Advertisement
E-Paper

মোদীর করিডরে বুলডোজারের নীচে জ্ঞানবাপী

মোদীময় এই ভোটকেন্দ্রে জ্ঞানবাপী চক হয়ে গলিপথে মনিকর্ণিকা ঘাট পর্যন্ত জনপদ আসলে বারুদের স্তূপ হয়ে রয়েছে। অথবা আতঙ্কের প্রহর গোনা একটি দ্বীপের মত।

অগ্নি রায়

শেষ আপডেট: ১৯ মে ২০১৯ ০২:৩১
কাশীর করিডর গড়তে এ ভাবেই চলছে ধ্বংসের কাজ। নিজস্ব চিত্র

কাশীর করিডর গড়তে এ ভাবেই চলছে ধ্বংসের কাজ। নিজস্ব চিত্র

‘ফোটো মাত খিঁচো। ইধার কোই নুক্কড় নেহি চল রাহা হ্যায়!’

গোধুলিয়া মোড় থেকে কাঠফাটা রোদ মাথায় নিয়ে জ্ঞানবাপী চকের দিকে যত এগোচ্ছি, পুলিশ ততই বাড়ছে। কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের চার নম্বর গেটের সামনে তো পুরোপুরি দুর্গ। পিছনে ধ্বংসস্তূপ। ক্যামেরাবন্দি করার চেষ্টা করতেই তিরিক্ষে ধমক এল সেই খাকি দুর্গ থেকে। কাল লোকসভা ভোটের শেষ পর্বে এই বিশেষ এলাকাটিতে যে পুলিশ প্রহরা এবং বাহিনীর বহর দেখলাম, তা গোটা বারাণসীতে চোখে পড়েনি তো!

এই জ্ঞানবাপীর সামনেই মগনলালের লোক ফেলুদাকে নিয়ে যাবে বলে অপেক্ষা করছিল। মোদীময় এই ভোটকেন্দ্রে জ্ঞানবাপী চক হয়ে গলিপথে মনিকর্ণিকা ঘাট পর্যন্ত জনপদ আসলে বারুদের স্তূপ হয়ে রয়েছে। অথবা আতঙ্কের প্রহর গোনা একটি দ্বীপের মত। এমনই এক দ্বীপ, যা মৃত্যু পরোয়ানা পেয়ে গিয়েছে, ডুবে যাওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। ডুবতে চলেছে কাশীর সাবেক সংস্কৃতি আর পাঁচমেশালি মধ্যযুগীয় গন্ধময় গলিতন্ত্র, শাড়ি, ফল, লস্যি, রাবড়ি সংস্কৃত বইয়ের দোকান। এমনকি দেড়শো বছরের পুরনো এক গ্রন্থাগারও ধ্বংসের আতঙ্কে। গুঁড়িয়ে গিয়েছে শ’তিনেক বাড়ি। অপেক্ষায় আরও।

বিজেপির ইস্তাহার মেনে বারাণসীর ভোল পাল্টানো শুরু হয়েছে ২০১৪-য়। গঙ্গার ঘাট থেকে কাশী বিশ্বনাথ মন্দির পর্যন্ত ৫০ ফুট চওড়া অত্যাধুনিক করিডর হবে। নরেন্দ্র মোদী বলেছেন, ‘‘বিশ্বনাথজি ভিড়ে ঢেকে রয়েছেন।’’ তাঁকে মোদী ‘মুক্তি’ দেবেন। প্রয়োজন ৪ হাজার বর্গফুট ফাঁকা জমি। অতঃপর বিশ্বনাথ মন্দির ট্রাস্টকে সঙ্গে নিয়ে বুট আর বুলডোজারের আওয়াজ তুলে জমি ‘ফাঁকা’ করতে নেমেছে স্থানীয় ও রাজ্য প্রশাসন।

প্রথম কোপ পড়ে কাশী বিশ্বনাথের মূল প্রবেশদ্বারের কাছেই ১৮৭২-এ তৈরি কারমাইকেল গ্রন্থাগারে। যার নীচে প্রায় সত্তর-আশি বছর ধরে ভাড়া রয়েছে ২৮টি ছোট বড় দোকান। ‘‘দোকান বাঁচাতে সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে স্টে অর্ডার নিয়ে এসেছি। কাল কি হবে জানি না,’’ বলছেন বিজেন্দ্র বানিওয়াল। ছোট দোকানে দশকের পর দশক ধরে বিক্রি করছেন তীর্থযাত্রীদের জন্য শরবত, চা, পান, সিগারেট। জানালেন, ‘‘এই লাইব্রেরির অছি পরিষদের যিনি কর্তা ছিলেন, সেই কপিল পাঁড়ে পয়সা খেয়ে বিএসপি থেকে বিজেপি যে যোগ দিলেন। আর ২৮ কোটি টাকা মন্দির কমিটিকে দিয়ে সব কাগজ ওদের নামে করে দিয়েছেন। এখন অন্য জায়গায় নাকি জমি নিয়েছেন।’’

পুলিশ এসে বলছে, ‘‘ব্রিটিশদের সঙ্গে লড়াইয়ের সময় অনেকে বলিদান দিয়েছেন। স্বাধীন ভারতের বিশ্বনাথজির জন্য, তোমরাও দাও। বার্তা স্পষ্ট, মানে মানে কেটে পড়। নইলে ছাদ ভাঙা হলে চাপা পড়বে।’’ একটি ফুলের দোকানে ফাইফরমাশ খাটছেন বিশ্বনাথ করিডরে চাপা পড়া রামকুমার ইন্দেরিয়া। বয়স বেশি নয়, কিন্তু পরিস্থিতির চাপে অতিবৃদ্ধদর্শন। বাপ-দাদার বাড়ি ছিল মণিকর্নিকায়। এই দোকানেই ঝোলা রেখে দিন কাটে এখন। রাতে গলির কোনও দাওয়ায় শুয়ে। বলছেন, ‘‘পথের ভিখিরি করে ছেড়েছে। ভাইয়ের সঙ্গে দালালেরা সাঁট করে ওকে টাকা দিয়ে বাকি ভাইদের ভিটে ছাড়া করেছে।’’

এলাকার দোকানি ও বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল— উচ্ছেদের প্রশ্নে ভাড়াটে দোকানদার এবং বাসিন্দাদের কোনও ক্ষতিপূরণের ব্যাপার নেই। স্থায়ী দোকানদার এবং বাসিন্দাদের মূল্য ধরে দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ, তা কণিকামাত্র। তা ছাড়া তীর্থকেন্দ্রে পঞ্চাশ-ষাট-একশো বছরের ব্যবসা করে এসে এখন অন্য মহল্লায় গিয়ে তাঁরা জলে পড়ছেন।

চৌখাম্বা সংস্কৃত পু্স্তক কেন্দ্রটি টিকে রয়েছে। কিন্তু করিডরের মধ্যে পড়ছে এটাও। মালিক চেতেশ্বর যাদব বিষণ্ণ মুখে বসে রয়েছেন ফরাসে। চার দিকে রঘুবংশ, কুমারসম্ভবের স্তূপ নিয়ে। জানালেন, ‘‘কর্তৃপক্ষ প্রচুর দালাল ছেড়ে দিয়েছেন গলির মধ্যে। তারা এক ভাইকে কিনে বাকিদের উৎখাতের চেষ্টা করে যাচ্ছে।’’

এই মহল্লায় পোস্টার পড়েছিল, ‘মোদীজি এক কাম করো, পহেলে রোটি কা ইন্তেজাম করো।’ সাহস করে এটাও লেখা হয়েছিল, ‘কমল কে ফুল একহি ভুল।’ কিন্তু এক মাস আগে চাপ দেওয়া শুরু হয় প্রশাসনের তরফে। বলা হয়, ভোট আসছে। এ সব হটাও। নয়তো মামলা করা হবে। ‘‘এর পর মোদী জিতে এলে তো এই করিডরে বড় বড় শিল্পপতিদের বরাত দেওয়া হবে। গুজরাতিরা ব্যবসা করবে। এখানকার এক জনকেও যে জায়গা দেওয়া হবে না, তা তো স্পষ্টই করে দেওয়া হয়েছে,’’ বলছেন এক স্থানীয় ওষুধ বিক্রেতা অশোক সিংহ রাজপুত।

কাল এই নির্বাচনী কেন্দ্র থেকে রেকর্ড ভোটে মোদীকে জেতানোর জন্য উদয়াস্ত কাজ করেছে বিজেপির ভোট মেশিন। তার মধ্যে নিশ্চিত ভাবে বেসুরে বাজছে ‘বিশ্বনাথ করিডর’।

Lok Sabha Election 2019 Kashi Corridor Gyanvapi Varanasi
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy