Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১০ অগস্ট ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

অপরাজিত

প্রথমদিককার ছবিগুলোর অনিবার্য শর্ত ছিল কেবলই সংঘর্ষ আর ব্যর্থতা। এগারোটা ছবি পেরিয়ে এসে আজকের কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় কিন্তু সফল এক পরিচালকের না

১২ মে ২০১৪ ০০:০০
Save
Something isn't right! Please refresh.
ছবি: কৌশিক সরকার।

ছবি: কৌশিক সরকার।

Popup Close

হ্যাটট্রিক হচ্ছে?

হয়ে গিয়েছে তো হ্যাটট্ট্রিক। ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’, ‘শব্দ’ আর ‘অপুর পাঁচালী’। (হাসি)

‘আর একটি প্রেমের গল্প’ তো অনেক আগের কথা। বলছি ‘শব্দ’, ‘অপুর পাঁচালী’র পর ‘ছোটদের ছবি’ নিয়ে হ্যাটট্রিক হবে?

Advertisement

মাথায় ভাবা বল আর হাতছুট বল যদি মিলে যায় হ্যাটট্রিক হয়েও যেতে পারে। তবে কখনওই হ্যাটট্রিক করার দায়িত্বে আমি নেই। মানে আমার টিমের বা দর্শকের কাছে এর কোনও দায়িত্ব নেই। দায়িত্ব শুধু শিক্ষিত মনোরঞ্জনের।

‘অপুর পাঁচালী’-তে কিন্তু ‘শব্দ’ হল না?

প্রশ্নটা বুঝলাম না!

মানে ‘শব্দ’র তারক তো এখনও পিছু ছাড়ছে না। না দর্শকের। না কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের।

এটা ভুল কথা। তারকের গল্পটা অভিনব। কিন্তু সিনেমাটিক ভ্যালুতে অন্য স্বাদের ছবি হিসেবে ‘অপুর পাঁচালী’র সঙ্গে ‘শব্দ’র কোনও তুলনাই হয় না। ‘শব্দ’র থেকে এ ছবির বাণিজ্যিক আয় ও সম্ভাবনা বেটার। বারোটা চলচ্চিত্র উত্‌সবে দেখানো হয়েছে। গোয়া ফেস্টিভ্যালে সিলভার পিকক পাওয়া মানে তো আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়া। আর কী চাই?



তারক তা হলে ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন নয়?

না। কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় আর যাই করুক ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন তৈরি করবে না। সেই জন্যই বারবার ছবির বিষয় বদলে বদলে অন্য জায়গায় চলে যাওয়া। ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন তখন তৈরি হয় যখন নিজের তৈরি হওয়া বিষয়ে বা ঘরানায় মানুষ চাপা পড়ে। ঘরানা পদ্ধতির খুব বিরোধী আমি।

একটা সময় এই কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, কী ভাবে কাজ করলে লক্ষ্যে এগোতে পারবেন তা ভেবে মাথার চুল ছিঁড়তেন। আর আজ সেই মানুষটা কত রিল্যাক্সড! আজ আপনার ছবিতে কোনও বিগ হিরো নেই। আধুনিক চমকপ্রদ গল্প নেই, জেল্লা বা গ্লস নেই নিজের ইচ্ছেমতো ছবি বানাচ্ছেন। এতটা রিল্যাক্সড হলেন কী ভাবে?

এ সবই আসলে কাজ করতে করতে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে হয়। দর্শক যখন ভাবনাকে গ্রহণ করছেন দেখা যায় তখন খ্যাপামি কমে যায়। তখন সব পাথরেই পরশপাথরের গুণ খুঁজে পাওয়া যায়। প্রসেনজিত্‌ চট্টোপাধ্যায় প্রতিনিয়তই নিজেকে নিয়ে নানা এক্সপেরিমেন্ট করছেন। ওঁকে নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে রইল। খালি মনে হয় চরিত্রের ওপর কোনও কিছু স্থান পায় না। এখনও প্রসেনজিত্‌ চট্টোপাধ্যায় বা ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তকে দেওয়ার মতো যথাযথ চরিত্র আমি লিখতে পারিনি।

‘অপুর পাঁচালী’ কেউ কেউ বলছেন কবিতার মতো ছবি। সত্যি কি কবিতা লিখতেই চেয়েছিলেন। নাকি লিখতে চেয়েছিলেন একটা নিঃসঙ্গ অভিমানী জীবন?

কবিতার মতো করে ভাবিনি। কিন্তু কোথাও হয়তো বা কবিতা হয়েছে। অপু ট্রিলজির নিজস্ব সিগনেচার ছিল শেষে একটা চলে যাওয়া।

এই চলে যাওয়ার যাত্রা চলতে থাকে। অ্যাডিশন নদী আর নৌকো।

সেটা আমি যেমন ভাবে ধরেছি ছবিতে তাতে হয়তো বা কাব্যিক মনে হয়েছে। বাকিটা কিন্তু অপু চরিত্রের শিশুশিল্পী সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনের কঠোর বাস্তব।

আজকের নাগরিক সভ্যতায় দীর্ণ।

অপুর যে বিস্ময়বোধ তা কিন্তু ‘অপুর পাঁচালী’তে নেই।

কারণ আমার প্রসঙ্গ ছিলেন সুবীরবাবু। তাই সে ভাবে নিসর্গও ব্যবহার করিনি। রেল লাইনের ব্যবহারেও সেই বিস্ময় রাখিনি। কারণ এটা সুবীরবাবুর জীবন। অপুর জীবন নয়।

সুবীরবাবুর বিচ্ছিন্ন একক জীবন আর পাল্টে যাওয়া নাগরিক সভ্যতার মধ্যে বিস্মিত হওয়ার জায়গা কোথায়?



‘অপুর পাঁচালী’তে অর্ধেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে গৌরব চক্রবর্তী।

‘অপুর পাঁচালী’ থেকে আপনি কলকাতার সবচেয়ে বড় প্রোডাকশন হাউজের হয়ে কাজ করতে আরম্ভ করলেন। ভেঙ্কটেশ ফিল্মস। তার মানে উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিচালককে এই হাউজের সৌহার্দ্যে থাকতেই হবে?

আমি ভেঙ্কটেশের কাজ আগেও করেছি। তা ছাড়া দেখুন মণি ও শ্রীকান্ত আমার খুব বন্ধু। ওদের সঙ্গে কাজ করার এত স্বাচ্ছন্দ্য আর কোথাও পাওয়া যাবে না। ডিসিপ্লিন, কাজের ধরনটা আলাদা বলেই এরা এক নম্বর। আমিই একমাত্র পরিচালক যে কিনা বহু নতুন প্রযোজকের সঙ্গে কাজ করেছি। আমি একজন পরিচালক যখন ভেঙ্কটেশের সঙ্গে রোজভ্যালির সমস্যা ছিল, তখন দুটো হাউজের কাজ এক সঙ্গে করেছি। আমার কোনও শিবির নেই।

আচ্ছা আপনার পরিচালক জীবনে তো ভাল অভিজ্ঞতার পাশে খুব তিক্ত অভিজ্ঞতাও নিশ্চয়ই আছে?

হ্যাঁ, একবার এক প্রযোজক তাঁদের ছবি উত্‌সবে দেখানোর জন্য বিদেশে নিয়ে যান আমাকে। পারিশ্রমিক দেওয়ার সময় প্লেন ফেয়ারটা কেটে নিলেন। খুব রাগ হয়েছিল। খুব দুঃখ পেয়েছিলাম এতে।

দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম করে আজকে এই জায়গায়। নতুন ছবি-করিয়েদের কী টিপস দেবেন?

প্রত্যেকটা স্ট্রাগলারকে ঠিক ক্রিকেটারদের মতো চিন্তা করতে হবে।
প্রত্যেকটা ওভারের শেষে নতুন একটা ম্যাচ শুরু হচ্ছে। প্রত্যেকটা বল তার কাছে নতুন ম্যাচ হতে হবে। তবে আমি আমার এই সময়কার সমস্ত সহকর্মী পরিচালকদের নিয়ে গর্বিত। আমি যদি তাঁদের কোনও ভাবে অনুপ্রেরণা দিয়ে থাকতে পারি তো ভাল লাগবে। প্রত্যেকেই কিন্তু ছবির জন্য কিছু না কিছু বিষয় ভাবছে। সেটাই আমার সব চেয়ে ভাল লাগে। ওদের কাছে আমার দুটো অনুরোধ। হেলান দিয়ো না, আর সাধারণ জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ো না। বন্ধু-বত্‌সল থাকো। আর রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে দ্যাখো মাটিতে পা আছে কি না।

আপনার মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি মোট বারোটা। শেষ দুটো ছবিই নামযশে, বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য হল। কেরিয়ারের শুরু থেকে কেবলই ধাক্কা। মুম্বই গেলেন কাজ করতে। কিন্তু পারলেন না। সম্পূর্ণ ব্যর্থ! মনে পড়ে?

পারলাম না তো। ‘রাহাত’ সিরিয়ালটা যে কোম্পানির হয়ে করছিলাম সেই কোম্পানিটাই বন্ধ হয়ে গেল। ‘রাহাত’ বেশ নাম করলেও আমি আর কাজ পেলাম না মুম্বইয়ের নানা পলিটিক্সে। সেই সময় চূর্ণী মুম্বইতে একটা বিশেষ কোম্পানির হয়ে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়ে দুর্দান্ত কাজ করছে। এক বছর মুম্বইতে কাজ খুঁজে খুঁজে ফিরে এলাম কলকাতায়। আর চূর্ণীও ফিরে এল জ্বলজ্বলে কেরিয়ার ছেড়ে। কী সাঙ্ঘাতিক খাদের ধারে দাঁড়ালাম। আজও ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়।

এর পরেও ধৈর্য-পাথর ধারণ করে রাখলেন কী ভাবে?

ফিরে গেলাম সেন্ট জেভিয়ার্সের সেই চাকরিতে। সিনেমা তৈরির স্বপ্নটা এক্কেবারে টোল না খেতে দিয়ে।

লড়াই করতে গিয়ে হেরে যাওয়ার ভয়টাও ছিল নিশ্চয়ই?

হ্যাঁ। ছিল। আজও হেরে যাওয়ার ভয় হয়। কিন্তু লড়াইটা থামানো যায় না। লড়াই করতে পারার যোগ্যতার মধ্যেই একটা জয় আছে।

আপনার প্রথম ছবি ‘ওয়ারিশ’ কিন্তু চলেনি...

চলল না। সব থেকে খারাপ লাগল তাঁদের কাছে যাঁরা আমার টেলিফিল্ম দেখে ভাল বলতেন। তাঁরা বললেন: ছবিটা ভীষণ গতে বাঁধা হয়েছে। আমি নাকি ‘সেফ’ খেলেছি গল্পটায়। খুব খারাপ লেগেছিল এই ভেবে যে আমি ব্যতিক্রমী চিন্তা ভাবনা সঞ্চার করতে পারলাম না। পরের ছবি ‘শূন্য এ বুকে’র ভাল আয় হয়েছিল। কিন্তু তার পর আর প্রযোজক পাচ্ছিলাম না। দোরে দোরে ঘুরে প্রযোজক খুঁজতে হত। বহু আশ্চর্য লোকের পাল্লায় পড়েছি। তাদের ছবি করলে ছবিটা হত, কিন্তু আমার খুব ক্ষতি হয়ে যেত। শেষমেশ আমার জীবনটা বদলাল ‘আর একটি প্রেমের গল্প’ করে। প্রথম বুঝলাম বড় বাজেটের ছবির পরিচালনা কেমন হয়। সেটাই প্রথম আমার একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলা ছবি। তবে এই লড়াইটার সময় স্ত্রী চূর্ণী অসাধারণ ভাবে আমার পাশে ছিল। পাশে ছিল পরিবারের সকলে। ওরা পাশে ছিল বলেই বারবার অবসাদ কাটিয়ে লড়াইয়ে ফিরেছি। অপেক্ষা করেছি। ধৈর্য ধরতে পেরেছি। পায়ের তলায় মাটি পেয়েছি।

সেই স্নায়ুযুদ্ধটাও তো সাঙ্ঘাতিক! সেই সময় যাঁরা আপনাকে দেখেছেন সকলেই জানেন। কী ভয়ঙ্কর নিঃশব্দ লড়াই!

হ্যাঁ। সাঙ্ঘাতিক। সব সময় স্নায়ুযুদ্ধ চলত। স্নায়ুযুদ্ধে আমার সব চেয়ে পছন্দের যোদ্ধা রাহুল দ্রাবিড়। এবং আমার যেটা মনে হয় এই সব যুদ্ধে অন্যে কী করছে না দেখে, আমি শুধু অর্জুনের পাখির চোখ দেখার মতো নিজের কাজটাতেই ফোকাস রেখেছি। আর সেটা সিনেমা।

আজকাল আপনি ছবির বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে একেবারে বেপরোয়া যাকে বলে। লোকে ধরতে পারছে না এর পর আপনি কী গল্প নিয়ে ছবি বানাবেন। যেমন আপনার পরের ছবির গল্প সমাজে প্রায় ব্রাত্য বামন বা ডোয়ার্ফদের নিয়ে। এতটা আনপ্রেডিক্টেবল?

এই বেপরোয়াপানা আমার বরাবরের। ‘শূন্য এ বুকে’র সঙ্গে ‘জ্যাকপট’য়ের মিল নেই। ‘আর একটি প্রেমের গল্প’র সঙ্গে ‘কেয়ার অব স্যার’ বা ‘শব্দ’র মিল নেই। এই বেপরোয়াপনার জন্যই তো বেঁচে থাকা। ক্লাসে দেখবেন বেয়াড়া ছেলেপুলের দিকেই মাস্টারদের, অন্য ছাত্রদের নজর থাকে। কারণ ও কোনও গতে বাঁধা কাজ করবে না। একেক দিন একেক রকম উপদ্রব সে তৈরি করে। একজন পরিচালক যদি সেই শিক্ষিত বেয়াড়াপনাটুকু করতে পারে তার সিনেমা-ভাবনা নিয়ে মানুষ অ্যালার্ট থাকবে আবার একটা সিনেমা আসছে, কী রকম করে কে জানে....এই ভেবে। যদি দর্শক বুঝে ফেলেন, উনি মানেই তো এই রকম ছবি সেটাই বরং আমার আতঙ্ক।

এই আতঙ্কই কি আপনাকে ইদানীং সাফল্য দিয়েছে?

সফল কিনা মানুষ বলবে। এই ভয় পাওয়াটা থাকলেই যে কোনও অভিনেতা বা পরিচালক টিকতে পারে। আমার কাছে প্রতিটি ছবি আমার প্রথম ছবি। যে কোনও প্রতিষ্ঠিত পরিচালকেরই নিশ্চয়ই তাই মনে হয়। প্রতি ছবিতেই নিজেকে খোঁজা, আবিষ্কার করা চলে। প্রত্যেকটা ছবির শট নেওয়ার আগে ভয় পাই। কারণ ওই শট তো জীবনে এর পর আর নেওয়া হবে না। তাই সেরাটা দিতে হবেই।

‘অপুর পাঁচালী’ যে জাতীয় পুরস্কার পেল না তার জন্য মনখারাপ হয়নি?

তাত্‌ক্ষণিক একটা মনখারাপ হয়। যখন জানতে পারি যে পুরস্কার এল না একজন অত্যন্ত সাধারণ মানুষ হিসেবে একটা শূন্যতা কাজ করে। মনে হয় যাঃ হল না। আমি টিমের ছেলেমেয়েদের একটা কথাই বোঝাতে চাই সারা ভারত জুড়ে অসামান্য সব সিনেমা হচ্ছে। প্রতিযোগিতাটা তাদের সঙ্গে। বাংলার কয়েকটা ছবির সঙ্গে নয়।

আপনি তো বাংলা সাহিত্যের ছাত্র। সাহিত্য নিয়ে ছবি করেন না কেন?

কারণ গল্পটা আমি নিজেই লিখছি। যখন আমার মাথায় আর কোনও নিজের গল্প আসবে না, তখন অঢেল বাংলা সাহিত্যের একটা তাকে আমি হাত দিয়ে দেব। বাংলা সাহিত্যটা আমার ইন্দিরা বিকাশ পত্র। জমিয়ে রেখেছি।

কিছু দিন ধরে আপনার ফিচার ছবিতে এক ধরনের সামাজিক বা বাস্তব চরিত্রের ডকুমেন্টেশন থাকছে। এটা কেন? মন থেকে গল্প আসে না? চপল ভাদুড়ি, গদাধর নায়েক, সুবীরবাবু....

শুধু ‘শব্দ’ বা ‘অপুর পাঁচালী’, ‘আর একটি প্রেমের গল্প’ নয়। ‘কেয়ার অব স্যার’ প্রমোটার রাজের গল্প। ‘শূন্য এ বুকে’ নারী শরীর আর মনের বোঝাপড়া নিয়ে ডকুমমেন্টশন। আবার ‘রংমিলান্তি’ও কমেডি স্টাইলে মনের মানুষ না পাওয়ার যন্ত্রণা নিয়েই গল্প। তাই সেই ছবির মূল কথা হয়ে ওঠে কিছুটা পাওয়া যায় জীবনে, কিছুটা পাওয়া যায় না।

প্রায় সব ছবিতেই আপনার স্ত্রী চূর্ণী অভিনয় করেছেন। সম্প্রতি ‘খাদ’, ‘অপুর পাঁচালী’তে উনি নেই। সম্ভবত ডোয়ার্ফদের নিয়ে গল্প ‘ছোটদের ছবি’তে থাকছেন না। হঠাত্‌ অন্তর্ধান?

যখন ও পর পর সব ছবিতে কাজ করে তখন প্রশ্ন ওঠে কেন ও সব ছবিতে থাকে? আর যখন অভিনয় করে না তখন বলা হয় কেন নেই? চূর্ণীকে যখন প্রয়োজন হবে তখন ঠিকই নেওয়া হবে। আমরা প্রশ্নসূচক। মাতৃগর্ভে ভ্রুণের আকৃতিটা হয় প্রশ্নচিহ্নের মতো। আমাদের মননের মধ্যেও তাই এত প্রশ্ন। এত কৌতূহল।

আচ্ছা চূর্ণীর কোনও উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই? উনি তো আপনার ছবি বানানোর কাজের প্রায় সব রিসার্চ ওয়ার্ক করেন। এমনকী চিত্রনাট্যেও সাহায্য করেন।

না। আমার মতো প্রকাশ নেই। ‘নির্বাসিত’ বলে যে ছবিটা চূর্ণী বানিয়েছে, তাতে মনে মনে ওকে আমার গোপন ঈর্ষা হল। ইশ্শ্ আমি যদি এই রকম একটা ফার্স্ট ফিল্ম পেতাম জীবনে। না তবে ওর সঙ্গে আমার কোনও ইগো প্রবলেম হবে না। ওটা ‘অভিমান’ ছবিটা দেখেই শেষ হয়ে গিয়েছে।

কিন্তু নির্বাসিত ছবিটা যদি সত্যিই ভাল হয়, তা হলে তো সবাই বলবে আপনি প্রোডাকশনে ওঁর পাশে ছিলেন বলেই ছবিটা ভাল হয়েছে।

হ্যাঁ, যেমন করে ‘থার্টি সিক্স চৌরঙ্গী লেন’ বানিয়েছিলেন অপর্ণা সেন নয়, সত্যজিত্‌ রায়। ‘উনিশে এপ্রিল’ বানিয়েছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ নয়, অপর্ণা সেন। ‘আর একটি প্রেমের গল্প’ আমি নয় বানিয়েছিল ঋতুদা এই রকম ভাবেই হয়তো লোকে বলবে যে ছবিটা আমার বানানো। সেক্ষেত্রে বলব যে-যে পরিচালককে এই সব অপবাদ দেওয়া হয়েছে তাঁরা দীর্ঘস্থায়ী হয়েছেন।

বামনদের নিয়ে এই যে ছবিটা করছেন তাতে কি তাঁদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে মনে হয়?

একটু হলেও বদলাবে। তাঁদের তাচ্ছিল্য করতে গেলে আমার ছবিটা যাঁরা দেখবেন তাঁদের মনে একটা মানবিক অনুভূতি তৈরি হবে। আর সেটা দয়া নয়। ঠিক যেমন ‘আর একটি প্রেমের গল্প’ করার পর সমকামীদের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে।

ঋতুপর্ণ ঘোষকে আপনি গুরু বলেছেন। এই এক বছরে ওঁর চলে যাওয়ার পর নিশ্চয়ই খুব মিস করলেন ওঁকে।

হ্যাঁ। করলামই তো। আমার ‘অপুর পাঁচালী’ ওঁকে দেখানো হল না। খুব বড় সমালোচক ছিল ঋতুদা। তবে আমি ‘আর একটি প্রেমের গল্প’র পর ওর সঙ্গে দৈনন্দিন যোগাযোগ রাখতাম না। এত মননশীল, প্রাজ্ঞ মানুষের সঙ্গে রোজকারের সম্পর্ক হয় না। আমার সন্তুষ্টি একটা জায়গাতেই, ‘আর একটি প্রেমের গল্প’ হওয়ার পর ঋতুদা নিজেকে রূপান্তরকামী বলতে আর সংশয় দেখায়নি। ‘চিত্রাঙ্গদা’র মতো সাহসী ছবি করেছে সমকামীদের নিয়ে। লিখেছে ‘মেমোরিজ অব মার্চ’ ছবির গল্পটাও। কিন্তু বড্ড তাড়াতাড়ি চলে গেল। ঠিক যখন নিজস্ব আমি-টাকে প্রকাশ করার কথা ভাবল ঠিক তখনই।

আপনি সারা বছরে দুটো করে ছবি বানান এবং তার পরবর্তী ছবির ভাবনা চিন্তা করেন। এত ঘনঘন ছবি করেন কেন?

কারণ এখন ছবি করেই অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে। চিন্তাভাবনা দূরে সরিয়ে হেলান দিতে চাই না।

অঞ্জন দত্ত আপনার এত পরপর ছবি করা নিয়ে প্রায়ই নানা কথা জনসমক্ষে ও বিরলে বলেন।

সেটা বললেও উনি প্রশ্রয় দিয়েই বলেন জানি। কারণ উনিও এক বছরে একাধিক ছবি করেন।

সব সময় প্রান্তিক মানুষদের নিয়েই ছবি বানান। কিন্তু যাঁদের অর্থ-যশ-প্রতিপত্তি আছে তাঁদেরও তো শূন্যতা থাকে। তাঁদের নিয়ে গল্প বলেন না কেন?

এটা আমার স্বভাব। যাঁদের বেশির ভাগটাই পূর্ণ, প্রভাব-প্রতিপত্তি যথেষ্ট, তাঁরা যেটুকু অপূর্ণ তাকে সামাল দিতে পারবেন। যাঁদের সব রয়েছে তাঁদের প্রতি আমার নজর পড়ে না।

আপনার কোনও শত্রু আছে?

অবশ্যই আছে। যে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর প্রথম দুটো ছবি বানিয়েছিল সে আমার শত্রু। সে ওই দুটো ছবিতে আরও ভাল পরিচালক হতে পারত। আজ যদি ‘ওয়ারিশ’ কিংবা ‘শূন্য এ বুকে’ বানাতাম আরও অনেক ভাল হত।

আমি সেটার কথা বলছি না। ইদানীং শোনা যাচ্ছে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর ইন্ডাস্ট্রির সহকর্মীদের কাছে ঈর্ষার পাত্র হয়ে উঠছেন। গোপন ব্যালটে ভোট পড়লে হয়তো সেই রকমই দেখা যাবে...

যদি এই রকম ঘটে তা হলে ভাল না লাগারই কথা। আমার বিশ্বাস সহকর্মীরা সকলেই আমার বন্ধু। কোনও কারণে তাঁরা যদি ঈর্ষান্বিত হয়েও থাকেন, সময়ে এটা কেটে যাবে। কারণ আমরা শেষ পর্যন্ত সবাই সিনেমাকেই ভালবাসি। সেখান থেকে সাময়িক ঈর্ষা পাল্টে আবার বন্ধুত্বই শেষ কথা বলবে।

ইদানীং দৈনিক রুটিনটা কেমন যাচ্ছে। খুব ব্যস্ত?

ব্যস্ত বলতে ‘খাদ’-য়ের এডিটিংয়ের কাজ চলছে। আর ‘ছোটদের ছবি’ ছবির প্রস্তুতি, ওয়ার্কশপ। এ ছবিতে কোনও প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা নেই বলে ওয়ার্কশপটা একটু বেশি। বাকিটা ঘর-সংসার। মাঝে মাঝে আড্ডা থাকে যতিচিহ্নের মতো।

নায়ক-নায়িকারা কখন আপনাকে আলাপ-আড্ডার জন্য যোগাযোগ করেন? আপনি তো খুবই ব্যস্ত!

এই প্রশ্নটা হ্যান্ডসাম ডিরেক্টরদের জন্য। সৃজিত, কমলেশ্বর, পরমওদের জন্য। ওদের জিজ্ঞাসা করুন। আমায় তো তেমন কেউ ফোনই করে না। (হাসি)

আজ তো নির্বাচন। মোদি না মমতা?

এ তো নির্বাচনের ফলাফল বলবে। আমার একটা ভোটের ওপর সে সিদ্ধান্ত দাঁড়িয়ে নেই। এটা লোকসভা নির্বাচন। সারা দেশ ঠিক করবে তারা কাকে চায়।

কিন্তু আপনি যে তৃণমূলের জনসভায় গিয়েছিলেন। পঞ্চান্ন মিনিট বক্তৃতা দিয়ে সবাইকে মুগ্ধ করে এসেছেন!

জনসভায় তৃণমূলের কর্মী হিসেবে যাইনি। গিয়েছিলাম টেলিভিশন ও ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির প্রতিনিধি হিসাবে।
দুঃস্থ শিল্পীদের জন্য কল্যাণমূলক কর্মসূচি এবং টেকনিশিয়ান স্টুডিওর অভাবনীয় উন্নতির জন্য ধন্যবাদ ও সমর্থন জানাতে। যে রাজনৈতিক দলই আমাদের শিল্প ও শিল্পীদের সম্মান জানাবে তাদের সব মঞ্চে আমরা আছি।

আগামী বিধানসভা নির্বাচনে দাঁড়াবেন নাকি?

না। আমি রাজনীতিক নই। নাগরিক হিসেবে প্রত্যক্ষ রাজনীতি আমাকে তেমন ভাবে আকর্ষণ করে না। রাজনৈতিক দায়িত্বপালন করি বিনোদন ও সমাজসচেতন ছবির মাধ্যমে। যে দিন ছবি বানানোর মতো আনন্দ ও উত্তেজনা রাজনীতিতে খুঁজে পাব সে দিন সরাসরি রাজনীতি করব। তার আগে পর্যন্ত আমি নিছকই এক সমাজ সচেতন চিত্রপরিচালক মাত্র।
আমার কাছে সব চেয়ে বড় নির্বাচন হল ছবির বিষয় নির্বাচনই। (হাসি)

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)


Something isn't right! Please refresh.

Advertisement