গত লোকসভা ভোটে নরেন্দ্র মোদীর উত্থানের পরে অনেক বিদেশি পত্রিকায় লেখা হয়েছিল, ‘ভারতের প্রথম সোশ্যাল মিডিয়া প্রধানমন্ত্রী’। পরিস্থিতি বদলেছে। আক্রমণের খোঁচায় সেই মোদীই সোশ্যাল মিডিয়ার কার্যকলাপ নিয়েই এখন রীতিমতো বিরক্ত। দাদরি কাণ্ড হোক বা হায়দরাবাদে ছাত্র আত্মহত্যা— সবেতেই তাঁর সমালোচনা করে এখন সক্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া। কিন্তু কেবল বিজেপি কেন, মাধ্যমটির জনপ্রিয়তার কারণেই, এ বার বিধানসভা ভোটেও সেই সোশ্যাল মিডিয়াকেই মাধ্যম করে রাজনৈতিক দলগুলি প্রচারে নেমেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার-ঝড়ের কম-বেশি দাপট রাজ্য ছেড়ে এখন জেলাতেও। বাদ নেই বীরভূমও।
জেলা সিপিএম তাদের বীরভূমের ফেসবুক পেজে গেলে অসংখ্য ছবি দেখা যায়, যেগুলো সারদা থেকে নারদা, রাজ্যে ক্ষমতাসীন তৃণমূল সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও ইস্যু নিয়ে বিদ্রুপ, আক্রমণ, কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন সরকারকে কটাক্ষ, কোথাও জোট বার্তার কথা বলা হয়েছে। কোনটিতে লেখা, ‘‘দুষ্ট রাজা, মিথ্যে রানি/ ছাড়ছে ফানুস, লুঠছে মানি/ ফুঁসছে মানুষ, বলছে এবার সময় সুযোগ পাল্টে দেবার।’’ কোনওটিতে, ‘‘যাদের কাছে শিল্প মানে তেলেভাজা, লন্ডন মানে সাদা নীল রঙ আর ত্রিফলা আলো, তারা করবে শিল্পায়ন? ধুস! অনেক হল বদলে ফেলো।’’
সিপিএমের নেতা কর্মীরা বলছেন, দামি রঙ ব্যবহার করে একটি দেওয়াল লেখার খরচ যথেষ্টই। সেই খরচ বিরোধীদের পক্ষে করা সম্ভব নয় সবক্ষেত্রে। মূলত নীল, লাল, কালো প্রাথমিক রঙের ব্যবহারের বেশিরভাগ দেওয়াল লিখন হচ্ছে বা হয়েছে। যা শাসকদলের প্রার্থীদের দেওয়াল লিখনের পাশে কিছুটা ম্যাড়মেড়ে সন্দেহ নেই। দ্বিতীয় কারণ, দেওয়ালের দখল। বাম শরিকদলের প্রার্থী ফব-র বিজয় বাগদি বলছেন, ‘‘নির্বাচন ঘোষণার পর দেখছি প্রচারের জন্য দেওয়াল-ই অবশিষ্ট নেই। যে দেওয়াল আমাদের ব্যবহারের জন্য চিহ্নিত ছিল সেই দেওয়ালেও শাসকদলের প্রচার!’’ দেওয়াল লিখনে সেই কারণেই পিছিয়ে থাকার কথা স্বীকার করে নিয়েছেন জেলা সিপিএম নেতৃত্ব। সিপিএমের জেলা সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য যাঁর তত্ত্বাবধানে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার চলছে সেই দীপঙ্কর ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘অস্বীকার করার উপায় নেই, দেওয়াল লিখনে আমরা পিছিয়ে। দেওয়াল লিখতে হলে সেই গৃহস্বামীর অনুমতি লাগে। নির্বাচন ঘোষণার পর যখন নিয়ম মেনে এগোতে গেলাম, দেখলাম কোথাও অনুমতি নিয়ে, কোথাও না নিয়েই দেওয়াল লিখেছে শাসকদল। কেউ অশান্তির ভয়ে মুখ খোলেননি। আমরাও বিতর্কে যাইনি।’’
দোলের শুভেচ্ছা জানিয়ে লকেটের বার্তা। —নিজস্ব চিত্র
বীরভূমে সিপিএমের শুধু একটি পেজ-ই নয়, প্রতিটি বিধানসভার জন্য আলাদা করে পেজ করার কথা রয়েছে। দীপঙ্করবাবু জানান, সোশ্যাল মিডিয়ার গুরুত্ব বুঝে দল এখন তাকে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রামচন্দ্র ডোম বলেন, ‘‘সোশ্যাল মিডিয়ার গুরুত্ব রয়েছে। সেটা বুঝেই ভোটে আমরা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছি।’’ সিপিএম সূত্রে খবর, ভোটে ১৫০০ হাজারের বেশি বুথে কর্মীরা বুথ রিপোর্টার হিসাবে কাজ করছেন প্রতিমুহূর্তে যে কোনও ধরনের খবরাখবর ও অভিযোগ পাওয়ার জন্য। এছাড়াও একাধিক বামপন্থী পেজ যেমন ‘হাওয়াই হাওয়াই’, ‘সময়ের কন্ঠস্বর’, ‘হীরক রাজার দেশে’, ‘মানুষের সাথে মানুষের পাশে’ ও প্রচুর হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপ রয়েছে প্রতিনিয়ত শাসকদলের বিরুদ্ধে প্রচার করতে। সেই সমস্ত গ্রুপে তুঙ্গ প্রচার শুরু হয়েছে এ বার।
শাসকদলের তরফে যাঁরা ভোটের ময়দানে, তাঁদের অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে ফেসবুক-হোয়াটস অ্যাপ ব্যবহার করেন। কিন্তু তৃণমূলের পক্ষে থেকে গোটা জেলা ব্যাপী সংগঠিতভাবে এমন কোনও উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি বলে জানাচ্ছেন তৃণমূল নেতৃত্ব। তাঁদের যুক্তি, ‘‘সোশ্যাল মিডিয়ার গুরুত্ব অস্বীকার না করেও বলা ভাল যাদের সঙ্গে এত মানুষের যোগাযোগ, তাঁদের এ সবের প্রয়োজন নেই!’’
শাসকদল তৃণমূল যাই ভাবুক, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারে বামেদের মতোই এ গিয়ে বিজেপি। বিজেপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেওয়াল লিখন হচ্ছে ঠিকই, তবে সেটা অনেক পরে শুরু হয়েছে। তাই জোর প্রচার চলছে সাইবার দুনিয়ায়। জেলা ও বিধানসভা এবং ব্লক বা মণ্ডল স্তরে একজন করে কর্মীকে আইটি প্রমুখ বেছে ফেসবুক পেজ, হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপ তৈরি হয়েছে। রয়েছে প্রতিটি বিধানসভার জন্য আলাদা পেজ ও হোযাটস অ্যাপ গ্রুপ। যেখানে বন্ধু ও তাঁদের বন্ধুদের বলা আছে যথাসম্ভব বেশি সংখ্যক মানুষকে এতে যোগ করার জন্য। সেখানে যেমন দলীয় প্রার্থীকে ভোটে জেতানোর আবেদন থাকছে, তেমনই থাকছে শাসকদলের বিরুদ্ধে প্রচার।
বিজেপির আইটি সেলের দায়িত্ব থাকা এককর্মী কৃষাণু সিংহ বলেন, ‘‘প্রচারের জন্য পোস্ট রয়েছে, থাকছে ভিডিও ক্লিপিং। এর পর প্রতিটি মোবাইলে বাংলা ও ইংরাজীতে মেসেজ পাঠিয়ে প্রচার চলবে।’’
ময়ূরেশ্বর বিধানসভা কেন্দ্রের প্রার্থী লকেট চট্টোপাধ্যায় আরও একধাপ এগিয়ে বলেন, ‘‘আমার নিজের পেজেও চলছে প্রচার। খব ভাল সাড়া পেয়েছি, বিধানসভা কেন্দ্রের প্রত্যন্ত এলাকার মনুষজন তাঁদের সুবিধা অসুবিধা মতামত জানাচ্ছেন। আমার নম্বর দেওয়া থাকায় সরাসরি আমাকে ফোন করে সমস্যার কথা বলছেন।’’ পিছিয়ে নেই কংগ্রেসও। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার চালাচ্ছেন নলহাটির ফব প্রার্থী দীপক চট্টোপাধ্যায় বা কংগ্রেস প্রার্থী মিল্টন রশিদ ও সৈয়দ সিরাজ জিম্মি। দলের উদ্যোগ যেমনই হোক, তালিকায় নাম রামপুরহাটের তৃণমূল প্রার্থী আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়েরও।