রাম মন্দির পারেনি। জগন্নাথ মন্দির পারবে? জোর আলোচনা পূর্ব মেদিনীপুরের ভোটের ময়দান জুড়ে।
লোকসভা নির্বাচনের আগে অযোধ্যায় রাম মন্দিরের উদ্বোধন করেও প্রত্যাশিত ফল পায়নি বিজেপি। বস্তুত, ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে গোটা উত্তরপ্রদেশেই বিজেপির ফলাফল ছিল প্রত্যাশার তুলনায় কম। ৮০টির মধ্যে মাত্র ৩৩টি আসনে জিতেছিল বিজেপি। অনেকেই মনে করেন, উত্তরপ্রদেশ থেকে প্রত্যাশিত আসন না-পেয়েই সংখ্যাগরিষ্ঠতার আগে থেমে যেতে হয়েছিল বিজেপি-কে। সরকার গঠনের জন্য এনডিএ-র শরিকদের উপর নির্ভর করতে হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে। অযোধ্যাকেন্দ্রিক ফৈজাবাদ লোকসভা কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী তথা সাংসদ লাল্লু সিংহ হেরেছিলেন সমাজবাদী পার্টির প্রার্থী অবধেশ প্রসাদের কাছে।
অযোধ্যা বিধানসভা কেন্দ্রে অবশ্য প্রায় সাড়ে চার হাজার ভোটে এগিয়েছিল বিজেপি। তবে রাম মন্দির অযোধ্যা বিধানসভা কেন্দ্র নয়, মিল্কিপুর বিধানসভার অন্তর্গত। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে সেই মিল্কিপুর কেন্দ্রে সাড়ে সাত হাজার ভোটে পিছিয়েছিল বিজেপি। যদিও ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের উপনির্বাচনে তারা ৬১ হাজারেরও বেশি ভোটে মিল্কিপুর পুনরুদ্ধার করে।
লোকসভা নির্বাচনে ফৈজাবাদ, মিল্কিপুর-সহ গোটা উত্তরপ্রদেশের ফলাফল ধর্মীয় আবেগনির্ভর রাজনীতির ‘কর্মক্ষমতা’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল জাতীয় রাজনীতিতে। ‘মন্দির রাজনীতি’ কেন কাজ দেয়নি, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল বিজেপির অন্দরেও। সেই প্রেক্ষাপটেই আলোচনায় চলে এসেছে দিঘার জগন্নাথ মন্দির। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে ২০২৫ সালের অক্ষয় তৃতীয়ার দিন উদ্বোধন হওয়া মন্দিরের নাম দেওয়া হয়েছে ‘জগন্নাথ ধাম’। নামকরণ ঘিরেও রাজনৈতিক বিতর্ক ছিল। বিজেপির তরফে ওই মন্দিরকে ‘ধাম’ বলা নিয়ে আপত্তি তোলা হয়। একটি ‘সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’কে কেন ‘জগন্নাথ ধাম’ বলা হবে, সেই প্রশ্ন তুলেছিলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তবে তার পরেও মুখ্যমন্ত্রী মমতা নিউটাউনে ‘দুর্গা অঙ্গন’ এবং উত্তরবঙ্গের মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি এলাকায় ‘মহাকাল মন্দির’-এর শিলান্যাস করে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিকাঠামো গড়ে তোলার বার্তা আরও জোরালো করেছেন। অনেকে বলছেন, ধর্মীয় ভাবাবেগকে সামনে রেখে তৃণমূল হিন্দু ভোটব্যাঙ্কে নতুন করে প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে।
অনেকের মতে, এই প্রেক্ষিতেই ‘বিশেষ গুরুত্ব’ পাচ্ছে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা। যা দীর্ঘদিন ধরে শুভেন্দুর ‘শক্ত ঘাঁটি’ হিসাবে পরিচিত। সে তিনি তৃণমূলে থাকুন বা বিজেপিতে। শুভেন্দু বিজেপিতে যাওয়ার পরে পূর্ব মেদিনীপুরের ভোটে তার প্রভাব পড়েছে। যেমন ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যে সন্তোষজনক ফল হলেও পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় তৃণমূলের ফল ছিল হতাশাজনক। কাঁথি এবং তমলুক লোকসভা কেন্দ্রে জিতেছিল বিজেপি। জেলার ১৬টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ১৫টিতেই এগিয়ে ছিল পদ্মশিবির। শুধু পটাশপুর আসনে ৮,৬০৮ ভোটের ব্যবধানে এগিয়েছিল তৃণমূল।
জগন্নাথ মন্দির রামনগর বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত। ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ হল, লোকসভা ভোটে ওই কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী তথা কাঁথির সাংসদ সৌমেন্দু অধিকারী তৃণমূলের প্রার্থী উত্তম বারিককে ৯,১৬৮ ভোটে পিছনে ফেলেছিলেন। লোকসভা ভোটের ঠিক এক বছর পরে দিঘার মন্দির উদ্বোধন হয়। তার এক বছরের মাথায় বিধানসভা নির্বাচন। এই সময়সীমা রাজনৈতিক ভাবে ‘গুরুত্বপূর্ণ’। সেই গুরুত্বের নিরিখেই রামনগর আসনের উপর নজর থাকবে উৎসাহীদের।
তৃণমূল নেতৃত্বের আশা, দিঘার জগন্নাথ মন্দির ঘিরে ধর্মীয় ও পর্যটন কেন্দ্রিক আবেগ তৈরি করে তাঁরা বিধানসভা ভোটে ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন। প্রাক্তন মন্ত্রী তথা রামনগরের চার বারের তৃণমূল বিধায়ক অখিল গিরির পুত্র সুপ্রকাশ গিরির বক্তব্য, ‘‘জগন্নাথ মন্দির উদ্বোধনের পর এলাকার অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে। তার ইতিবাচক প্রভাব ভোটে পড়বে। আমাদের দল মনে করছে, এর ফলে শুধু রামনগর বা পূর্ব মেদিনীপুর নয়, গোটা রাজ্যেই আমরা এর সুফল পাব।’’ তাঁর আরও অভিমত, “জল, রাস্তাঘাট, আলো, সেতু এ সব বিষয়গুলি অবশ্যই রাজ্যের মানুষের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু একটি মন্দির তৈরি করে এলাকার অর্থনীতিকে যে ভাবে মুখ্যমন্ত্রী চাঙ্গা করার চেষ্টা করেছেন, তাতে রাজ্যের মানুষ নিশ্চিত ভাবে তাঁর ভাবনাকে সাধুবাদ জানাবেন। তাই গত লোকসভা নির্বাচনের ফল পূর্ব মেদিনীপুরে আমাদের পক্ষে না এলেও এবার পরিস্থিতি বদলাবে। অখিলবাবু পুনরায় রামনগর থেকে জয়ী হবেন।’’
আরও পড়ুন:
কাঁথির বিজেপি সাংসদ সৌমেন্দু অধিকারী অবশ্য বলছেন, ‘‘মন্দির তৈরির কোনও প্রভাব রামনগরে ভোটের ফলাফলে পড়বে না। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে বিজেপি প্রার্থী হিসাবে যে ব্যবধানে আমি এগিয়েছিলাম, ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটে তার চেয়েও অনেক বেশি ভোটে বিজেপি প্রার্থী জিতবেন। এ নিয়ে কোনও অঙ্ক কষার প্রয়োজন নেই।’’
প্রসঙ্গত, উদ্বোধনের পর প্রথমদিকে স্থানীয়দের ভিড় ছিল। কালের নিয়মেই এখন জগন্নাথ মন্দির ঘিরে সেই উন্মাদনা কমেছে। মন্দির চত্বরের ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, পর্যটকেরা আসছেন। বেশির ভাগই দিনভিত্তিক ভ্রমণে এসে ফিরে যাচ্ছেন। রামনগর ১ নম্বর ব্লকের বড়বাড়, বাসুদেবপুর, দেবরাই, গোবিন্দপুর, হরিপুর, কোটবাড়, তলগাছাড়ি, বালিসাইয়ের মতো গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দারাও ভোটের ফলাফলে জগন্নাথ মন্দিরের প্রভাব নিয়ে নিশ্চিত নন। অনেকে প্রকাশ্যে মতামত দিতেও চাইছেন না।
বিজেপি শিবিরের পক্ষে কাঁথির প্রাক্তন সাংসদ শিশির অধিকারীর দাবি, পূর্ব মেদিনীপুর জেলার প্রতিটি আসনেই তাঁরা জিতবেন। কোনও নতুন সমীকরণ কাজ করবে না। তাঁদের যুক্তি, ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের নিরিখে রাজ্যে তৃণমূলের প্রাপ্ত ভোট ছিল ৪৬.১৬ শতাংশ। বিজেপির ৩৯.০৮ শতাংশ। কিন্তু পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় শতাংশের বিচারে তৃণমূলকে পিছনে ফেলে দিয়েছিল বিজেপি। তাদের প্রাপ্ত ভোট ছিল ৪৯.১ শতাংশ। তৃণমূলের ৪৫.৩ শতাংশ। শিশিরদের দাবি, দিঘার জগন্নাথ মন্দির সেই শতাংশের হিসাব ওলটপালট করে দিতে পারবে না।
অনেকেই মনে করেন, হিন্দু তাস যে দলই খেলুক, তাতে আখেরে লাভ হয় বিজেপি-রই। দিঘা বা অন্যত্র তৃণমূল হিন্দু ভাবাবেগকে ‘হাতিয়ার’ করতে চাইলে তাতে লাভ হবে বিজেপি-র। কারণ, এমন একটি ধারণা তৈরি হবে যে, এই ধরনের পদক্ষেপ করে তৃণমূল প্রকারান্তরে বিজেপি-র হিন্দুত্বের বার্তাকেই ‘বৈধতা’ দিচ্ছে। অনেকে অতীতে রাজীব গান্ধীর উদাহরণও দিচ্ছেন। তাঁদের বক্তব্য, অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের মধ্যে রামলালার পুজো করতে দিয়ে রাজীব ভেবেছিলেন, কংগ্রেস হিন্দু ভোট পাবে। বাস্তবে হয়েছিল তার বিপরীত। উল্টে বিজেপি-র তৈরি করা ভাবাবেগ আরও উস্কে গিয়েছিল। যার ফলে শেষপর্যন্ত বাবরি ধ্বংস হয়। সেখান থেকে বিজেপি-র উত্থান শুরু হয়। আর কংগ্রেস ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হতে থাকে।
কংগ্রেসের শীর্ষনেতাদের অনেকেই মনে করতেন, রাজীবের ওই সিদ্ধান্তই ছিল কংগ্রেসের রাজনৈতিক ধাক্কা খাওয়ার প্রথম ধাপ এবং অন্যতম কারণ। একান্ত আলোচনায় অনেক কংগ্রেস নেতা বিষয়টি মেনেও নিয়েছেন। কিন্তু প্রকাশ্যে কখনওই সে কথা স্বীকার করেননি।