘এই বিধানসভায় তৃণমূলের কো-অর্ডিনেটরের দায়িত্বে আসার পরে বহু মানুষ উস্তি সেতু নিয়ে আমাকে জানিয়েছেন। সাংসদকে (অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়) বিষয়টি জানাই। তাঁর প্রচেষ্টায় পদক্ষেপ শুরু হয়েছে। দরপত্রও হয়ে গিয়েছে। ভোটের পরেই কাজ শুরু হবে।’’ বাকি সমস্যারও সমাধান হবে বলেআশ্বাস তাঁর।
মগরাহাট পূর্বে মূলত রাস্তাঘাটের অবস্থা, কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগের সমস্যা নিয়ে শাসকের বিরুদ্ধে প্রচার করছেন বিরোধীরা। বিজেপি প্রার্থী উত্তম বণিক বলছেন, ‘‘মগরাহাট স্টেশন থেকে যে রাস্তা বাকি এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করেছে, তার অবস্থা খুব খারাপ। রাস্তা বছরের পর বছর বেহাল।’’ এখানে সিপিএমের ১৫-২০ শতাংশ ভোট এখনও আছে। মূল লড়াই তা বাড়ানোর। চন্দন সাহা পুরনো প্রার্থী। তিনিও পরিবহণের অব্যবস্থা নিয়ে প্রচারে নেমেছেন। বলছেন পানীয় জল, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের উন্নতি, খাল সংস্কারের কথা। তিন বারের বিধায়ক নমিতা সাহাকে সরিয়ে শর্মিষ্ঠা পুরকায়েতকে প্রার্থী করেছে তৃণমূল। তিনি বিরোধীদের অভিযোগকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তাঁর কথায়, ‘‘কাজ অনেক হয়েছে।’’
এসআইআর হোক কিংবা প্রতিষ্ঠান বিরোধী স্রোত, পাটিগণিতের হিসাবে ব্যবধান কমেছে চারটি কেন্দ্রেই। ফলে দৌড়তে হচ্ছে শাসককে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)