সব ঠিকঠাক থাকলে আগামী বছরেই ১০০ জন চিকিৎসক পাশ করে বেরোবেন সাগর দত্ত মেডিক্যাল কলেজ থেকে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো স্ব-ক্ষেত্রে কৃতীও হতে পারেন। কিন্তু ঘটনা হল, এঁরা সকলেই ছাত্রাবস্থায় হাতেকলমে জটিল রোগীর চিকিৎসা করার সুযোগ ছাড়াই ডাক্তার হয়ে যাচ্ছেন। মেডিক্যাল শিক্ষায় যে ক্লিনিক্যাল দিককে সব চেয়ে বেশি গুরুত্ব গিয়ে এসেছেন বিশেষজ্ঞেরা, এই পড়ুয়ারা সেই আবশ্যিক দিকটি থেকেই বঞ্চিত হচ্ছেন।

আর এখানেই একটা বড় প্রশ্ন চিহ্ন তৈরি হয়েছে রাজ্যের স্বাস্থ্য-শিক্ষা পরিকাঠামোকে ঘিরে। যে সংশয় বারংবার প্রকাশ করেছে ‘মেডিক্যাল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া’-ও (এমসিআই)। আগামী বছর এই কলেজের এমবিবিএস-এর প্রথম ফাইনাল ব্যাচ বেরোনোর কথা। এত দিন পর্যন্ত এমসিআই-এর সব ক’টি পরিদর্শনেই ফেল করেছে এই কলেজ। প্রতি বারই পরের বার কাজ শেষ করা হবে, এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে মুচলেকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনও বারই প্রতিশ্রুতি রাখা হয়নি। যে কোনও দিন এমসিআই পরিদশর্করা ফের আসবেন এখানে। কিন্তু এখনও এমসিআই-এর ছাড়পত্র পাওয়ার মতো করে তৈরি হতে পারেনি এই মেডিক্যাল কলেজ। ফলে এ বারেও এই কলেজকে ঘিরে ফের রাজ্যের মুখ পুড়বে কি না, সেই প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে।

সাগর দত্ত মেডিক্যাল কলেজের কর্তাদের বক্তব্য, সংখ্যার দৌড়ে এগিয়ে থাকতে রাজ্য সরকার উপযুক্ত পরিকাঠামো ছাড়াই কলেজ খুলতে বলেছিল। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কাজ চালু হলেই পরিকাঠামোর বন্দোবস্ত হয়ে যাবে। কিন্তু কার্যত কিছুই হয়নি। আগামী বছর প্রথম বার এমবিবিএস ফাইনাল পরীক্ষা দেবেন এই কলেজের পড়ুয়ারা। কিন্তু কতটা প্রস্তুত তাঁরা? এই কলেজেরই এক শিক্ষক-চিকিৎসকের কথায়, “বলতে খারাপ লাগলেও এটা সত্যি যে, এখানকার পড়ুয়ারা অনেক কিছু না শিখেই ডাক্তার হয়ে বেরোবেন। শুধুই বই পড়া বিদ্যা। ক্লিনিক্যাল জ্ঞান তাঁদের কিছুই হয়নি। বিভিন্ন ধরনের রোগী না ঘাঁটলে ক্লিনিক্যাল জ্ঞান হবে কী করে?”

কেন হয়নি ক্লিনিক্যাল জ্ঞান? কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছেন, সাগর দত্ত হাসপাতালে মাত্র ১৩৫টি শয্যা। সেখানে জ্বর, সর্দিকাশি, পেট খারাপের রোগীরাই মূলত ভর্তি থাকেন। কামারহাটি ইএসআই হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী সেখানকার ৪৭০ শয্যাও এর সঙ্গে যুক্ত ঠিকই। কিন্তু ইএসআই হাসপাতালের কিছু নির্দিষ্ট ধরনের রোগীই আসেন। ফলে নানা ধরনের জটিল রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার কোনও সুযোগই নেই এখানকার মেডিক্যাল পড়ুয়াদের কাছে। সেই কারণেই ৫০০ শয্যার হাসপাতালের উপরে জোর দিয়েছিল এমসিআই। বাস্তবে সেই হাসপাতাল বাড়িটুকু শুধু তৈরি হয়েছে। ৫০০টা খাট কেনা তো দূরের কথা, এখনও সে ব্যাপারে অর্থ দফতরের অনুমোদন পর্যন্ত আসেনি।

সাগর দত্ত মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ দেবাশিস ভট্টাচার্য বলেন, “আগের তুলনায় কিছুটা উন্নতি হয়েছে। আমরা ঘাটতিগুলো নিজেদের মতো করে মেটানোর চেষ্টা করছি। দেখা যাক কী হয়।”

রাজ্যের স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তা সুশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য তাঁদের কোনও ঘাটতিই মানতে রাজি নন। তাঁর কথায়, “এমসিআই-কে সন্তুষ্ট করা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। দেশের অন্য রাজ্যের মেডিক্যাল কলেজগুলোতেও এ সব সমস্যা আছে। আমাদেরও আছে। এ ভাবেই চালাতে হবে। একদিনে সব ঠিক হবে না। ধাপে ধাপে চেষ্টা করছি।” মেডিক্যাল পড়ুয়াদের ক্লিনিক্যাল শিক্ষা অসম্পূর্ণ থাকার বিষয়টাকে আমলই দিতে চাননি তিনি।

স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে খবর, গত বছর এমসিআই চিঠি দিয়ে জানায়, পরিকাঠামোয় বড় ঘাটতি রয়ে গিয়েছে এই কলেজে। তা পূরণ না করলে আখেরে ক্ষতি পড়ুয়াদেরই। দ্রুত সেই অভাব পূরণ না হলে কলেজের অনুমোদন বাতিল করারও হুঁশিয়ারি দিয়েছিল তারা।

মুচলেকা দিয়ে এমসিআই-এর কাছ থেকে সাময়িক অনুমতি পেলেও কার্যত এখনও নেই-রাজ্য হয়েই থেকে গিয়েছে সাগর দত্ত মেডিক্যাল কলেজ। স্বাস্থ্যকর্তাদের একাংশই মানছেন, অজস্র নেই-এর কারণেই একটা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল তার পঞ্চম বর্ষে পা দিয়েও স্রেফ ‘দুধভাত’ হয়েই থেকে যাচ্ছে। আর সেই কলেজ থেকে যে ডাক্তাররা পাশ করে বেরোতে চলেছেন, তাঁরা নম্বরের দৌড়ে এগিয়ে থাকলেও থাকতে পারেন, কিন্তু রোগীর নাড়ি ধরার কাজটায় যে অনেকটাই পিছিয়ে থাকবেন, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।