এ যেন ‘ভূত’ বনাম ভোটারের লড়াই!
সল্টলেকের বাসিন্দাদের অনেকেরই অভিযোগ, ভোটের দিন যেন তল্লাটে ভূতের আনাগোনা বাড়ে। এক প্রবীণ বাসিন্দা যেমন বলছেন, ‘‘ভোট দিতে গেলাম। লাইনে আমার আগে কেউ ঢোকেননি। অথচ, ঘরের ভিতর থেকে ভোটযন্ত্রের বিপ-বিপ আওয়াজ ভেসে আসছিল! কাউকে তো দেখলাম না। তবে কি ভূতে ভোট দিচ্ছিল?’’
তবে কেউ কেউ এ-ও বলছেন, ‘‘নির্বাচন কমিশন এ বার কড়া মনোভাব দেখাচ্ছে। মনে হয়, ভূতেরা বুথে ঢোকার সাহস করবে না।’’ ১১৬ বিধাননগর বিধানসভা কেন্দ্রের নির্বাচনে ‘ভূত’ ঢুকবে কিনা, তা নিয়ে ছক কষছেন রাজনৈতিক দলের কর্মীরাও। সরাসরি কেউই সে কথা স্বীকার না করলেও বাসিন্দাদের অভিযোগ, ‘‘ভূতের ট্র্যাডিশন আগেও ছিল। গত দেড় দশকে তা লাগামছাড়া হয়েছে।’’
এখানেই প্রশ্ন, ‘ভূত’ উধাও হলে কি এই কেন্দ্রের ‘ট্র্যাডিশন’ উল্টে যেতে পারে? তৃণমূল নেতা-কর্মীদের কথায়, ‘‘ও সব বাজে কথা। মানুষ উন্নয়ন দেখছেন, ২৪ ঘণ্টা পাশে থাকতে দেখেছেন। তাই মানুষই ভোট দিয়ে জেতান।’’ বামেরা বলছেন, ‘‘মানুষ-ভোটার যদি ভোট দিতে পারতেন, তবে আমাদের দিকেই পাশা উল্টে দিতেন।’’ ভূত ঠেকিয়ে জয় নিশ্চিত করতে চাইছে বিজেপি। কংগ্রেস বলছে, মানুষ সব দেখছেন। তাঁরা সাহস দেখালে হিসাব বদলাতে পারে।
এক দিকে বিধাননগর পুরসভার ২৮ থেকে ৪১ নম্বর ওয়ার্ড, আবার দক্ষিণ দমদম পুরসভার ১০টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই বিধানসভা কেন্দ্রের ফলাফলে একটি প্রবণতা উল্লেখযোগ্য। লোকসভা আর বিধানসভা ভোটে একই দল জয়ী হতে পারেনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের বক্তব্য, একদা এই আসনে সিপিএম নেতা সুভাষ চক্রবর্তীর দাপট থাকলেও ২০১১ সাল থেকে তা তৃণমূলের দিকে ঘুরে গিয়েছে। সৌজন্য, সুভাষের প্রাক্তন শিষ্য সুজিত বসু। তখন থেকে এই কেন্দ্রে টানা তিন বারের বিধায়ক তিনি।
অথচ ২০১৪ সাল থেকে টানা তিন বার লোকসভা ভোটে এই কেন্দ্রে বিজেপির ‘লিড’ ছিল। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের জয়েরব্যবধান ছিল ৭৯৯৭ ভোট। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে এই বিধানসভায় বিজেপি এগিয়ে ছিল প্রায় সাড়ে ১১ হাজার ভোটে।
এই উলটপুরাণের নেপথ্যে কারও টিপ্পনী ‘ভূতের ভোট’। বলা ভাল, ভোট মেক্যানিজ়ম। অর্থাৎ ছাপ্পা, প্রক্সি, বুথ দখল ইত্যাদি। অভিযোগ, ভোট দেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন অনেকে। যত বার তা হয়েছে, পরবর্তী সময়ে মানুষ সুযোগ পেলেই হিসাব উল্টেছেন।
এ বার তাই তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠছে ভোটারের হিসাব। খাস সল্টলেকে শাসকের বিরুদ্ধে ভোটের প্রবণতা দেখা গিয়েছে। কিন্তু সেখান থেকে পিছিয়েও সংযুক্ত এলাকা, দক্ষিণ দমদমের একাংশ— এই সব তল্লাট থেকে ব্যাপক ‘লিড’ নিয়ে জিতে বেরিয়ে যায় তৃণমূল। তবে এসআইআরে এই বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বাদ গিয়েছে বহু নাম। তার মধ্যে রয়েছে সংযুক্ত এলাকারই অসংখ্য নাম। বিরোধীদের কথায়, ‘‘ওই সব এলাকায় ভূতের নাচনও বেশি।’’
রাজনৈতিক মহলের মতে, এই হিসাব চিন্তায় ফেলেছে তৃণমূলকে। যদিও প্রকাশ্যে তা স্বীকার করতে নারাজ কর্মীরা। তাঁদের কথায়, জনসংযোগ না থাকলে বিরোধীরা ভোটে ‘ভূত’ দেখে। আসলে বছরভর পাশে থাকা, লাগাতার উন্নয়নে মানুষ এত দিন ধরে তৃণমূলের উপরে ভরসা রেখেছে। এ বারে তাই বাড়বে জয়ের ব্যবধান।
যদিও বহু দিন বাদে বাম এবং কংগ্রেস নিজ নিজ প্রতীকে লড়াই করছে এই বিধানসভা কেন্দ্রে। তাদের ভোট বৃদ্ধি পেলে হিসেব গুলিয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন বাসিন্দাদের একাংশ।
‘হেভিওয়েট’ প্রার্থী সুজিতের বিরুদ্ধে বাকি প্রার্থীদের লড়াই কঠিন মনে হলেও প্রচার অন্য ধারাও দেখা যাচ্ছে। একে অন্যকে রাজনৈতিক আক্রমণের পাশাপাশি বাম প্রার্থী, তরুণ আইনজীবী সৌম্যজিৎ রাহা প্রচারে গিয়ে উন্নয়নের পরিকল্পনা তুলে ধরছেন। তাঁর প্রচারে তাই অভিনবত্ব রয়েছে। প্রবীণ-আবাস, হেল্পলাইন, সমস্যা জর্জরিত এলাকার তালিকা করে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করা, জনতার কাছে জবাবদিহি, বিধায়ক কোটার কত শতাংশ কোন খাতে, তা-ও নির্দিষ্ট করা হয়েছে সৌম্যজিতের পরিকল্পনায়।
বিজেপি তাদের প্রার্থীর হয়ে প্রচারে সংকল্পের কথায় জানাচ্ছে, ডবল ইঞ্জিন সরকার হলে তারা কেন্দ্রীয় সরকারি প্রকল্পের সঙ্গে এখানে সুসংহত পরিকল্পনা করবে। কংগ্রেস বলছে, মানুষের অধিকার, গণতন্ত্র ফিরিয়ে দেওয়া তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য।
তৃণমূল সরকারি প্রকল্পের সাফল্য থেকে উন্নয়নের দীর্ঘ তালিকা তুলে ধরেছে। গত পাঁচ বছরে সেতুর পাশাপশি সল্টলেকে দু’টি বেলি ব্রিজ, জলাধার সংস্কার, সংযুক্ত এলাকার জন্য পানীয় জল প্রকল্প, সৌন্দর্যায়ন, বিভিন্ন পরিষেবার উন্নতি, জলাশয় ও রাস্তার সংস্কারের তালিকা তুলে ধরছে তারা। প্রার্থীর প্রতিশ্রুতি, লেক টাউনে হাসপাতাল, বিধাননগরে সরকারি হাসপাতালের উন্নয়নে জোর দেওয়া ও বৃদ্ধাবাস তৈরি হবে।
পাল্টা বিরোধীদের অভিযোগ, তৃণমূলের উন্নয়ন মানে বেআইনি নির্মাণ (যা নিয়ে মামলা বিচারাধীন), কাটমানি, ভিআইপি রোডের ধারে নয়ানজুলি বোজানো, বহুতল নির্মাণ, বেহাল রাস্তাঘাট, অপর্যাপ্ত আলো, অবৈধ পার্কিং ব্যবস্থা ও আবর্জনা সাফাই পরিষেবা। বিজেপি নেতা দেবাশিস জানা বলেন, ‘‘হাই মাস্ট আলো লাগিয়ে, পিচের উপরে পিচের আস্তরণ চাপিয়ে সংস্কারের দাবি মানেই উন্নয়ন নয়। বিধাননগরের পরিকাঠামো সংস্কারে সুসংহত পরিকল্পনার প্রয়োজন।’’
তৃণমূল প্রার্থী সুজিত বসু বলছেন, ‘‘বিরোধীরা প্রতি বার এমন অভিযোগ তোলেন, আর আমি মানুষের সমর্থন পাই। এ বার সেই সমর্থন বাড়বে।’’ ভোটের মুখে তাঁকে ইডি দফতরে তলব নিয়ে সুজিতের দাবি, এ ভাবে তাঁকে থামানো যাবে না।
বিজেপির প্রার্থী চিকিৎসক শারদ্বত মুখোপাধ্যায় প্রচারে বেরিয়ে জানাচ্ছেন, ভোটদানে বাধা দেওয়ার চেষ্টা হলেই কড়া পদক্ষেপ হবে। প্রচারে তিনি বাম এবং তৃণমূল আমলের অব্যবস্থা, দাদাগিরির কথা তুলে ধরছেন। নারী নির্যাতন, দুর্নীতির কথা যেমন বলছেন, তেমনই কেন্দ্রীয় সরকারের জনমুখী প্রকল্পের প্রসঙ্গও টানছেন।
কংগ্রেস প্রার্থী রণজিৎ মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘২০ বছর বাদে কংগ্রেস একক ভাবে লড়ছে এই কেন্দ্রে। সাড়া পাচ্ছি। ফলে, নিজেদের ভোট ফিরবেই।’’
দাবি, পাল্টা দাবি ছাপিয়ে ভোটের ‘ভূত’, ভোট কাটাকাটির হিসেব এখন বিধাননগরবাসীর মুখে মুখে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)