Advertisement

নবান্ন অভিযান

কেউ মার খেলেন, কেউ ভোট দিতেই পারলেন না, প্রথম দফার নজরকাড়া প্রার্থীদের কেউ আবার দিনভর বেরোলেনই না বাড়ি থেকে

দিনভর নজরে ছিলেন প্রথম দফার নজরকাড়া প্রার্থীরা। তাঁরা কে কী করলেন সারা দিন, তা নিয়ে কৌতূহল ছিল। দেখা গেল, তাঁদের মধ্যে কেউ মার খেলেন। কেউ আবার নিজেকে দিনভর বাড়িতেই ‘বন্দি’ করে রাখলেন।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ ২১:৪৭
What did the key candidates do throughout the day on the first phase of voting

(বাঁ দিক থেকে) হুমায়ুন কবীর, অগ্নিমিত্রা পাল, বায়রন বিশ্বাস এবং মৌসম বেনজির নুর। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

বিক্ষিপ্ত কিছু অশান্তির ঘটনা ছাড়া পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফার ভোট মোটের উপর শান্তিপূর্ণ ভাবেই মিটেছে। সকাল থেকে বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা— ১৬ জেলার ভোটে নানা ছবি দেখা গেল। সেই সঙ্গে দিনভর নজরে ছিলেন প্রথম দফার নজরকাড়া প্রার্থীরা। তাঁরা কে কী করলেন সারা দিন, তা নিয়ে কৌতূহল ছিল। দেখা গেল, তাঁদের মধ্যে কেউ মার খেলেন। কেউ আবার নিজেকে দিনভর বাড়িতেই ‘বন্দি’ করে রাখলেন। শেষবেলায় জানা গেল, কেউ আবার ভোটই দিতে পারলেন না! তবে মোটের উপর সব প্রার্থীই নিজের কেন্দ্রে বিভিন্ন বুথ চষে বেড়ালেন। তার মাঝেই সেরে নেন মধ্যাহ্নভোজন।

দিনভর নন্দীগ্রাম আঁকড়ে ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। নিজের গড় রক্ষা করতে ছুটেছেন নানা প্রান্তে। নন্দনায়কবাড় এলাকার ভোটার তিনি। সকাল সকাল নিজের বুথে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। ভোট দিয়ে বেরিয়েই আত্মবিশ্বাসী শুভেন্দুকে বলতে শোনা যায়, ‘‘এ বার পরিবর্তন আসছে।’’ বেলা যত গড়িয়েছে, তাঁর সুরে আত্মবিশ্বাসের তেজ বেড়েছে। সূর্য যখন মধ্যগগনে তখন শুভেন্দু বলেই দিলেন, “শুধু পূর্ব মেদিনীপুরের মধ্যে আমাকে আটকে রাখবেন না। ১৫২টা আসনের মধ্যে ১২৫-এর নীচে বিজেপির নামার কোনও জায়গা নেই।’’ তবে পুলিশের বিরুদ্ধেও ক্ষোভ উগরে দিতে দেখা যায় বিরোধী দলনেতাকে। পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলার ওসির অপসারণের দাবি তুলতে শোনা যায় তাঁকে।

রায়গঞ্জের তৃণমূল প্রার্থী স্বপ্না বর্মণ হোক বা শিলিগুড়ির তৃণমূল প্রার্থী গৌতম দেব কিংবা বিজেপি প্রার্থী শঙ্কর ঘোষ— প্রত্যেকেই ভোটের দিনটা শুরু করেছেন কালীমন্দিরে পুজো দিয়ে। বাড়ির কালীমন্দিরে পুজো দিয়ে সোনাজয়ী অ্যাথলিট স্বপ্না দিন শুরু করেন। তার পরেই সপরিবার ভোট দেন। ভোট দিয়েই বেরিয়ে পড়েন বুথ পরিদর্শনে। রাজগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের বিভিন্ন বুথ ঘুরে দেখেন। কথা বলেন ভোটারদের সঙ্গে। ভোটদানের হার কেমন, কোথাও ইভিএমের সমস্যা রয়েছে কি না সেই সব খতিয়ে দেখেন। যে সব অভিযোগ পেয়েছেন, সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছেন স্বপ্না।

Advertisement

স্বপ্নার মতোই শিলিগুড়ির তৃণমূল এবং বিজেপি প্রার্থী গৌতম দেব ও শঙ্কর ঘোষ দিনের শুরুতেই কালীমন্দিরে পুজো দেন। তবে দু’জনের দিন কাটে দু’রকম ভাবে। গৌতম সারা দিনে বার বার বাধার মুখে পড়েন। অভিযোগ, তাঁকে বুথে ঢুকতে বাধা দিয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। ভোটপর্বের শেষলগ্নেও একই ছবি দেখা যায়। তবে তার মাঝেই শিলিগুড়ি জুড়ে জয়ের আত্মবিশ্বাস নিয়ে ঘুরে বেড়ান তিনি। মাঝেমধ্যেই বচসায় জড়িয়ে পড়তে দেখা যায় গৌতমকে। সৃষ্টি হয় উত্তেজনার। শেষে ‘কুইক রেসপন্স টিম’ এবং প্রশাসনের তৎপরতায় তা প্রশমিত হয়। বচসা, অশান্তি সব কিছু সামাল দিতে দিতে এক ফাঁকে মুড়ি, ছোলা, শশা দিয়ে মধ্যাহ্নভোজন সারেন শিলিগুড়ি পুরসভার মেয়র।

সকাল থেকেই নিজের কেন্দ্র শিলিগুড়ির বিভিন্ন বুথে ঢুঁ মারেন শঙ্কর। কোথাও কোনও অভিযোগ পেলে সঙ্গে সঙ্গে কমিশনকে জানিয়ে পদক্ষেপের আর্জি জানান। শিলিগুড়ির বেশ কয়েকটি জায়গায় ইভিএমের সমস্যার ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। খবর পাওয়ামাত্রই সেখানে পৌঁছে গিয়েছেন শঙ্কর। তার মাঝেই সকাল ১০টা নাগাদ নিজের বাড়ির কাছের বুথে সস্ত্রীক ভোটটাও দিয়ে দেন। তাঁর কেন্দ্রের ২৩৫ নম্বর বুথে এক জনের ভোট অন্য জনের নামে পড়ছে বলে অভিযোগ ওঠে। সেই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতেও দেখা যায় শঙ্করকে। যদিও বিকেল পর্যন্ত ওই ভোটারের সমস্যার সমাধান হয়নি। এত কিছুর মাঝে রাস্তাতেই দুপুরের খাবারটা সেরে ফেলেন শিলিগুড়ির বিজেপি প্রার্থী।

মালদহের মালতীপুরের কংগ্রেস প্রার্থী মৌসম বেনজির নুরের দিকেও নজর ছিল অনেকের। ভোটের আগে তৃণমূল ছেড়ে নিজের পুরনো দলে ফিরে যান তিনি। সেই মৌসম সকাল সকাল দাদা ঈশা খান চৌধুরীর সঙ্গে যান গনি খান চৌধুরীর কবরস্থানে। সেখানে প্রার্থনা সারেন। তার পরে ভোট দিয়ে চলে যান নিজের কেন্দ্র মালতীপুরে। তিনি মনে করেন, ‘‘যে কোনও নির্বাচনই চ্যালেঞ্জের। তবে জেতার ব্যাপারে আমি আশাবাদী।’’ কমিশনের ব্যবস্থাপনায় খুশি মৌসম। মালতীপুরের জালালপুর, গোবিন্দপাড়ার মতো তৃণমূলের শক্তঘাঁটিগুলি ঘুরে দেখেন তিনি। ভোটারদের খবরাখবর নেন।

কোচবিহারের দিনহাটায় সকাল থেকেই ময়দানে সেখানকার তৃণমূল প্রার্থী উদয়ন গুহ। সকাল সকাল পুত্র, পুত্রবধূদের সঙ্গে নিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে বেরিয়ে পড়েন বিভিন্ন বুথ পরিদর্শনে। দিনভর ঘুরে বেড়ান, কথা বলেন ভোটারদের সঙ্গে। টুকটাক আলোচনা সারেন দলের কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গেও। আবার পুলিশের বিরুদ্ধে মেজাজ হারাতেও দেখা যায় দিনহাটার বিদায়ী বিধায়ককে। কোচবিহারের মাথাভাঙার বিজেপি প্রার্থী নিশীথ প্রামাণিকের বিরুদ্ধে টাকা বিলির অভিযোগ ওঠে। যদিও সেই সব অভিযোগ ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। সকাল থেকেই মাথাভাঙা বিধানসভায় ঘুরেছেন। সময় কাটিয়েছেন চা-বাগানেও। দিনভর ঘুরে ভোটপর্বের শেষলগ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী।

বৃহস্পতিবার দিনভরই খবরে ছিলেন আম জনতা উন্নয়ন পার্টির (এজেইউপি) চেয়ারম্যান তথা রেজিনগর এবং নওদার প্রার্থী হুমায়ুন কবীর। নিজের বিধানসভা কেন্দ্রের বিভিন্ন জায়গায় যেতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। তবে বার বার বাধা, বিক্ষোভের মুখে পড়েছেন। নওদা থানা এলাকার শিবনগর গ্রামে গিয়ে ‘গো ব্যাক’ স্লোগান শুনতে হয় তাঁকে। সেখানেই তার উপর ‘হামলা’ করা হয় বলেও অভিযোগ ওঠে। তাঁর কনভয়ের গাড়িতে ভাঙচুরও হয়। এই সব ঘটনার প্রতিবাদে রাস্তাতেই চেয়ার পেতে বসে পড়তে দেখা যায় হুমায়ুনকে।

মুর্শিদাবাদের বহরমপুরের কংগ্রেস প্রার্থী অধীর চৌধুরীর দিকেও নজর ছিল। প্রচারের সময় তাঁকে অনেক বারই বাধা, বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছে। তবে নির্বাচনের দিন সকাল থেকেই বিভিন্ন বুথে ঘুরেছেন। যদিও দিনভর তাঁর যা টুকরো টুকরো ছবি প্রকাশ্যে এসেছে তাতে বলা চলে স্বমেজাজেই ছিলেন অধীর। চোখেমুখে ছিল আত্মবিশ্বাসের ছাপ। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। তবে দিনের শেষে তাঁর পোলিং এজেন্টকে মারধরের অভিযোগ পেয়ে কিছুটা মেজাজ হারাতে দেখা যায় অধীরকে।

সকাল থেকে ফুরফুরে মেজাজে ছিলেন খড়্গপুর সদরের বিজেপি প্রার্থী দিলীপ ঘোষ। প্রতি দিন প্রাতর্ভ্রমণ করতে দেখা যায় তাঁকে। এ দিনও তাঁর অন্যথা হয়নি। তবে নিজের বাংলোর ভেতরেই প্রাতর্ভ্রমণ সারেন দিলীপ। তার পরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ভোট দেন। তবে অন্যদের মতো প্রায় সব বুথে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়নি দিলীপকে। ভোটদানের পর তিনি বলেই দিয়েছিলেন, ‘‘আপাতত বাড়িতেই থাকব। কোথাও সমস্যা হলে, তখন আমি যাব।’’ নিজের এলাকার এক দোকানে জলখাবার খান তিনি। তার পরে কয়েকটি বুথ ঘোরেন। শেষবেলায় রাজনীতির সৌজন্যের টুকরো ছবি দেখা যায় খড়্গপুর সদরে। বিকেলে একটি বুথে দিলীপের সঙ্গে মুখোমুখি হন তৃণমূলের প্রার্থী প্রদীপ সরকার। দেখা হতেই হাসিমুখে হাত মেলান দুই প্রার্থী। প্রদীপকে পাশে নিয়ে দিলীপ বললেন, “এটাই আমাদের রাজনীতি।’’

দিলীপের মতোই পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশপুরের তৃণমূল প্রার্থী শিউলি সাহাকেও বেশি বুথে ঘুরতে দেখা যায়নি। দিনের বেশির ভাগ সময়ই নিজের কার্যালয়ে বসে ছিলেন। দলীয় কর্মীদের সঙ্গে বিভিন্ন বুথের খবরাখবর নেন। সেই ফাঁকেই কার্যালয়ে বসে দুপুরের খাবার খান শিউলি। পশ্চিম মেদিনীপুরের আর এক কেন্দ্র সবংয়ের তৃণমূল প্রার্থী মানস ভুঁইয়া সকাল থেকেই ব্যস্ত ছিলেন ফোনে। স্নান পুজো সেরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথমেই ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন তিনি। শিউলির মতোই নিজের কার্যালয়ে বসে দিনভর ভোটের দিকে নজর রাখেন মানস। ডেবরার তৃণমূল প্রার্থী রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়কেও দিনভর নিজের কেন্দ্রে ঘুরতে দেখা যায়। একই ভাবে বিভিন্ন বুথে ঘুরে বেড়িয়ে ভোটের দিনটা কাটান ঝাড়গ্রামের বিনপুরের তৃণমূল প্রার্থী বিরবাহা হাঁসদা।

ডোমকলের তৃণমূল প্রার্থী আর এক হুমায়ুন কবীরকে নানা অভিযোগে বিদ্ধ হতে হয়। তাঁকে ঘিরে উত্তেজনা ছড়ায়। ভোটারদের প্রশ্নের মুখেও পড়েন। তবে দিনের শেষে বিরোধীদের সব অভিযোগ উড়িয়ে প্রাক্তন আইপিএস বলেন, ‘‘সাজানো ঘটনা।’’

অন্য দিকে, পাণ্ডবেশ্বরের বিজেপি প্রার্থী জিতেন্দ্র তিওয়ারি নিজের বাড়িতেই ‘ওয়ার রুম’ তৈরি করে ফেলেছিলেন। সেখান থেকেই ভোটের পরিস্থিতির উপর নজর রাখেন। আর আসানসোল দক্ষিণের বিজেপি প্রার্থী অগ্নিমিত্রা পালের দেখা মিলল ‘রণংদেহি’ মেজাজে। তাঁর গাড়িতে ভাঙচুরের অভিযোগও ওঠে।

তবে ভোটের প্রার্থী হয়ে নিজেই ভোট দিতে পারলেন না সাগরদিঘির তৃণমূলের বায়রন বিশ্বাস। শেষলগ্নে নিজের বিধানসভার শমসেরগঞ্জে ভোট দিতে গিয়ে ফেরত আসতে হয় তাঁকে। নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে যাওয়ায় তাঁকে আর ভোট দিতে বুথে ঢুকতেই দেওয়া হয়নি।

সংক্ষেপে
  • রবিবার মধ্যরাত থেকে শুরু হয়েছিল। রাজ্যের বেশ কয়েক জন আমলা এবং পুলিশ আধিকারিককে তাঁদের পদ থেকে অপসারণ করে নির্বাচন কমিশন। বুধবার রাত পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল। সেই সব পদে নতুন আধিকারিকও নিয়োগ করে দেওয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, কমিশন স্পষ্ট জানায়, যাঁদের অপসারণ করা হচ্ছে, তাঁদের এ রাজ্যে নির্বাচন সংক্রান্ত কোনও কাজে আপাতত আর নিয়োগ করা যাবে না!
  • পশ্চিমবঙ্গের ভোটের ক্ষেত্রে কমিশনের এই ‘সক্রিয়তা’ নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছে শাসকদল তৃণমূল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এ ভাবে অপসারণের পদক্ষেপে অসন্তোষ প্রকাশ করে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠিও লেখেন। চিঠিতে তিনি অভিযোগ করেন, রাজ্য সরকারের সঙ্গে আগাম কোনও আলোচনা না-করে বা কোনও মতামত না-নিয়ে বদলি করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, অতীতে নির্বাচন চলাকালীন কোনও গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা আধিকারিককে সরানোর প্রয়োজন হলে কমিশনের পক্ষ থেকে সাধারণত রাজ্য সরকারের কাছে তিন জনের একটি প্যানেল চাওয়া হত। সেই তালিকা থেকে কমিশন নিজেই এক জনকে বেছে নিত। মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, এ বার সেই প্রচলিত রীতির সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম ঘটেছে। প্রার্থিতালিকা ঘোষণার আগেও কমিশনকে এ বিষয়ে তোপ দাগেন মমতা। নিশানা করেন কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকেও।
TMC BJP Congress
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy